শ্রাবণের শেষকালে হুটহাট বৃষ্টি। বোধহয় মজা করেই সব খেলা পণ্ড করে দিতে ভিজিয়ে দিচ্ছে। মুরাদপুর নামতেই এমন কাণ্ড পরপর দ’ুদিন ঘটল। কাকভেজা হয়ে লেগুনা ধরে চকবাজার যাচ্ছি, ক্রেডিট কার্ড ভাঙিয়ে কিছু টাকা লোন করতে। খরচ বেসামাল। বেতন পেলাম কদিন হলো! এর ভেতর পকেট গড়ের মাঠ। সে যা হোক, অভাব কি আর নতুন খবর, কেবল মাসটাই বদলায়। এই তো ক’দিন হলো, চকবাজার টু আলকরণ হাঁটতে হাঁটতে মেসে পৌঁছে যেতাম। “মাইনসের আঁশটে গন্ধ অসহ্য লাগে, তাই বাসে চড়ি না”–এইরকম বন্ধুদের বলি বটে, আদতে কী, কেবল আমি আর পকেটই জানত! লেগুনার পেছনে বসাটা একপ্রকার অভ্যাসে দাঁড়িয়েছে।
বৃদ্ধ একজন বসলেন পাশ ঘেঁষে। মুখোমুখি সিটে দুজন তরুণ মোবাইলে একযোগে কী একটা দেখছে। আমিও পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে হালকা করে স্ক্রল করছি। চুড়ি, শাড়ি, জুয়েলারি আর টি–শার্টের ফাঁকে এসএসসি রেজাল্ট ঘুরেফিরে উঁকি দিচ্ছে। বৃদ্ধ নীরব দর্শক ছিলেন, খেয়াল করিনি। পট করে বলে উঠলেন-“আংকেল, ব্যাপারটা খেয়াল করছেন?”
এবার ফেল করছে যে, তার বেশিরভাগ লীগের লোক?
সামনের তরুণরা আর আমি একটু ভ্যাবাচেকা খেয়ে মুখ তুলে তাকালাম তাঁর দিকে। বরাবরই পলিটিক্যাল গন্ধ পেলে আমি নাক বন্ধ করে রাখি।
সামনের এক তরুণ বলল-“কী বলছেন, আংকেল? রেজাল্টের সঙ্গে দলের কী সম্পর্ক?”
বৃদ্ধ বললেন-“এরকম না হইলে রেজাল্টের পার্সেন্টিজ আশি থেকে ষাটে কেমনে নামে!”
পলিটিক্যাল মেঘ ঘন হওয়ার আগেই আমি নেমে গেলাম আলিখাঁ মসজিদের সামনে। গুলজার মোড়ের ফাঁকফোকর দিয়ে অপূর্ব একটা আকাশ দেখতে পেলাম। সিঁদুরে মেঘের ছড়াছড়ি। বিশ্বাসই হয় না, অল্প আগে এত কিছু ঝরিয়ে গেল।
এক বর্ষা এলে সিটি কর্পোরেশনের কত লোকের আসন কেঁপে ওঠে, আর আমাদের মন। সংসারের কল্লোলেও মনে পড়ে যায় তাহাদের কথা। একটু সাহসী হলেই কত কী হতে পারত!
কার্ডের ঝামেলা চুকিয়ে প্যারেড কর্নার ধরে সিরাজদ্দৌলা রোডের পথে যেতে দেখা হলো রনির সঙ্গে। সাদা শার্টের সাথে কালো টাই, হাতে ব্যাগ। শুকনো কড়িকাঠ, শ্যামলা রং। একটা ভালো ইনস্যুরেন্সের এজেন্ট! বয়স বেশি হয়নি। এই বয়সে দোকানের চাকরি, সিকিউরিটি গার্ড, গার্মেন্টস ওয়ার্কার, সবশেষে ইনস্যুরেন্সের এজেন্ট। এর মধ্যে ডিগ্রিটাও পাশ করে ফেলল।
সে আমাকে দেখলেই খুশি হয়ে যায়। প্রথমে গদগদ হলেও পরক্ষণে ক্যারেক্টারে ঢুকে গিয়ে একটা পলিসি করিয়ে দিতে উঠে পড়ে লাগে। বারবার মুলো ঝুলিয়ে কেটে পড়তাম। এবার বুঝি আর রক্ষে নেই।
স্বভাবসুলভ হাসি দিয়ে ডাক দেয়-“দাদা!”
আমি নিজেকে কঠিন করে নিলাম। নাহ, কনভিন্স হওয়া যাবে না। যদিও বারবার কনভিন্স হয়ে যাওয়াই আমার স্বভাব।
রনি জিজ্ঞেস করল-“এখন কী করছেন আপনি? চাকরি থেকে টাকা–পয়সা কিছু পেয়েছিলেন?”
সে বোধহয় ধরেই নিয়েছে আমার চাকরি নেই। (চাকরি ঝুঁকিতে আছে যদিও, তবে যায়নি এখনো)। লাস্ট দেখা যখন হলো, তখন ঝুঁকির কথা বলেছিলাম, মনে রেখে দিয়েছে। তাকে আসল খবর জানালাম। সে বেশ প্রফুল্লই হলো। ভাবলাম, পরের লাইন বোধহয় পলিসি নিয়ে হবে, কিন্তু সে ওদিকে গেল না।
রনি বলল-“দাদা, একটা মেয়ে দেখেন আমার জন্য, বিয়ে করব!”
রনির বাবা নেই। রুজির প্রয়োজনে মা একদিকে আর সে আর একদিকে। জায়গা–সম্পত্তিতে চাচাদের লোভ তাকায়, সে সেখান থেকেও কিছু আদায় করতে পারেনি। জানাল, বাপের ভিটার দাবি ছাড়েনি, তবে আদায় কঠিন হবে।
ভিটা–মাটিহীন কাউকে কি করে মেয়ে দেবে এই সময়!
বললাম-“মেয়ে জুটিয়ে নাও। তোমার যে হাল, তাতে সামাজিকভাবে একটু কঠিনই হবে।”
রনি বলল-“সম্পর্ক একটা ছিল। এই ভিটেহীনতার অজুহাতে তার পরিবার বাধা হয়ে ছাড়িয়ে নিল।”
সাদা শার্ট আর কালো টাইয়ের আড়ালে অমলিন হাসি, অথচ বুকটা খাঁখাঁ। রনি বিদায় নিল। এক ঔষধের দোকানদারের সাথে নাকি এপয়েন্টমেন্ট আছে।
বিদায় নিতে নিতে বলে গেল-“একটা পলিসি কিন্তু আপনাকে করতে হবে।”
“নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই”–বলে হাঁটা ধরলাম সিরাজদ্দৌলা রোড হয়ে, এক্সেস রোডের দিকে।
এই রোড আমাকে চেনে। চট্টগ্রাম কলেজের পূর্ব গেট দিয়ে বের হয়ে এই রোড দিয়েই হেঁটে বেড়াতাম। দুঃখ–সুখের অপূর্ব গাঁথুনি। পিছু ফিরলেই রোমাঞ্চ জাগে। আবার যদি ফেরা যেত, অনেক কিছুই বদলে নিতাম।
এক্সেস রোডের মুখে পৌঁছে গেলাম। ট্রাফিক সার্জেন্ট দাঁড়িয়ে আছে, তার পেছনে পলায়নমুখী অটোগুলো। কথিত বাংলা রিকশা বাদ দিয়ে আমিও খুঁজছি অটো।
ট্রাফিক সার্জেন্টকে পাশ কাটিয়ে হেঁটে গেলাম অটোর দিকে। হালকা বৃষ্টি শুরু হলো। অটোচালক সিগন্যাল দিল-“তাড়াতাড়ি করেন, পুলিশ আসছে।”
অপরাধীর মতো দৌড়ে উঠলাম অটোতে। পাশে বসলেন মাঝবয়সী একজন ভদ্রলোক। তিনি বেশ বিরক্তি নিয়েই বললেন-“এগিন বেয়াক ট্যায়া হাইবার ধান্দা।”
আমি জানালাম তাঁকে-“কিছু রোডে অটো নিষিদ্ধ আছে, যানজট কমাতে।”
তিনিও বেশ সচেতন মানুষ। “নিষিদ্ধ, তাহলে এত অটো আসে কোথা থেকে? আপনি আসল খবর জানেন না, প্রতি অটো থেকে মন্ত্রীরা কমিশন খায়! দেশ আর দেশ আছে নাকি!”
তিনি বিড়বিড় করে কত কী বলছেন, অটোচালকও ফোঁড়ন কাটলেন কোথাও কোথাও।
আমি ভেজা হাওয়া গায়ে লাগিয়ে আকাশ দেখছিলাম। সন্ধ্যা হয়ে এল। ভারী বৃষ্টির আভাস দিয়ে সূর্যটা অস্ত গেল। ঘরমুখী মানুষ যন্ত্রের মতো ছুটছে। সহযাত্রী বোধহয় বাজার করেছেন, মাছের গন্ধ আসছে। বেশ অস্থির লাগছে তাকে।
দুই–তিন মিনিটে পৌঁছে গেলাম গন্তব্যে। রাস্তা পার হয়ে আবার আরেকটা গাড়ি ধরতে হবে। গ্যাস–সংকটে রাস্তায় গাড়িও কমে গেছে হঠাৎ। আমি ওপারে পৌঁছে গাড়ির জন্য ওয়েট করছি। একটু চেঁচামেচি শুনলাম।
কৌতূহলবশত সবজান্তা অটো–সহযাত্রীকে খুঁজলাম পাশে। নাহ, নেই।
ওই পাড়ে দেখলাম ভিড় লেগে গেল। লোকজন বলছে-“লোক একটাকে অটো মেরে দিয়েছে।”
নিচে তরিতরকারি ছড়িয়ে আছে। লোকজন লোকটাকে ধরাধরি করে ওষুধের দোকানে নিয়ে গেল। আমিও গেলাম, কোনোভাবে সহযোগিতা করা যায় কি না দেখার জন্য।
ওষুধের দোকানি চেঁচিয়ে উঠলেন-“আরে, আরে! এখানে আনছেন কেন? আমার এখানে এগুলো হয় না।”
হাত থেকে বেচারার রক্ত ঝরছে, প্রাথমিক চিকিৎসার কোনো সুযোগ পেল না লোকটা। পথচারী কয়েকজন বলল-“সামনে একটা নতুন ক্লিনিক হয়েছে, ওখানে চলেন।”
আবার অটোতে করে সাহসী কয়েকজন তাকে নিয়ে গেল ক্লিনিকের দিকে।
ছড়িয়ে থাকা করলা, চিংড়ি, লটিয়ায় রক্ত লেগে আছে। পাশের কোনো বস্তির ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ধাক্কাধাক্কি করে সেগুলো কুড়িয়ে নিচ্ছে।
আমি ঝামেলা বাঁচিয়ে আবার আমার পথ ধরলাম।












