ট্রেনটা যেই না পাটুরিয়া পাশ কাটাইতেছে, অমনি ঝড়টা আরও ক্ষ্যাপা ষাঁড়ের মতো গর্জন কইরা উঠল। জানালার ফাঁক দিয়া হুইসেল মিশা বাতাস ঢুইকা বগির ভেতর এক ধরনের কাঁচা ভয় ছড়াইতেছিল।
আমি চুপচাপ বসা। বগিতে মোট ছয়জন মানুষ।
দুইজন বেঞ্চের ওপর গা ঢাইকা ঘুমাইতেছে। একজন দেদারসে বিড়ি ফুঁকতেছে। আর বাকি তিনজন… আমি আর আমার দুই সাগরেদ।
আমরা যাইতেছি ধলেশ্বরীর ওপারে।
ভোরের আগের স্টেশনে নামুম। কাজ শেষ কইরা আবার ফিরতি ট্রেন। তয় ফিরমু আলাদা আলাদা। এই জীবনে আর দেখা হইব কিনা, তারও ঠিক নাই। আমি এইসব নিয়া ভাবি না। মাসে দুই–একবার নতুন সাগরেদ জোটে। কাজ শেষ হয় রাত শেষ হওয়ার আগেই। তারপর স্টেশন, সাগরেদ, মক্কেল, সব ভুইল্যা যাই। আর একটা কথা আমি সবসময় মনে রাখি। পৃথিবীতে আমার অস্তিত্ব আছে, এইডা কেউ জানে না। আমার কোন ছবি নাই। কোন চিহ্ন নাই।
কিন্তু আইজকে কেমন জানি লাগতেছে।
হলুদিয়া স্টেশন থেইকা আমাদের তিনজনেরই ওঠার কথা ছিল। আগের স্টেশনগুলায় এই বগি ফাঁকা আসার কথা।
তারপর উঠবে আরও একজন। যার জন্যই মূলত যাওয়া। সব মিলাইয়া চারজন হওয়ার কথা। কিন্তু এখন ছয়জন। আমি একবার ঘুমাইয়া থাকা দুইজনের দিকে তাকাইলাম।
এরা কি সত্যি ঘুমায়?
নাকি লাশ সাইজা আছে।? ঘুমের অভিনয় করতেছে না তো?
আমার ডান পাশে বসা রক্সিদা ফিসফিস কইরা কইল,
“ওস্তাদ, বেশি মানুষ না?”
“হ।”
“আগের স্টেশনে তো কেউ উঠে নাই।” আমি জবাব দিলাম “না”। ঠিক তখনই দরজা ঠেলে ঢুকল এক চানাচুরওয়ালা।
“চানাচুর! বাদাম! বিস্কুট!”
বৃষ্টি ভেজা জামা। চোখদুইটা অস্বাভাবিক তীক্ষ্ম। পুরা বগি একবার স্ক্যান কইরা গেল। পরে নামল পরের কামরায়।
রক্সিদা আবার কইল,
“ওস্তাদ, লোকডা খাবার বেচার মতো না।”
আমি শুধু বললাম,
“চুপ।”
কিছুক্ষণ পর ঢুকল পত্রিকার হকার।
রাত প্রায় বারোটা।
এই সময় কারো পত্রিকা লাগে?
লোকটা সবার মুখের দিকে একবার কইরা তাকাইল। বিশেষ কইরা ঘুমাইয়া থাকা দুইজনের দিকে। তারপর নাইম্মা গেল।
আমার ভেতরের সন্দেহটা আরও মোটা হইল।
এরপর আইল দুইজন হিজড়া। তালি বাজাইতেছে। গান গাইতেছে।
কিন্তু আমার চোখ গেল অন্যখানে।
একজনের ডান হাতে পুরান সামরিক ট্যাটু। এই ট্যাটু আমি চিনি। সেনাবাহিনীতে থাকা মানুষরা করায়।
হিজড়া হইতে পারে। কিন্তু অতীত মুইছা যায় না। ওরা টাকা চাইলো।
বিড়িখোর লোকটা পাঁচ টাকার একটা নোট দিল। হিজড়াটা তারে এক সেকেন্ড বেশি সময় দেখল। তারপর হাসল।
সেই হাসি আমার পছন্দ হইল না। ঠিক তখনই ট্রেনের লাইট একবার নিভে গেল। আবার জ্বলল। আর সেই ক্ষণিকের অন্ধকারে আমি দেখলাম
ঘুমাইয়া থাকা দুইজন একসাথে চোখ খুলছিল। তারপর আবার বন্ধ করছে।
আমার বুকের ভেতর ঠুকঠুক শুরু হইল।কারণ আমি এই কৌশল চিনি।
আমি নিজেও বহুবার করছি।
এর খানিক পর টিটি আইল। লম্বা মানুষ। কালো কোট। মুখে দাড়ি। টিকিট দেখতে চাইলো। সবাই টিকিট দেখাইল। ঘুমাইয়া থাকা দুইজন বাদে।
ওদের জাগাইল না।
এইখানেই আমার সন্দেহ প্রায় নিশ্চিত হইয়া গেল।
টিটি চলে গেলে আমি নিচু গলায় কইলাম, “রক্সিদা, ছুরিটা ঠিক আছে?”
“হ।”
“সালাম?”
“আমারও প্রস্তুত।”
আমি মাথা নাড়লাম।
তারপর বিড়িখোর লোকটার দিকে তাকাইলাম।
এই প্রথম সে আমার দিকে চাইয়া হাসল।
কেমন জানি পরিচিত হাসি। ঠাণ্ডা। নির্লিপ্ত। যেন সে সব জানে।
আমি হঠাৎ বুঝলাম, এই বগিতে শুধু আমি না, আরও কেউ আছে, যার আমারই মত কোন ভয় নাই, কোন কিছুরই পরোয়া নাই।
ট্রেন দৌড়াইতেছে। ঝড় বাড়তেছে। হঠাৎ ঘুমাইয়া থাকা একজন উঠে বসল। চাদর সরাইল। সরাসরি আমার চোখের দিকে তাকাইল। তারপর বলল, হলুদিয়া থেইকা উঠছেন?
প্রশ্নটা শুনে বুকের ভেতর কাঁপুনি উঠল।
আমি জবাব দিলাম, ক্যান? লোকটা হাসল। আর কইল– এমনি জিগাইলাম।
কিন্তু তার হাতে আমি কাটার দাগ দেখলাম। পুরানো।
পেশাদার লোকদের হাতেই এইরকম দাগ থাকে।
ভোরের আগে আমরা নামব কাশিয়ানি ঘাট স্টেশনে। সেখানে টার্গেট উঠবে। এই তথ্য শুধু চারজন মানুষ জানার কথা। আমি। আমার দুই সাগরেদ। আর মক্কেল।
কিন্তু আশ্চর্যের কথা, এই বগির সবাই যেন কিসের অপেক্ষায়।
সময়ের। একটা নির্দিষ্ট মুহূর্তের।
রাত একটা পঁয়তাল্লিশ।
ট্রেন ধীরে ধীরে কাশিয়ানি ঘাট ঢুকতেছে। স্টেশন প্রায় অন্ধকার। বৃষ্টি তখনও পড়ে। দরজা খুলল। একজন মানুষ উঠল। মাঝবয়সী। সাদা পাঞ্জাবি। কালো ছাতা। হাতে ছোট ব্যাগ। এই মানুষটার ছবিই আমরা পাইছি। এই লোককেই মারতে হবে। আমি রক্সিদার দিকে তাকাইলাম।
সে মাথা নাড়ল। সব ঠিক। লোকটা এসে বসল বিড়িখোরের বিপরীতে।
মাথা নিচু। চুপচাপ। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার ঘটল তখন। ঘুমাইয়া থাকা দুইজন সোজা হইয়া বসল।
দুই হিজড়া আবার বগিতে ফিরা আইল। টিটিও দেখা দিল। যেন সবাই এই মুহূর্তটার অপেক্ষায় আছিল। আমার পিঠে ঠাণ্ডা ঘাম নামল।
সাদা পাঞ্জাবিওয়ালা লোকটা ধীরে ধীরে মাথা তুলল। তারপর কইল, এতজন মানুষ এক লোকরে মারতে আইছেন?
তার কথা এত শান্ত ও ধীর বগির সবাই তব্দা খায়া গেলাম।
এতক্ষণ যে টিকটিকিটা তার বউরে ধাওয়া করতেছিলো, সেই টিকটিকিও বউরে ধাওয়ার করা থামায়া দিলো লোকটার আচমকা এমুন কথায়।
আমি প্রথমবার বুঝলাম। আমরা ফাঁদে পড়ছি।
লোকটা আবার কইল, মানে ওই নিরবতার স্রষ্টাও তিনি আবার ভঙ্গকারীও তিনি। “একটা কথা জানেন? পৃথিবীতে আমার অস্তিত্ব আছে, এইডাই কেউ জানে না”।
আমার বুক কাঁইপ্পা উঠল। এই কথাটা… আমার কথা। একদম হুবহু।
তারপর ঘুমন্ত লোক দুইজন হেসে উঠল। বিড়িখোর হাসল। টিটি হাসল।
একজন হিজড়া বলল, বুঝছেন কিছু?
আমি তখন বুঝলাম। এই বগিতে তিনজন না… ছয়জন মানুষই ভাড়াটে খুনি। আর আশ্চর্যের বিষয়, প্রত্যেকেই আলাদা আলাদা সূত্র থেইকা একই টার্গেট পাইছে।
সাদা পাঞ্জাবিওয়ালা মানুষটা। লোকটা ব্যাগ খুলল। ভেতর থেইকা পুরানো কিছু ছবি বাইর করল। ছয়জনের। আমার ছবিও আছে। রক্সিদা, সালাম সবার। লোকটা কইলো– তোমরা জানো না। গত দশ বছরে যাদের মারছ, তাদের কয়েকজন ছিল আমার পরিবারের সদস্যা।
ট্রেনের বাকি বগিগুলোর সবটুকু নিরবতা একাই বহন করে চলেছে এই ট্রেন। লোকটা আবার কইল, আমি মানুষ মারি না। বিচারও চাই না। শুধু দেখতে চাইলাম, অন্ধকারের লোকেরা একে অপরের মুখ দেখলে কী হয়? কী করে তারা। আরও আরও খুনির মুখোমুখি দাঁড়ালে কেমন লাগে তাদের।
ঠিক তখনই রক্সিদা আচমকা উঠে দাঁড়াইল।
ছুরি বের করল। এক ঝটকায়।– ওস্










