হড়পা বানে বিপর্যয় নেমে এসেছে নেপালে। তিব্বত সীমান্তের কাছে রসুয়া জেলায় ভোটেকোশী নদীতে বুধবার সকালে এই আকস্মিক বন্যা নামে। প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতা থেকে বরফ ও পাথর ১ হাজার ২০০ মিটার নিচের উপত্যকায় নেমে আসে। এর সঙ্গে পলি ও ধ্বংসাবশেষ মিশে গিয়ে নদীতে পানি ও কাদার প্রবল স্রোত তৈরি হয়। সেই স্রোতের ধাক্কায় খড়কুটোর মতো ভেসে গিয়েছে গ্রামের পর গ্রাম, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, সেতু। কাদামাটির স্তূপে চাপা পড়ে গিয়েছে দোতলা বাড়িও। যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় দুর্গম এলাকাগুলোতে উদ্ধার তৎপরতাও কঠিন হয়ে উঠেছে।
রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ১২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত রাসুয়ায় আনুমানিক ৫০ হাজার মানুষের বাস। তিব্বত থেকে নেপালে প্রবেশ করে এই জেলা দিয়েই বয়ে গিয়েছে ভোটেকোশী নদী। বুধবার সাড়ে ৮টার কিছু পরে আচমকা নদীর জলস্তর বৃদ্ধি পায়। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমান, তিব্বতের দিক থেকে প্রবেশ করেছে বন্যার পানি। সেই বন্যায় গতকাল সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ৩৮৯ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করেছে নেপালের পুলিশ। তারা জানায় নিখোঁজ রয়েছে আরো ৮২৬ জন। তবে বার্তা সংস্থা এপির খবরে নিখোঁজের সংখ্যা ১৪০০ এর বেশি বলা হয়েছে। নিখোঁজদের বড় একটি অংশ পর্যটক। তাদের সংখ্যা ৫৯০ জন; এর মধ্যে ৪৭৬ জন বিদেশি এবং ১১৪ জন নেপালি পর্যটক। নেপালের আটটি জেলা থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। কাদামাটির স্তূপ এবং অন্যান্য ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে উদ্ধারকাজ চলছে। চলছে প্রাণের খোঁজ। সেই সঙ্গে ফের হড়পা বানের আশঙ্কায় ত্রস্ত হিমালয়ের নদী উপত্যকা।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথম দিকে ধারণা করা হয়েছিল ভূমিকম্পের কারণে এই বিপর্যয় ঘটেছে। পরে ভূকম্পনসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানায়, ভূমিকম্প নয়, বরং ভূমিধস থেকেই ওই ভূকম্পনজনিত শক্তি তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
কাঠমান্ডু পোস্ট–এর তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ বিদেশি পর্যটকদের মধ্যে ১৭৭ জন ভারতীয়, ৬৩ জন মার্কিন, ৫৩ জন ইউক্রেনীয়, ৩৪ জন অস্ট্রেলীয় এবং ৩৩ জন ব্রিটিশ নাগরিক। রয়টার্সও জানিয়েছে, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, কানাডা, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের নাগরিকদের মধ্যে অনেকে নিখোঁজ রয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং জানিয়েছেন, দেশটির অন্তত ৩৪ নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। নিখোঁজদের একটি অংশ তিব্বতের কৈলাস–মানস সরোবর তীর্থযাত্রায় যাওয়া পর্যটক ও তীর্থযাত্রী। আবার অনেকে ট্রেকিং বা ভ্রমণের উদ্দেশ্যে নেপালের পার্বত্য এলাকায় গিয়েছিলেন। নেপালের পাশাপাশি তিব্বতেও এই দুর্যোগের ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক। সেখানে তিনজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।
এই আকস্মিক বন্যায় নেপাল ও চীনে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ এবং প্রাণহানির পর বেইজিংয়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সীমান্তের চীনা অংশে একটি ভূমিধস প্রতিরক্ষা বাঁধ ধসে এই বিপদ তৈরি করেছে কিনা, সেই প্রশ্ন উঠেছে। চীনের ভূখণ্ডে বিপদের পূর্বাভাস পাওয়া গেলে আগাম সতর্কতা দিয়ে ভাটির দিকে মানুষের প্রাণহানি কমানো সম্ভব ছিল কি না, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে বিভিন্ন মহলে। এর জবাবে চীন বলেছে, তাদের পক্ষ থেকে আগাম সতর্কতা না দেওয়ার কারণে নেপালের দিকে প্রাণহানি হয়েছে–এমন দাবি ‘ভুয়া’।
বন্যার সঠিক কারণ ও ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে তদন্ত চলছে। তবে এখন পর্যন্ত স্যাটেলাইট ছবি ও বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে হিমবাহের বরফ ও পাথরের বড় ধরনের ধসকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। রয়টার্সের পর্যালোচনা করা প্ল্যানেট ল্যাবসের স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, নেপাল–চীন সীমান্তের কাছে একটি হিমবাহের সামনের অংশের বড় একটি অংশ ভেঙে পড়েছে।
এর আগে, গত বছরের অগাস্টেও অতিরিক্ত তাপমাত্রায় তিব্বতের একটি হিমবাহ হ্রদ উপচে পড়ে আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়েছিল। ওই ঘটনায় ৯ জন মারা যায় এবং জিরং বন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হয়।









