পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) আজ। প্রায় ১৪ শ’ বছর আগে এই দিনে আরবের মরু প্রান্তরে মা আমিনার কোল আলো করে জন্ম নিয়েছিলেন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (দ.)। আবার এই দিনে তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, যিনি বিদ্রোহী কবি হিসেবেও পরিচিত। তিনি প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (দ.) এর আগমন ও তাঁর শানে প্রচুর নাতে রাসূল এবং গান লিখেছেন। ‘তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে/ মধু পূর্ণিমারি সেথা চাঁদ দোলে/ যেন ঊষার কোলে রাঙা–রবি দোলে/ কূল মখ্লুকে আজি ধ্বনি ওঠে, কে এলো ঐ/ কলেমা শাহাদতে বাণী ঠোঁটে, কে এলো ঐ/ খোদার জ্যোতি পেশানিতে ফোটে, কে এলো ঐ/ আকাশ–গ্রহ–তারা পড়ে লুটে, কে এলো ঐ/ পড়ে দরুদ ফেরেশ্তা, বেহেশ্তে সব দুয়ার খোলে…।’ ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে এই দিনে আরবের মক্কা নগরীর কুরাইশ বংশে মা আমিনার কোলে জন্ম নিয়েছিলেন হযরত মুহাম্মদ (স.)। তিনি এমন সময়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন, যখন পুরো বিশ্ব অন্যায়, অবিচার ও কুসংস্কারে নিমজ্জিত ছিল। আরবের সর্বত্র দেখা দিয়েছিল অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা। এ যুগকে বলা হতো ‘আইয়ামে জাহেলিয়াহ’। তখন মানুষ হানাহানি ও কাটাকাটিতে লিপ্ত ছিল। ‘ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ/ এলো রে দুনিয়ায়/ আয়রে সাগর আকাশ বাতাস/ দেখবি যদি আয়।’ মহানবী (দ.)-এর আগমন ছিল যেন ইব্রাহিম (আ.)-এর দোয়ার ফসল। তিনি আরবের মক্কায় সন্তান ইসমাইলের সঙ্গে কাবা শরিফের নির্মাণ সম্পন্ন করে দোয়া করেছিলেন, ‘হে আমাদের রব, তাদের মধ্যে থেকে একজন রাসুল প্রেরণ করুন, যে তাদের নিকট আপনার আয়াতগুলো তিলাওয়াত করবে, তাদের কিতাব ও হেকমত শিক্ষা দেবে আর তাদের পবিত্র করবে। নিশ্চয় আপনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ (আল কোরআন ০২:১২৯)। মহানবী (দ.) হলেন শেষ নবী। তিনি এসেছেন নবী আগমনের ধারাবাহিকতায় ঈসা (আ.)-এর পর। ঈসা (আ.) নিজেও তাঁর উম্মতকে মহানবী (দ.) শুভাগমন সম্পর্কে সুসংবাদ দিয়েছেন, ‘আমি একজন রাসুলের সুসংবাদদাতা, যিনি আমার পর আসবেন, যাঁর নাম আহমদ’ (আল কোরআন ৬১:৬)। মহানবী (দ.) এর পিতা ছিলেন আবদুল্লাহ। দাদা আবদুল মুত্তালিব ছিলেন তৎকালীন পবিত্র কাবাঘরের তত্ত্বাবধায়ক। জন্মের আগেই পিতা মারা যান। মা আমিনা দাদা আবদুল মুত্তালিবকে তাঁর শুভাগমনের সুসংবাদ দিলে তিনি তাঁর নাম রাখেন ‘মুহাম্মদ’ (সিরাতে ইবনে হিশাম, ১/১৫৮)।
হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম ও ওফাতের পুণ্য স্মৃতিময় দিন আজ ১২ রবিউল আউয়াল। সারা বিশ্বের মুসলমানরা এই দিনটিকে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) হিসেবে পালন করেন। দেশে দেশে নানা আনুষ্ঠানিকতায় দিবসটি উদযাপিত হবে। পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণী দিয়েছেন। দিবসটি সরকারি ছুটি, এদিন সংবাদপত্রসমূহ বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করবে। বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেসরকারি টিভি চ্যানেলসমূহ বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করবে।
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাঁর বাণীতে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (দ.)-এর শান্তি, ন্যায়, সহনশীলতা, ভালোবাসা ও মানবিকতার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে হিংসা, বিদ্বেষ, বিভেদ ও অন্যায় পরিহার করে শান্তি, সমপ্রীতি, সাম্য ও মানবিকতার ভিত্তিতে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) উপলক্ষ্যে দেশবাসী ও বিশ্বের সকল মুসলমানকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও মোবারকবাদ জানান।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বাণীতে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষ্যে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (দ.)-এর শান্তি, ন্যায়, সহমর্মিতা, ক্ষমা ও মানবিকতার আদর্শ অনুসরণ করে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ন্যায় ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন। পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) উপলক্ষ্যে তিনি দেশবাসীসহ সমগ্র মুসলিম উম্মাহর প্রতি আন্তরিক মোবারকবাদ ও শুভেচ্ছা জানান।
চট্টগ্রামে বর্ণাঢ্য জশনে জুলুস : চট্টগ্রামে বর্ণাঢ্য জশনে জুলুসের আয়োজন করেছে আনজুমানে রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট। এবার ৫৫ বারের মতো জশনে জুলুস বের করা হবে। আয়োজকদের প্রত্যাশা, এবারও জুলুসে ৫০ লাখের বেশি মানুষের সমাগম হতে পারে।
এবারের জুলুসে নেতৃত্ব দেবেন দরবারে সিরিকোটের সাজ্জাদানশীন পীর আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ সাবির শাহ (মাজিআ)। অতিথি থাকবেন সাহেবজাদা সৈয়্যদ মুহাম্মদ কাসেম শাহ (মাজিআ) ও সাহেবজাদা সৈয়্যদ মুহাম্মদ আকিব আহমেদ শাহ (মাজিআ)। সকাল ৮টায় ষোলশহরের আলমগীর খানকা–এ–কাদেরিয়া সৈয়্যদিয়া তৈয়্যবিয়া থেকে জুলুস শুরু হবে। জশনে জুলুসের গোড়াপত্তন হয় ১৯৭৪ সালে। পীরে কামেল আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ (র.)-এর দিকনির্দেশনায় এবং আঞ্জুমান–এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনায় নগরীর বলুয়ার দিঘির পাড় খানকাহ এ কাদেরিয়া সৈয়দিয়া থেকে প্রথম এ জুলুস বের হয়। জুলুসকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে উৎসবের সাজে সেজেছে চট্টগ্রাম। সড়কের দুই পাশে পতাকা, ব্যানার–ফেস্টুন, তোরণ ও আলোকসজ্জায় বদলে গেছে নগরের চেহারা। কাজীর দেউড়ি, মুরাদুপুর, ষোলশহর, জিইসি মোড়, ২ নম্বর গেটসহ আশপাশের বেশ কয়েক কিলোমিটার পথজুড়ে শোভা পাচ্ছে সুদৃশ্য তোরণ, ব্যানার, ফেস্টুন ও রঙিন পতাকা। রাতে বিভিন্ন ভবনে করা হয়েছে বর্ণিল আলোকসজ্জা। জুলুস ঘিরে ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। প্রায় ১০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক শৃঙ্খলা ও ব্যবস্থাপনায় দায়িত্ব পালন করবেন। একই সঙ্গে নগর পুলিশ নিয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থা। জুলুস চলাকালে লালখান বাজার–মুরাদপুর ফ্লাইওভার বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
আনজুমান ট্রাস্টের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মনজুর আলম মনজু বলেন, জশনে জুলুসের মূল বার্তা হলো–শান্তি, মানবতা, অহিংসা এবং প্রিয়নবীর (দ.) সুন্নাহ ও আদর্শকে জীবনে ধারণ করা। অশান্ত বিশ্বে প্রিয়নবীর সুমহান আদর্শ প্রচার এবং মুসলিম মিল্লাতের ঐক্য সুদৃঢ় করাই এই জুলুসের প্রধান লক্ষ্য।










