শোক কাটিয়ে নায়ক ইউস্তাকিও

দ. আফ্রিকাকে হারিয়ে শেষ ষোলোতে কানাডা

স্পোর্টস ডেস্ক | মঙ্গলবার , ৩০ জুন, ২০২৬ at ৫:৩৪ পূর্বাহ্ণ

স্টিফেন ইউস্তাকিওর জীবনে গত কয়েক বছর ছিল একের পর এক ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডিতে ভরা। অল্প সময়ের ব্যবধানে হারিয়েছেন মা ও বাবাকে। কিন্তু সেই শোক তাকে থামাতে পারেনি। বরং বিশ্বকাপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে অধিনায়কের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে কানাডাকে প্রথমবারের মতো শেষ ষোলোয় তুলে ইতিহাসের অংশ হয়ে গেলেন এই মিডফিল্ডার। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে নির্ধারিত সময়ের পর যোগ করা সময়ে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ডিবক্সের বাইরে বল পেয়ে দুর্দান্ত এক শটে গোল করেন ইউস্তাকিও। দক্ষিণ আফ্রিকান গোলরক্ষক রনওয়েন উইলিয়ামসের কোনো সুযোগই ছিল না। সেই একমাত্র গোলেই ১০ ব্যবধানে জয় পায় কানাডা এবং প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব শেষ ষোলো নিশ্চিত করে। এবারসহ তিনবার বিশ্বকাপ খেলছে কানাডা। আগের দুবার গ্রুপ পর্বেই আটকা পড়ে তাদের স্বপ্ন। এবার গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে শেষ বত্রিশের বাধাও পেরিয়ে গেছে দলটি। এই প্রথম শেষ ষোলোতে নাম লেখাল তারা। লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়ামে উত্তেজনায় ঠাসা এ ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে স্টিভেন ইউস্তাকিওর গোলটিই কানাডাকে জয় এনে দেয়। ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দলই সমানে সমান লড়াই চালিয়েছে। প্রথমার্ধের শুরুতে বল দখলের লড়াইয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা কিছুটা এগিয়ে থাকলেও (৬৫ শতাংশ বল দখলে), আক্রমণভাগে কানাডাই ছিল বেশি সক্রিয়। ২২তম মিনিটে ডেরেক কর্নেলিউসের হেড সরাসরি দক্ষিণ আফ্রিকার গোলকিপার রনওয়েন উইলিয়ামসের হাতে জমা পড়ে। ৪৪তম মিনিটে কানাডা গোল পাওয়ার খুব কাছাকাছি চলে এসেছিল, তবে ময়জে বোমবিতোর হেড লাইন থেকে ফিরিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকাকে রক্ষা করেন অব্রে মদিবা। ম্যাচের প্রথমার্ধ গোলশূন্য শেষ হলেও বিরতির আগে রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন কানাডা কোচ জেসি মার্শ।

যোগ করা সময়ে লারিয়াকে ফাউল করার অভিযোগ তুলে পেনাল্টি দাবি করেছিল কানাডা, কিন্তু রেফারি ও ভিএআর সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন। দ্বিতীয়ার্ধে আক্রমণের গতি আরও বাড়ায় কানাডা। ৬৫তম মিনিটে জোনাথন ডেভিডের শট গোলকিপার রনওয়েন উইলিয়ামস পা বাড়িয়ে রুখে দেন এবং এরপর এমবেকেজেলি এমবোকাজি রক্ষণভাগের অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে দলকে বিপদ থেকে রক্ষা করেন। তবে শেষরক্ষা হয়নি দক্ষিণ আফ্রিকার। ম্যাচের ৯১তম মিনিটে দুর্দান্ত গোলে কানাডার জয়ের পথ প্রশস্ত করেন স্টিভেন ইউস্তাকিও। এই পরাজয়ে স্বপ্নভঙ্গ হলেও, এবারের বিশ্বকাপে আফ্রিকান দলগুলোর পারফরম্যান্স ছিল চোখে পড়ার মতো। গ্রুপ পর্বে অংশ নেওয়া ১০টি দেশের মধ্যে ৯টিই নকআউট রাউন্ডে (রাউন্ড অব ৩২) জায়গা করে নিয়েছিল, যা মহাদেশীয় ফুটবলের নতুন সাফল্যের বার্তা বহন করছে। অন্যদিকে, ইতিহাসের প্রথমবার বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে খেলার স্বাদ পাওয়া দক্ষিণ আফ্রিকা লড়াই করলেও অভিজ্ঞতার কাছে নতি স্বীকার করতে হয়। এদিকে ২৯ বছর বয়সী ইউস্তাকিওর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তগুলোর একটি হয়ে থাকবে এই গোল। তবে এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে গভীর ব্যক্তিগত বেদনার গল্প। ২০২৩ সালের এপ্রিলে পোর্তোর হয়ে সান্তা ক্লারার বিপক্ষে ম্যাচ চলাকালীন ব্রেন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তার মা এসমেরালদা। ঠিক এক বছর পর হৃদ্‌রোগে বাবাকেও হারান তিনি। ম্যাচ শেষে আবেগাপ্লুত ইউস্তাকিও বলেন, ‘আমি যা কিছু করি, সবকিছু আমার পরিবারের জন্য। আমার বাবামা, আমার প্রেমিকা, আমার মেয়ে, আমার ভাই এবং দেশের বন্ধুসবার জন্য।’ ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে স্পোর্টসনেট কানাডাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইউস্তাকিওর বড় ভাই এবং ইন্টার টরন্টো এফসির প্রধান কোচ মাউরো ইউস্তাকিও বলেন, দুই ভাই সচেতনভাবেই শোককে শক্তিতে রূপ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মাউরো বলেন, ‘আমাদের বাবামা আমাদের ডানা দিয়েছিলেন। তাই এখন উড়ার দায়িত্বটা আমাদের নিজেদেরই।’ কানাডার বয়সভিত্তিক দল দিয়েই আন্তর্জাতিক ফুটবলে যাত্রা শুরু করেছিলেন ইউস্তাকিও। পরে কিছু সময় পর্তুগালের অনূর্ধ্ব২১ দলের হয়েও খেলেন এবং ২০১৯ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের বাছাইপর্বে অংশ নেন। তবে একই বছরের ফেব্রুয়ারিতে স্থায়ীভাবে কানাডার হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এরপর কনকাকাফ নেশনস লিগে জাতীয় দলে অভিষেক হয় এবং ২০২১ গোল্ড কাপে করেন প্রথম আন্তর্জাতিক গোল। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ, ২০২৩ কনকাকাফ নেশনস লিগের ফাইনাল এবং পোর্তোর হয়ে ২০২৫ ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপেও খেলেছেন এই মিডফিল্ডার। নিয়মিত অধিনায়ক আলফোনসো ডেভিস ইনজুরিতে ছিটকে যাওয়ায় দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে কানাডাকে নেতৃত্ব দেন ইউস্তাকিও। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, ‘এই জয়টা পাওয়ার জন্য আমরা জানপ্রাণ দিয়ে লড়েছি। আমরা এই ঐতিহাসিক জয় সব কানাডিয়ানের উদ্দেশে উৎসর্গ করতে চাই।’

পূর্ববর্তী নিবন্ধ২৩০ রানে পিছিয়ে কঠিন পরীক্ষার সামনে বাংলাদেশ
পরবর্তী নিবন্ধবান্দরবানে পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়া ৮ শিক্ষার্থীর দায়িত্ব নিলেন জেলা প্রশাসক