রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন : আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়কে কাজে লাগাতে হবে

| রবিবার , ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৫:৪৭ পূর্বাহ্ণ

স্বদেশ থেকে বিতাড়িত আশ্রয়হীন রোহিঙ্গারা আমাদের দক্ষিণ সীমান্তের আশ্রয় শিবিরে এই পর্যন্ত ৯ বছর অতিবাহিত করছে। এই নয় বছর বিভিন্নভাবে রোহিঙ্গাদের তাদের স্বদেশ ভূমিতে প্রত্যাবাসনের চেষ্টা করা হয়েছে। এ চেষ্টা বা উদ্যোগ কখনো দ্বি পাক্ষিক কখনো বহুপাক্ষিকের বেড়াজালে আটকেছে, ঘুরপাক খেয়েছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রচেষ্টা বা উদ্যোগ এই এত বছর সফলতার কোন আলোই প্রত্যক্ষ করেনি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের নিরাপদে তাদের দেশ মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে জাতিসংঘে রোহিঙ্গা সংকট বিষয়ক উচ্চ পর্যায়ের কমিটির বৈঠকে পাঁচটি প্রস্তাব তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, আমরা চাই তারা নিরাপদে, স্বেচ্ছায়, মর্যাদার সঙ্গে এবং তাদের অধিকার সুরক্ষিত রেখে মিয়ানমারে নিজ ঘরে ফিরে যাক। বাংলাদেশ মানবিকতার সঙ্গে তার দায়িত্ব পালন করেছে। এখন আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়কেও দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে তার দায়িত্ব পালন করতে হবে। প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হলে বাংলাদেশ তাদের প্রত্যাবাসনে সহায়তা করতে প্রস্তুত থাকবে। গত বুধবার সকালে জাতিসংঘে রোহিঙ্গা সংকট বিষয়ক উচ্চ পর্যায়ের কমিটির বৈঠকে কথা বলেন বাংলাদেশ সরকারপ্রধান। গাম্বিয়া ও বাংলাদেশের যৌথ আয়োজনে এ বৈঠক হয়। বাংলাদেশ ছাড়াও যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক ও মালয়েশিয়াসহ আটটি দেশের প্রতিনিধি সেখানে অংশ নেন। প্রধানমন্ত্রীর ৫ প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসইভাবে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের জন্য একটি সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ প্রণয়ন করতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও অন্যান্য রাষ্ট্রকে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় সহায়তা করতে হবে এবং তাদের প্রভাব কাজে লাগিয়ে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে হবে, যা প্রত্যাবাসনের অনুকূল। রোহিঙ্গাসহ মিয়ানমারের বেসামরিক জনগণের ওপর সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে তাদের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা ফিরে যাওয়ার বিষয়ে আস্থা ফিরে পান। আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়কে রোহিঙ্গাদের জন্য পর্যাপ্ত ও পূর্বানুমেয় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। একইভাবে আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেও সহায়তা করতে হবে। তাদের উদার আতিথেয়তার কারণে তাদের উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা যেন বাধাগ্রস্ত না হয়। টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি অপরিহার্য। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে জবাবদিহি নিশ্চিতের প্রচেষ্টায় গাম্বিয়ার নেতৃত্বের জন্য আমরা গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। একইসঙ্গে আমরা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও স্বীকার করি, যেখানে ব্যক্তিগত অপরাধের দায় নির্ধারণের পাশাপাশি অন্যান্য আন্তর্জাতিক বিচার ও তদন্ত ব্যবস্থাও কাজ করছে। আন্তর্জাতিক বিচারিক ও তদন্ত ব্যবস্থাগুলোকে অব্যাহত সহায়তা দিতে হবে। গুরুতর অপরাধের জন্য দায়ীদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে এবং এই অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা উসকে দেওয়া মাদকভিত্তিক অর্থনীতি, মানবপাচার, ডিজিটাল প্রতারণা, অবৈধ অস্ত্র এবং অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করতে হবে। তারেক রহমান বলেন, এখন সহমর্মিতা থেকে সংকটের মূল কারণ ও তার সমাধান খোঁজার পথে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে।

বলা জরুরি যে, রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশের বিভিন্ন সমস্যা হচ্ছে। তারা এখন বিশ্বের জন্যও হুমকি। রোহিঙ্গাদের যদি দ্রুত ফিরিয়ে নেওয়া না হয় এ সমস্যা আরও বাড়তে থাকবে। অভিযোগ আছে, বিভিন্ন দেশ এই সমস্যা জিইয়ে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে। এসব সত্ত্বেও মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের অধিকার ফিরিয়ে না দিয়ে তাদের ওপর মানসিক নির্যাতন করছে। বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের জীবন বাঁচাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ ও কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। অথচ বাংলাদেশের নিরাপত্তা আজ ঝুঁকিতে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, দীর্ঘমেয়াদি রোহিঙ্গা সংকট এখন জটিলতার আবর্তে রয়েছে। বাংলাদেশ এ সমস্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। সংকট মোকাবিলায় পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা নিশ্চিতের পাশাপাশি অন্যান্য সমস্যা সমাধানে সব পক্ষকে একত্রে বহুমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশ সরকারকে যে কোনো পরিস্থিতিতে চলমান রোহিঙ্গা সমস্যাকে অগ্রাধিকার তালিকায় রেখে সংশ্লিষ্ট সবার সহায়তায় সংকট সমাধানের প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা বিষয়ক এক গবেষক তাঁর এক লেখায় লিখেছেন, মিয়ানমার ও রাখাইন রাজ্যে যুদ্ধ বন্ধে এবং স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক দেশগুলোকে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। রোহিঙ্গাদের জন্য রাখাইন রাজ্যে নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করার বিষয়টি ভেবে দেখতে হবে। জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দাতা দেশগুলোর সহায়তায় রোহিঙ্গাদের রাখাইনে গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে আরাকান আর্মি, সেখানকার রাজনৈতিক দল ও স্থানীয় রাখাইনদের নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের বিষয়টি নিয়ে এনইউজি, আরাকান আর্মি ও মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রাখতে হবে। দেশে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ক্যাম্পের জনঘনত্ব কমাতে হবে। ভাসানচরে কিছু রোহিঙ্গা স্থানান্তর করা হলে এ সমস্যা কিছুটা কমবে। এজন্য প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে। নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিজিবি ও কোস্টগার্ডের তৎপরতা চলমান রাখতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, রোহিঙ্গা সমস্যা আমাদের সক্ষমতা ও সরলতার উপর বড় আঘাত। এই সমস্যা সমাধানে জাতিসংঘ আরো জোরালো ভূমিকা রাখবে বলে আশা রাখি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে