অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, তৈরি পোশাক শিল্প যেসব সুবিধা পাচ্ছে, ভবিষ্যতে অন্য যেকোনো রপ্তানিমুখী শিল্পও একই সুবিধা পাবে। গত সোমবার রাজধানীর বনানীতে হোটেল শেরাটনে দৈনিক বণিক বার্তা আয়োজিত ‘সোনার বাংলা’ নীতি–আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের জ্বালানি নীতিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ২০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। আসন্ন বাজেটেও এর প্রতিফলন দেখা যাবে। একই সঙ্গে কয়লা ও অন্যান্য উৎসকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি সমন্বিত জ্বালানি মিশ্রণ (এনার্জি মিক্স) গড়ে তোলার কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আমাদের প্রাথমিক অবকাঠামো হচ্ছে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, গ্যাস সরবরাহ এবং শক্তিশালী ইন্টারনেট ব্যবস্থা। অতীতে এসব খাতে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। তবে সরকার এখন বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে সমাধানের চেষ্টা করছে। দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে অন্তত দুই বছর সময় লাগবে। অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য কাঁচামাল আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়া হবে। কেউ স্বর্ণালঙ্কার, ডায়মন্ড কাটিং কিংবা অন্য যেকোনো পণ্য রপ্তানি করতে চাইলে তাদেরও বন্ড সুবিধা বা ডিউটি–ফ্রি কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হবে। এ সময় আমলাতান্ত্রিক জটিলতার সমালোচনা করে অর্থমন্ত্রী বলেন, অনেক সময় বলা হয়, সুবিধা দিলে চুরি হয়ে যাবে। কিন্তু চুরি ঠেকানো সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্ব। চুরির ভয়ে সরকার নীতি প্রণয়ন বন্ধ রাখতে পারে না। আর্থিক খাতের বিষয়ে তিনি বলেন, নন–ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো (এনবিএফআই) মূলত ভোক্তা পর্যায়ের ঋণসেবা দেওয়ার কথা থাকলেও অনেক প্রতিষ্ঠান উচ্চ সুদে শিল্প খাতে বিনিয়োগ করেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। এ খাতে আরও সতর্কতা ও ভারসাম্য প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে এবং শিল্প খাতের বিকাশে দেশি–বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য অর্থমন্ত্রীর এ বক্তব্য আশাবাদের সৃষ্টি করেছে। এছাড়া সরকার বিভিন্ন ধরনের শিল্পনীতি প্রণয়ন করছে, যা উদ্যোক্তাদের জন্য সুবিধাজনক পরিবেশ তৈরি করছে। এসব নীতির লক্ষ্য হলো শিল্প খাতের প্রসার ঘটানো এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানো। দেশের আর্থিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে শিল্প খাতের বিকাশে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, অন্যদিকে তা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানিমুখী খাত হিসেবে পরিচিত। ১৯৫০–এর দশকে পশ্চিমা দেশগুলোতে তৈরি পোশাক শিল্পের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়। সেই সময় থেকেই এই খাত আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আশির দশকের শুরুতে বাংলাদেশ এই খাতে বৈদেশিক সাহায্য পেতে শুরু করে, যা দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের ভিত্তি গড়ে তুলতে সহায়ক হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাংলাদেশের শিল্প খাত দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হলেও বর্তমানে এটি নানামুখী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা, কাঁচামালের উচ্চ খরচ এবং নীতিগত জটিলতা এই খাতের অগ্রগতিতে বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা না গেলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি শিল্প খাতের একটি বড় সমস্যা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির ফলে শিল্প উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। বিশেষত ক্ষুদ্র এবং মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো এই চাপে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উচ্চ সুদহার, যা শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ গ্রহণ এবং বিনিয়োগকে কঠিন করে তুলছে। তাঁরা বলেন, সামগ্রিক অর্থনীতির যে পরিস্থিতি তা মূল্যস্ফীতির চাপ এবং ব্যবসার পরিবেশসহ বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে গিয়েছে। যে শিল্পের ওপর রপ্তানি আয়ের একক নির্ভরতা, সে শিল্পকেই বছরজুড়ে বহুমাত্রিক চাপ সামলাতে হয়েছে। রপ্তানিকারকরা নানা সংকট, অভিযোগ নিয়ে কথা বলছেন। কোনো সমাধান হচ্ছে না। এখন মূল চ্যালেঞ্জ জ্বালানি খাত, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, ব্যাংকিং খাত, কাস্টমস সংক্রান্ত শর্ত। ওসব সমস্যা সমাধান না হলে নিশ্চিতভাবে রপ্তানি আয় কমে যাবে। তবে সরকারের নতুন টেকসই নীতি ও পদক্ষেপ আগামী দিনের রপ্তানি আয়ে গতি আনবে বলে তাঁরা আশা প্রকাশ করেন।









