মৌচাকের কান্না

সরোজ আহমেদ | বুধবার , ১৯ আগস্ট, ২০২৬ at ৫:৪৯ পূর্বাহ্ণ

সবুজ গাছপালায় ঘেরা সজলদের গ্রামের বাড়িটা যেন একটা ছবির মতো সুন্দর বাগান বাড়ি। চারপাশের আম, জাম, কাঁঠালের নিবিড় ছায়া, সুশীতল পুকুরে মাছের অবাধ খেলা আর পাখপাখালির মিষ্টি কলকাকলি সজলকে চুম্বকের মতো টানে। তাই শহরের যান্ত্রিকতা ছেড়ে সুযোগ পেলেই সে গ্রামে ছুটে আসে। এবারও গ্রীষ্মের ছুটি হতেই মাকে সাথে নিয়ে সে চলে এসেছে এই শান্তির নীড়ে।

একদিন বিকেলে বাড়ির দক্ষিণের খোলা জায়গায় সমবয়সীদের সাথে জমিয়ে ক্রিকেট খেলছিল সজল। হঠাৎ একটা শট গিয়ে পড়ল পাশের কাঁঠালতলায়। বলটা কুড়াতে গিয়ে সজলের চোখ আটকে গেল হেলানো বড় কাঁঠাল গাছটার একটা নিচু ডালে। সেখানে ঝুলছে ছোট্ট, নিখুঁত একটা মৌচাক! গুটি কয়েক মৌমাছি তার চারপাশে অলস ভঙ্গিতে উড়ছে। সজল বইয়ে পড়েছে, এভাবেই নাকি মৌমাছিরা অক্লান্ত পরিশ্রমে ফুল থেকে মধু এনে মৌচাকে জমা করে।

কৌতূহলী সজল ঘরে ফিরেই মৌচাকের খবরটা মাকে দিল। মা শুনেই আঁতকে উঠে বললেন, “খবরদার সজল! ওদিকে একদম পা বাড়াবে না। মৌমাছি কামড়ালে আর রক্ষা নেই, বিষের যন্ত্রণায় ছটফট করতে হবে।”

মায়ের নিষেধাজ্ঞা শুনে সজল আর ওমুখো হলো না বটে, তবে রোজ দূর থেকে গভীর বিস্ময় নিয়ে দেখত, কীভাবে মৌচাকটি প্রতিদিন একটু একটু করে আকারে বড় হচ্ছে।

মা আশ্বাস দিয়েছিলেন, চাকটা যখন মধুতে ভরপুর হবে, তখন অভিজ্ঞ লোক ডেকে মধু সংগ্রহ করা হবে। তারপর হবে আমাদের মধুপিঠা উৎসব!

উৎসবের কথা ভাবতেই সজলের জিভে জল চলে আসত। আর সেই লোভেই মৌচাকটির ওপর তার নজরদারি দিন দিন আরও বেড়ে গেল। কিন্তু এক বিকেলে সজল যা দেখল, তা সে নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছিল না। কে বা কারা যেন নিছক আনন্দের বশে একটা বড় ঢিল ছুঁড়ে মৌচাকটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে! এত নজরদারির পরেও এই সর্বনাশ দেখে সজলের বুকটা কেঁপে উঠল, চোখে জল চলে এলো।

আরেকটু ভালো করে দেখার জন্য সে কয়েক কদম এগিয়ে গেল। ভাঙা চাকটির চারপাশে অসংখ্য মৌমাছি তীব্র কান্নার মতো ভনভন শব্দে উড়ছে। মাটিতে ছড়িয়েছিটিয়ে পড়ে আছে শত শত মৃত মৌমাছি। সজলের পায়ের ঠিক কাছেই দুটো মৌমাছি আধমরা অবস্থায় ছটফট করছিল। সজল আর স্থির থাকতে পারল না। সে মাটিতে হাঁটু গেঁড়ে বসে পরম মমতায় বাম হাতের তালুতে দুটো মৌমাছি তুলে নিল।

তাদের ডানোগুলো ছিটকে আসা ঢিলের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত, ছোট্ট শরীর দুটো নিস্তেজ হয়ে কাঁপছে। সজলের চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা তপ্ত জল গড়িয়ে পড়ল ঠিক মৌমাছি দুটোর গায়ের ওপর। অদ্ভুত ব্যাপার, মানুষের সেই ভালোবাসার অশ্রুর ছোঁয়া পেয়েই যেন একটা মৌমাছি তার ছোট্ট শুঁড়টা একটু নাড়ালো।

সজল বিড়বিড় করে বলল, “কেন এমন করল ওরা? তোমরা তো কারও কোনো ক্ষতি করোনি!”

ঠিক তখনই সজলের মনে হলো, বাতাস জুড়ে যে হাজার হাজার মৌমাছির আর্তনাদ, ওটা আসলে কোনো রাগের গর্জন নয়ওটা এক বুক ফাটানো কান্নার সুর। যে ঘরটাকে তারা প্রতিদিন তিল তিল করে গড়ে তুলছিল, তা এখন মাটিতে ধূলিসাৎ।

সজল পরম যত্নে মৌমাছি দুটোকে নিয়ে বারান্দায় চলে এল। মায়ের বকুনির ভয় ভুলে সে তুলো দিয়ে আলতো করে তাদের শরীরটা মুছে দিল। তারপর এক ফোঁটা চিনির জল আঙুলের ডগায় নিয়ে তাদের মুখের সামনে ধরল। অনেকক্ষণ পর অলৌকিকভাবেই যেন, মৌমাছি দুটো একটু নড়েচড়ে বসল এবং তাদের ছোট্ট মুখ দিয়ে সেই রসটুকু চুষে নিতে লাগল।

মৌমাছি দুটোর বেঁচে ওঠার লড়াই দেখে সজলের মনে পড়ে গেল বইয়ে পড়া সেই দিনগুলোর কথা। এরা কত পরিশ্রমী! মাছি দুটো ডানা ঝাপটাতেই সজলের চশমার কাঁচ যেন এক জাদুকরী পর্দায় রূপ নিল। সে চোখের সামনে দেখতে পেল সেই অলস দুপুরের দৃশ্যযখন সে বন্ধুদের সাথে ক্রিকেট খেলছিল, তখন এই ছোট্ট প্রাণগুলো এক ফুল থেকে অন্য ফুলে ছুটে বেড়াচ্ছিল।

একটি মাত্র চামচ মধু তৈরি করতে শত শত মৌমাছিকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত হাজার হাজার ফুলে ঘুরে বেড়াতে হয়। সামান্য এক ফোঁটা মধুর পেছনে লুকিয়ে থাকে তাদের পুরো জীবনের ক্লান্তিহীন শ্রম, তাদের নিখুঁত শৃঙ্খলা আর অদ্ভুত এক স্থাপত্যশৈলী। তারা শুধু নিজেদের জন্য মধু জমায় না; ফুল থেকে ফুলে ঘুরে বেড়ানোর সময় তাদের পায়ে লেগে থাকা পরাগরেণু ছড়িয়ে দেয় চারপাশের গাছপালায়। সজল বুঝতে পারল, আজ তাদের এই বাগানে এত যে ফল, এত যে সবুজতার পেছনে লুকিয়ে আছে এই ছোট্ট মৌমাছিদেরই নীরব অবদান। এরা না থাকলে তো পৃথিবীর বুকে নতুন কোনো গাছের জন্মই হতো না, মানুষ পেত না কোনো সুমিষ্ট ফল!

বিকেলের আলো যখন ম্লান হয়ে আসছে, তখন সজলের হাতের মৌমাছি দুটো একটু সুস্থ হয়ে ডানা মেলল। তারা সজলের আঙুলের ডগায় এসে বসল, যেন সজলের এই ভালোবাসার জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছে। সজল আলতো করে হাতটা আকাশের দিকে বাড়িয়ে দিতেই তারা উড়ে গিয়ে মিশে গেল বাগানের শেষ আলোয়।সজল উঠে দাঁড়িয়ে ভাঙা মৌচাকটার দিকে তাকাল। তার মন থেকে মধুর পিঠা খাওয়ার লোভ উবে গেছে, সেখানে এখন জমা হয়েছে এক গভীর সম্মান আর একরাশ অনুশোচনা। মানুষের সামান্য একটু অসচেতনতা বা নিছক আনন্দের ঢিল একটা পুরো সৃষ্টিকে কতটা ধ্বংস করে দিতে পারে, সজল তা আজ নিজের চোখে দেখল।

সন্ধ্যায় মা যখন সজলকে খুঁজতে এলেন, সজল মায়ের হাতটা ধরে বলল, “মা, ওরা শুধু আমাদের মধুই দেয় না, আমাদের চারপাশের এই সুন্দর প্রকৃতিকেও বাঁচিয়ে রাখে। ওরা আমাদের কত বড় বন্ধু, তাই না মা? আমি আর কখনো কাউকে মৌচাকে ঢিল মারতে দেব না।”

মা সজলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। সজলের চোখে তখনো জল, কিন্তু সেই জলে এবার আর কোনো দুঃখ ছিল না; ছিল প্রকৃতির সবচেয়ে ছোট এবং সবচেয়ে উপকারী এক বন্ধুর প্রতি পরম মমতা আর গভীর শিক্ষা।

পূর্ববর্তী নিবন্ধশরতের ছবি
পরবর্তী নিবন্ধনজরুল সাহিত্যে মহানবী (দ.)