মালিক-শ্রমিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মে দিবসের তাৎপর্য সুদূরপ্রসারী

| শুক্রবার , ১ মে, ২০২৬ at ৯:৫০ পূর্বাহ্ণ

মহান মে দিবস আজ। বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম আর সংহতির দিন। আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। শ্রমিকের শ্রমের মর্যাদা ও অধিকার বাস্তবায়নের দাবিতে চেতনাকে শাণিত করার দিন। বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় ৮০ টি দেশ এদিন সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে থাকে। আজ এ দিবসটি এমন এক সময়ে পালিত হচ্ছে, বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বৈশ্বিক উষ্ণতায় প্রচণ্ড তাপদাহে ভয়াবহ অবস্থা।

১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের শ্রমিকেরা আট ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন। সেদিন শ্রমিকেরা ১০১২ ঘণ্টার কর্মদিবসের বিপরীতে আট ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে জীবন দিয়েছিলেন। সেই আত্মদানের পথ ধরে পৃথিবীর দেশে দেশে শ্রমজীবী মানুষদের দীর্ঘ সময় ধরে আন্দোলন করতে হয়েছে ন্যায্য মজুরি, অবকাশ, মানবিক আচরণ, স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ কর্মপরিবেশের দাবিতে। আট ঘণ্টার কর্মদিবসের দাবি অর্জিত হয়েছে, কর্মপরিবেশেরও কিছুটা উন্নতি হয়েছে; কিন্তু শ্রমজীবীদের পেশাগত জীবনে নিরাপত্তা ও মানবিক অধিকারগুলো অর্জিত হয়নি।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, মে দিবস শুধুমাত্র একটি ঐতিহাসিক দিন নয়, এটি আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের প্রতি একটি প্রেরণা। শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে আমাদের শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য অধিকার ফিরে পাবে। এ ব্যাপারে সরকারের, মালিকপক্ষের, এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শ্রমিকদের সম্মান, তাদের অধিকার এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, আমরা দেশের উন্নয়নকে আরো শক্তিশালী করতে পারব।

তাঁরা বলেন, হাত গুটিয়ে বসে দেশের কোনো ভবিষ্যৎ নেই, কিছু হবে না বলে বিলাপ না করে এগিয়ে যাবার সংস্কৃতিকে মে দিবসের অঙ্গ করে তুলতে হবে। শ্রমিক আন্দোলনের সাথে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মেলবন্ধন রচনা করতে হবে। শ্রমিকের চেতনার জায়গাটাকে আরও তীক্ষ্ণধারালো করে তুলতে হবে। শ্রমিকের যে অধিকার আছে, তারা যে দাবি করতে পারে, তাদের যে দাবি করার অধিকার রয়েছে, সেই বোধ বা চেতনা জাগাতে হবে। তাদের মধ্যে এই বোধ তৈরি এবং তাদের দুর্বলতম ক্ষেত্রসমূহ চিহ্নিত করে শিল্পীসাহিত্যিকবুদ্ধিজীবী ও শ্রমিক শ্রেণির যুথবদ্ধতায় শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে হবে।

বাংলাদেশের শ্রমিকদের, বিশেষ করে পোশাকশিল্প, জাহাজশিল্প, ইমারত নির্মাণ শিল্পসহ অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্রে কর্মরত লাখো শ্রমিক উপযুক্ত পারিশ্রমিক ও অন্যান্য অধিকার পান না। মৌলিক চাহিদা পূরণ করে মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজন জাতীয়ভাবে ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত করা কিন্তু কাগজের সেই নিয়মের বাস্তবায়ন এখনো হয়নি। কেবল শ্রমবৈষম্য নয়, শিক্ষা থেকে শুরু করে চাকরি ক্ষেত্রে বৈষম্য একপর্যায়ে ককটেলের মতোই বিস্ফোরিত হয়েছে! যে আন্দোলনের ঢেউ ছাত্র জনতাকে এক কাতারে শামিল করেছে রাজপথে। জীবন উৎসর্গ করেছে তরুণরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন উন্নত দেশে শ্রমিকদের বেতনভাতা, সুযোগসুবিধা, সম্মানজনক হলেও উন্নয়নশীল দেশের শ্রমিকদের ভাগ্য বদল হয়নি। বাংলাদেশ জেনেভা কনভেশনে স্বাক্ষর করে শ্রমজীবীদের অধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু তা মানা হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক ও সাংবিধানিক আইন আমান্য করে শিশু শ্রমিক দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে। ৭৫ ভাগ নারী শ্রমিক দেশে তৈরি পোশাক শিল্পে কাজ করছে। তারা বেতন বৈষম্যসহ নানা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। কারখানায় দুর্ঘটনার শিকার হয়ে শ্রমিকরা আহত ও প্রাণ হারাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে তাদের সম্মানজনক ক্ষতি পূরণ দেওয়া হয় না। শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থ রক্ষায় আইন আছে। কিন্তু তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। যদিও আজ বাংলাদেশের শ্রম পরিবেশ অতীতের তুলনায় যতটা এগিয়েছে, তার পেছনেও রয়েছে শ্রমিকদের ত্যাগ ও সংগ্রাম। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য মজুরির দাবি এখনো উপেক্ষিত, এখনো তাঁদের বিরাট অংশ মৌলিক মানবাধিকার থেকেও বঞ্চিত।

মে দিবসের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি শ্রমিক শ্রেণির জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। মালিকশ্রমিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই দিবসের তাৎপর্য সুদূরপ্রসারী। এর ফলে শ্রমিকদের দৈনিক কাজের সময় আট ঘণ্টায় নেমে আসে এবং তারা তাদের শ্রমের ন্যায্য মর্যাদা পেতে শুরু করেন। মে দিবসের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে শ্রমজীবী মানুষের জীবনে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচিত হয়, তার প্রভাবে ধীরে ধীরে সামাজিক শ্রেণিবৈষম্য হ্রাস পেতে শুরু করে। শ্রমিক শ্রেণির মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য আমাদের এখন ভাবতে হবে। আমরা বাংলাদেশের ও সারা বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষকে মে দিবসের শুভেচ্ছা ও সংহতি জানাই।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে