প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বহুল প্রতীক্ষিত চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়ককে ছয় লেনে রূপান্তরের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, অবশ্যই এই মহাসড়ককে বর্তমান সরকার চার বা ছয় লেনে রূপান্তরের কাজ শুরু করবে। পর্যটন নগরী, মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দরসহ ভৌগোলিকগত কারণে কক্সবাজার অতি গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই মহাসড়ককে অনেক আগেই চার বা ছয় লেনে রূপান্তর করা উচিত ছিল। আজ থেকে ২৫ বছর আগে আমি এই সড়ক দিয়ে কক্সবাজার এসেছিলাম। তখন সড়কটি যে অবস্থায় দেখেছিলাম এবার এসেও তা দেখতে হয়েছে, যা খুবই দুঃখজনক। এই মহাসড়ককে অচিরেই চার বা ছয় লেনে রূপান্তর করার কাজ শুরু করা হবে।
গত শনিবার রাত পৌনে ৮টার দিকে চকরিয়া পৌরসভার শহীদ আবদুল হামিদ বাস টার্মিনাল মাঠে চকরিয়া উপজেলা ও পৌরসভা বিএনপি আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, কক্সবাজার বাংলাদেশের মানচিত্রে দক্ষিণ–পূর্বাঞ্চলের একটি অপার সম্ভাবনাময়ী অঞ্চল। এই জেলাকে দেশের একটি মৎস্য ও অন্যতম পর্যটন শহরও বলা হয়। পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক বালুময় সমুদ্র সৈকত এই কক্সবাজারে অবস্থিত, যা ১২০ কি.মি. পর্যন্ত বিস্তৃত। সৈকতের পাশাপাশি বন–উপবন, খাল–নদী, ঝিরি–ঝরনা, বন্য প্রাণী ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যে ভরপুর এ জেলা একসময় পালঙ্কি বা প্যানোয়া নামে পরিচিত ছিল। মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এই কক্সবাজারে রয়েছে সাবমেরিন ক্যাবল ল্যান্ডিং স্টেশনও। সৈকতের তীরে বেসরকারি হোটেল–মোটেল ছাড়াও রয়েছে পর্যটন মোটেল, সমপ্রতি গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি পাঁচ তারকা মানের হোটেলও। এক কথায় বলা চলে দেশের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট এই কক্সবাজার। নৈসর্গিক সৌন্দর্যের ছোঁয়া পেতে তাই সময় পেলেই দেশি–বিদেশি পর্যটকরা ছুটে যান কক্সবাজারে। বিশ্ব যখন ভ্রমণকে আলিঙ্গন করতে শুরু করেছে, তখন কক্সবাজার পর্যটকদের জন্য একটি উপযুক্ত স্পট হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। দিন দিন এর গুরুত্ব বাড়ছে।
পর্যটন নগরী হিসেবে কক্সবাজারের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। সেহিসেবে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি এলাকার মানুষদের শুধু নয়, পর্যটকদের জন্য আনন্দদায়ক। দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার গুরুত্ব দিয়েছেন। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা, আধুনিক ও দক্ষ যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং নগর পরিবহন ব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যেই সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সড়ক নিরাপত্তা জোরদারে ৯৪টি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং ‘সেফটি সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ভিত্তিক বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্প পুনরায় চালুর কথা বাজেটে উল্লেখ করা হয়। অর্থমন্ত্রী বলেন, সমন্বিত যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়ন দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বাণিজ্য সমপ্রসারণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
উল্লেখ্য, বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের নগরী কক্সবাজারে পরিকল্পিত উন্নয়নের লক্ষ্যে ২০১৩ সালে প্রণীত হয় একটি মাস্টারপ্ল্যান। কিন্তু সমন্বিত পরিকল্পনার অভাবে তা কার্যকর হয়নি। তবে বিদেশিদের জন্য একটি বিশেষায়িত পর্যটন অঞ্চল এবং দেশের দীর্ঘতম ও একমাত্র সামুদ্রিক রানওয়ে, মহাসড়ক ছয় লাইনে উন্নীত করার মাধ্যমে কক্সবাজারকে পর্যটন ও বিমান চলাচলের বৈশ্বিক কেন্দ্রে পরিণত করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়ক শুধু একটি আঞ্চলিক সড়ক নয়; এটি দেশের পর্যটন, ব্যবসা–বাণিজ্য ও অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ মাধ্যম। প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন এই মহাসড়ক ব্যবহার করে। দেশের অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ সড়ক হলেও দীর্ঘদিন ধরে এটি সংকীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। বিশেষ করে লোহাগাড়া ও সাতকানিয়ার বিভিন্ন বাঁকে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। শুধু লোহাগাড়া ও সাতকানিয়াএলাকা নয়, চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে ছোট–বড় সড়ক দুর্ঘটনা। ১৫৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়ক এখন এক সাক্ষাৎ মৃত্যুফাঁদ। তাই চার থেকে ছয় লেনে উন্নীত করার দাবি ছিল দীর্ঘদিনের। চট্টগ্রামবাসীর এই দাবিকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে বারবার। অথচ দেশের অর্থনীতির স্বার্থে, প্রধান পর্যটনকেন্দ্রে কক্সবাজারে পর্যটনের বিকাশ ঘটাতে, দক্ষিণ চট্টগ্রামের লাখ লাখ মানুষের ভোগান্তি কমাতে এই সড়কের উন্নয়ন খুব জরুরি।






