বিদ্যুৎ ও গ্যসের জন্য চট্টগ্রামে হাহাকার চলছে। গত ৫ আগস্ট দৈনিক আজাদীতে ‘চট্টগ্রামে দিনে ১৫০, সন্ধ্যায় ১১০ মেগাওয়াট লোডশেডিং’ শীর্ষক এক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, চট্টগ্রামে ভোর থেকে রাত পর্যন্ত চলছে লোডশেডিং। গত দুই সপ্তাহ ধরে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দিনে পাঁচ থেকে ছয়বার পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। একেকবার বিদ্যুৎ গেলে আসে আধা ঘণ্টা থেকে দেড় ঘণ্টা পর। কিছু কিছু এলাকায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ আসা–যাওয়া করছে। এমন পরিস্থিতিতে বিপাকে পড়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার মানুষ।
জানা গেছে, দেশে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। একটি পরিচালনা করে মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি ও অন্যটি সামিট এলএনজি টার্মিনাল। গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে এলএনজি সরবরাহের একটি টার্মিনাল বন্ধ হওয়ায় গ্যাসের সংকট প্রকট হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের মূল সংস্থা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড পিএলসি বাংলাদেশ (পিজিসিবি)। তাদের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে মোট বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে ২৩টি। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের সর্বোচ্চ উৎপাদন সক্ষমতা ৪ হাজার ৮৯৮ মেগাওয়াট। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয় উৎপাদন কমলেও তুলনামূলকভাবে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বেড়েছে। চট্টগ্রামের রাউজান তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিট স্থায়ী ভাবেই বন্ধ রয়েছে। অন্যান্য বিদ্যুৎকেন্দ্র গুলোর মধ্যে দুই–তিনটি ছাড়া অন্য সব বিদ্যুৎকেন্দ্রে কম–বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন চলছে।
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানাসহ (সিইউএফএল) বিভিন্ন বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানে গ্যাস স্বল্পতার কারণে উৎপাদন ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে। ইস্পাত, টেক্সটাইল, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানিমুখী শিল্প খাতগুলো মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় চট্টগ্রামের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতাও হ্রাস পেয়েছে। ফলে শিল্পাঞ্চলের পাশাপাশি আবাসিক এলাকাগুলোতেও লোডশেডিংয়ের মাত্রা তীব্র হয়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের এই দ্বিমুখী সংকটে কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম পুরোপুরি ব্যাহত হচ্ছে। তাঁরা বলেন, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে রপ্তানিমুখী শিল্প, উৎপাদন ও স্থানীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ফলে সরকারের উচিত দ্রুত এ সমস্যার সমাধান করা।
আসলে গ্যাস সংকটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিদ্যুৎ খাত। রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) বন্ধ রয়েছে। কেবল কাফকোতে সার উৎপাদন চলমান আছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনেও বড় কাটছাঁট করা হয়েছে। বর্তমানে শুধু শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্রে সীমিত আকারে উৎপাদন অব্যাহত রয়েছে। এই কেন্দ্রে দৈনিক ৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। তাই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও প্রভাব পড়ছে। চট্টগ্রামে বিদ্যুতের লোডশেডিং অনেক বেড়েছে।
আমাদের জাতীয় সম্পদের মধ্যে পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ খাত। আমরা জানি, প্রতিটি উপাদান খুবই প্রয়োজনীয়। বলা যায়, বিদ্যুৎ মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রণ করে। এগুলোর একটি না থাকলেও আমাদের দৈনন্দিন জীবন অচল হয়ে পড়ে। আধুনিক জীবন যাপনের জন্য পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ভূমিকা অপরিসীম। অথচ এসব সম্পদ আমরা প্রতিনিয়ত নানাভাবে অপচয় করে থাকি। বিশেষজ্ঞরা বলেন, অজ্ঞতা ও অসচেতনতাই এর মূল কারণ। ছোট ছোট অপচয় থেকেই আমরা প্রতিদিন নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি। বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের অভাবে হরহামেশা সমস্যায় পড়তে হয়। লোডশেডিং বা বিদ্যুৎ বিভ্রাট আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। বিদ্যুতের অপচয়ের ফলেই এসবের সৃষ্টি হয়। বিদ্যুতের অপচয় রোধ সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘স্বাধীন দেশের সবাই সবকিছু স্বাধীনভাবে ব্যবহার করেন। তবে দেশটা যেহেতু নিজেদের, সে ক্ষেত্রে দেশের সম্পদের ব্যবহার সঠিকভাবেই করা উচিত। বিদ্যুৎ ছাড়া আমাদের জীবন স্থবির হয়ে পড়বে। আমরা যদি সচেতন হই, তাহলে এর অপচয় রোধ করা সম্ভব। এ জন্য প্রয়োজন আমাদের মন–মানসিকতার পরিবর্তন। বিদ্যুৎ না থাকলে আমাদের অর্থনীতি একদিন মুখ থুবড়ে পড়বে। তাই আমাদের সচেতন হতে হবে।’
বিশেষজ্ঞরা বলেন, গ্যাস সংকটে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তাই দ্রুত এ সমস্যার সমাধান করা উচিত। সরকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে তাঁরা বলেন, গ্যাসের এ সংকট থেকে উত্তরণে প্রধানমন্ত্রী আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছেন। এরই মধ্যে তিনি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন। আশা করছি খুব দ্রুত এ সংকট কেটে যাবে।







