কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের একমাত্র ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতিমকে (১৩) হত্যার ঘটনায় সারা দেশে তোলপাড় চলছে। সবাই কাঁদছে অপ্রতিমের জন্য। বাচ্চা হারিয়ে গেলে শুধু বাবা–মায়েরাই পাগলপারা হয়ে যান না–আত্মীয়স্বজন, পাড়াপড়শি কারো ঘুম থাকে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখন এই হত্যার বিচার দাবিতে সবাই সোচ্চার। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে অধ্যাপক নাহিদা বেগমের একমাত্র ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতিমকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা। তবে হত্যার কারণ ও ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ওই কিশোরের সঙ্গে থাকা আইফোনটিও পাওয়া যায়নি। নিখোঁজের একদিন পর শনিবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার জঙ্গল থেকে ইশায়াতের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তার মাথায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে বলে জানায় পুলিশ। অপ্রতিম কোটবাড়ি এলাকার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কোটবাড়ি এলাকায় মা–বাবার সঙ্গে থাকত সে।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা বলে গত শুক্রবার বেলা আড়াইটার দিকে মায়ের আইফোন নিয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিল অপ্রতিম। পরে আর বাসায় ফেরেনি। তার মুঠোফোনের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা করা হয়। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা পর্যন্ত কোটবাড়ি এলাকার গন্ধমতীতে ফোনটির অবস্থান শনাক্ত করা যায়। ওই এলাকা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন। এরপর ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, সমপ্রতি গত সাত মাসে সাড়ে পনেরো হাজার শিশু নিখোঁজের খবর ছড়িয়ে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায়। শুরুর দিকে এ খবর গুজব বা সমস্যাজনক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। কারণ, ১৮ কোটির দেশে প্রতিদিন অসংখ্য বাচ্চা নানাভাবে হারিয়ে যায়। আবার অনেক বাচ্চাই ফিরে আসে, অনেকের খোঁজ পাওয়া যায়। কিন্তু থানায় সাধারণ ডায়েরি করলেও সেসব আর তোলা হয় না। ফলে হারিয়ে যাওয়ার খবরটাই নথিভুক্ত থেকে যায়, ফিরে পাওয়ার বিষয়টা চাপা পড়ে যায়। সেখান থেকেই সাড়ে পনেরো হাজার শিশু নিখোঁজের সংখ্যাটি প্রকাশ পায়।
স্বাভাবিকভাবেই এত বিপুল বাচ্চা হারানোর এই খবর চরম উদ্বেগ তৈরি করে। আমরা আতঙ্কিত হই। পরে পুলিশ এ নিয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেয়। প্রতি বছরই এমন সংখ্যক শিশু হারিয়ে যায়। আমরা জানতে পারি, গত সাত মাসেও সাড়ে পনেরো হাজার শিশু হারিয়ে গিয়েছিল, এটি সত্য। তবে সাড়ে তেরো হাজারের বেশি শিশু ফিরেও এসেছে। এটা জানার পর অনেকের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে। কিন্তু আমরা ভুলে গেলাম ফিরে না আসা বা নিখোঁজ বাকি দুই হাজারের বেশি শিশুর কথা। এতগুলো শিশু কোথায় গেল? এই হারিয়ে যাওয়া শিশুদের মধ্যেই কি ছিল চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার ১২ বছর বয়সী শিশু মোহাম্মদ রায়হান। সাত মাস আগে সে হারিয়ে গিয়েছিল। পরে স্থানীয় এক মাহফিলে পা কাটা অবস্থায় ভিক্ষাবৃত্তি করা অবস্থায় রায়হানকে ফিরে পাওয়া যায়। চুল কাটাতে গিয়ে হারিয়ে গিয়েছিল সে, কিন্তু এত দিন কোথায় ছিল সে, কীভাবে তার পা কাটল? ধারণা করা হচ্ছে, ভিক্ষাবৃত্তির অপরাধী চক্র তাকে অপহরণ করে পা কেটে রাস্তায় নামিয়ে দিয়েছে ভিক্ষার জন্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যারা শিশুদের ওপর এ ধরনের হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে, তাদের মধ্যে একটা ধারণা হয়ে গেছে যে তাদের এই অপরাধের কোনো বিচার হবে না। কেননা বাংলাদেশে শিশু হত্যা ও নির্যাতনের মামলায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির তেমন নজির নেই। এধরনের শিশু নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা আমাদের চরমভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলছে। শিশুর প্রতি সহিংসতা ও শিশু হত্যার মতো ঘটনা অমানবিক। এ থেকে উত্তরণের পথ বের করতে হবে। শিশু হত্যার মতো সকল ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
শিশুর প্রতি সহিংসতা ও শিশু হত্যার মতো ঘটনা অমানবিক। এ থেকে উত্তরণের পথ বের করতে হবে। সমাজবিজ্ঞানীদের অভিমত, শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধে দেশে কঠিন আইন আছে। কিন্তু কঠোর আইনই শুধু অপরাধ দমনে যথেষ্ট নয়। সমাজ যদি অপরাধ প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারে তবে যতো কঠোর আইনই থাকুক না কেন শিশুর প্রতি সহিংসতার মতো বড় ধরনের সঙ্কট দূর করা অসম্ভব।









