বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) গত ১০ মাসের প্রতিবেদন বলছে, পরীক্ষা করা ১ হাজার ৭৫৬টি নমুনার মধ্যে ৫৮৬টিতেই ভেজাল ও মারাত্মক দূষণের প্রমাণ মিলেছে। পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমাদের প্রধান খাদ্য চালের মধ্যে অতিমাত্রায় আর্সেনিক ও ক্রোমিয়াম, হলুদের গুঁড়ায় সিসা এবং মাছ–মুরগিতে মানুষের শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া যাচ্ছে! এমনকি শিশুদের প্রিয় চিপসের ৬৫ শতাংশে মিলছে ক্যানসার সৃষ্টিকারী ‘অ্যাক্রিলামাইড’। শুধু তাই নয়, জিলাপি–মিষ্টিতে টেক্সটাইল হাইড্রোস, কাচ্চি বিরিয়ানিতে কাপড়ের ক্ষতিকর রং, পাম অয়েলে রং মিশিয়ে সরিষার তেল বানানোর মতো পৈশাচিক জালিয়াতিও এখন প্রকাশ্যেই ঘটছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমাদের এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এর চেয়ে ভয়াবহ চিত্র আর কী হতে পারে? যে খাবার খেয়ে মানুষের পুষ্টি পাওয়ার কথা, সেই খাবার খেয়ে মানুষ আজ ক্যানসার, লিভার সিরোসিস কিংবা কিডনি বিকল হওয়ার মতো জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। অথচ খাদ্যে বিষপ্রয়োগ রুখতে দেশে আইনের কোনো অভাব নেই। নিরাপদ খাদ্য আইন–২০১৩, ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন–২০১৫ এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন–২০০৯–এর মতো বেশকিছু কঠোর আইন দেশে বিদ্যমান। এমনকি ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে খাদ্যে ভেজাল দেওয়া ও বিক্রির অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান পর্যন্ত রাখা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত আইন থাকা সত্ত্বেও ল্যাবরেটরির পরীক্ষায় কেন কেবলই ভেজালের উদ্বেগজনক চিত্রই মিলছে? এর একমাত্র কারণ, আইনের যথাযথ ও কঠোর প্রয়োগের অভাব। এই মহাসংকট থেকে জাতিকে রক্ষা করতে হলে সরকারকে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে এখন থেকেই জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। বাজার মনিটরিং বাড়াতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে ২৫ লাখ ক্ষুদ্র বা অপ্রাতিষ্ঠানিক ব্যবসায়ী ও ১৮টি মন্ত্রণালয় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত। এছাড়া দেশে প্রায় ৪৮৬টি প্রতিষ্ঠান আছে, যারা খাদ্যদ্রব্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এসব প্রতিষ্ঠানের অধীন প্রায় ১২০টি আইন ও নীতিমালা রয়েছে। দেশে ক্ষুদ্র বা অপ্রাতিষ্ঠানিক খাদ্য ব্যবসায়ীদের বেশির ভাগের পেশাগত জ্ঞান বা প্রশিক্ষণ নেই। সব মানুষের জন্য নিরাপদ খাদ্য একটি জাতীয় প্রত্যাশা। দেশের মানুষের খাদ্যাভ্যাস, ধর্মীয় মূল্যবোধ, সংস্কৃতি, আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট ইত্যাদি বিবেচনায় নিয়ে যেন সবাই সহজে ও সুলভ মূল্যে খাদ্য পেতে পারে, সে জন্য সবার সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
খাদ্যে ভেজালের সংবাদ আমরা প্রায়শই দেখে থাকি পত্রপত্রিকায়। এসবের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযানও চালানো হচ্ছে। আইনের আওতায় আনা হচ্ছে অপরাধীদের। তবুও থামছে না খাদ্যে ভেজাল দেওয়ার প্রবণতা।
খাদ্যে ভেজাল রোধ করতে দেশের প্রধান খাদ্য নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউটকে (বিএসটিআই) আরো সতর্ক ও সক্রিয় হতে হবে। ভেজাল খাদ্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে দরকার কার্যকর ভূমিকা। ভেজালবিরোধী অভিযান চালানো হলে কিছুদিন ভেজালমুক্ত খাদ্যদ্রব্য পাওয়া যায়, কিন্তু পরে যেই–সেই হয়ে যায়। এর থেকে পরিত্রাণে আমাদের সমাজিকভাবেও নীতি–নৈতিকতা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। ব্যবসায়ীদের সৎ পন্থা অবলম্বন করতে হবে। নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকে সততা, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার আলোকে ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে। ভেজাল প্রতিরোধে প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের নৈতিকতাবোধ, উৎপাদক, বিপণনকারী, ভোক্তা সবাইকেই সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। পাশাপাশি রাষ্ট্রকে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
নিরাপদ খাদ্য পাওয়ার জন্য খাবার সংরক্ষণ করা বা নিরাপদে রাখা অত্যন্ত জরুরি। সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করতে পারলে বিশুদ্ধ খাবার দূষিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। দূষিত খাবারের ফলে হুমকির মুখে পড়ছে শিশুর স্বাস্থ্য। নিরাপদ খাবারের ক্ষেত্রে নিরাপদ পানিও অতি জরুরি। বেশির ভাগ সময় খাওয়ার পানি অস্বাস্থ্যকর বা অনিরাপদ। অনিরাপদ পানি পানের ফলে নানা ধরনের রোগ ছড়িয়ে পড়ছে, যা স্বাস্থ্য খাতে খরচের হার বৃদ্ধি করছে। মোট কথা, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার জন্য কাজ করা সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় ঘটানো প্রয়োজন।







