ভেলায় ঝিনুক-কোরাল চাষ

সমুদ্র সম্পদ ব্যবহারে নতুন সম্ভাবনা

শাহেদ মিজান, কক্সবাজার | শুক্রবার , ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৮:৩১ পূর্বাহ্ণ

কক্সবাজারের উপকূলীয় এলাকায় ভাসমান ভেলার মাধ্যমে বিশেষ পদ্ধতিতে চাষ হচ্ছে সবুজ ঝিনুক ও সামুদ্রিক কোরাল। কক্সবাজার সদর উপজেলার খুরুশকুল ইউনিয়নের বাঁকখালী নদীর মোহনায় পরীক্ষামূলকভাবে গড়ে তোলা হয়েছে ভাসমান ভেলার এই খামার। পরিবেশবান্ধব এই পদ্ধতি ব্লু ইকোনমির টেকসই ব্যবহারের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বাঁশ, দড়ি ও প্লাস্টিকের ড্রাম দিয়ে তৈরি ভাসমান কাঠামোর নিচে সবুজ ঝিনুকের বীজ ঝুলিয়ে দিয়ে এই পদ্ধতিতে ঝিনুক চাষ হচ্ছে। জোয়ারভাটার স্রোত ও নোনাজলের অনুকূল পরিবেশে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবে এই ঝিনুক চাষ করা হচ্ছে। সাধারণত কয়েক মাসের মধ্যেই ঝিনুক বাজারজাত করার উপযোগী হয়ে ওঠে। অন্যদিকে একই ভাসমান কাঠামোর সঙ্গে জালের খাঁচা তৈরি করে চাষ করা হচ্ছে সামুদ্রিক কোরাল মাছ। এসব খাঁচায় কোরাল মাছের পোনা ছাড়া হয়। নিয়মিত খাবার ও পরিচর্যার মাধ্যমে কয়েক মাসের মধ্যেই মাছগুলো বিক্রিযোগ্য আকার ধারণ করে।

জানা গেছে, প্রকল্পটি অর্থায়ন করছে পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) এবং বাস্তবায়ন করছে ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (আইডিএফ)। প্রকল্পের আওতায় স্থানীয় চাষিদের প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহায়তা এবং আধুনিক সামুদ্রিক চাষাবাদ বিষয়ে সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সবুজ ঝিনুক চাষি আনোয়ার মিয়া জানান, ২০১৮ সালে সর্বপ্রথম সবুজ ঝিনুক (গ্রিন মাসেল) ভাসমান ভেলায় চাষ শুরু করেন। প্রতি বছর এর সমৃদ্ধি ঘটে। এক পর্যায়ে দেখা দেয় সন্তোষজনক সফলতা। তিনি বলেন, প্রচলিত মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীলতার পাশাপাশি এ ধরনের আধুনিক চাষাবাদ বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করেছে। সমুদ্রে মাছের আকালের এই সময়ে মাছের যোগানে গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন হয়ে উঠেছে।

আরেক চাষি শহীদুল ইসলাম বাবু বলেন, আগে আমরা মূলত মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল ছিলাম। কিন্তু আবহাওয়া খারাপ থাকলে বা মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা এলে আয় বন্ধ হয়ে যেতো। এখন ভাসমান ভেলায় ঝিনুক ও কোরাল মাছ চাষ করে নিয়মিত আয় হচ্ছে। সঠিক প্রশিক্ষণ ও সরকারি সহযোগিতা পেলে এই চাষ আরও বড় পরিসরে করা সম্ভব।

স্থানীয় আরেক চাষি মং ছেন জানান, অতীতে এমন পদ্ধতির নজির নেই। তাই অনেক ভয়ে আমরা এই বিশেষ পদ্ধতির চাষ শুরু করি। তিনি বলেন, আইডিএফের প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা আমাদের দক্ষ করে তুলেছে। এই পদ্ধতির বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। সহজ শর্তে ঋণ ও বাজারজাতকরণে সহায়তা পেলে অনেক নতুন উদ্যোক্তা এ খাতে এগিয়ে আসবেন।

আইডিএফের মৎস্য কর্মকর্তা মুহাম্মদ হাসান বলেন, বাংলাদেশে ভাসমান ভেলায় সবুজ ঝিনুক ও সামুদ্রিক মাছ চাষের সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। উপকূলীয় এলাকায় পর্যাপ্ত নোনাজল ও অনুকূল পরিবেশ থাকায় এই খাত দ্রুত সমপ্রসারণ করা সম্ভব। সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত সহযোগিতা পাওয়া গেলে এটি উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্য একটি লাভজনক ও টেকসই জীবিকার উৎসে পরিণত হবে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের দীর্ঘ সমুদ্র উপকূল ও সমুদ্রসম্পদকে কাজে লাগিয়ে ব্লুইকোনমির যে পরিকল্পনা সরকার গ্রহণ করেছে, ভাসমান ভেলায় ঝিনুক ও কোরাল মাছ চাষ সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এই উদ্যোগকে বাণিজ্যিক পর্যায়ে সম্প্রসারণ করতে হলে সহজ শর্তে ঋণ, উন্নত মানের পোনা ও ঝিনুকের বীজ সরবরাহ, নিয়মিত কারিগরি প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং কার্যকর বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করেন এই কর্মকর্তা। এটি খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক অবদান রাখার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধমহেশখালীতে যুবককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় ৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা
পরবর্তী নিবন্ধমেধাবীদের সঠিক মূল্যায়নের সুফল ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পাবে : প্রধানমন্ত্রী