পেকুয়ার ইতিহাস ও ঐতিহ্য : অসাধারণ সৃষ্টি

ইকবাল হায়দার | বৃহস্পতিবার , ২৩ এপ্রিল, ২০২৬ at ৬:২৬ পূর্বাহ্ণ

গ্রীক ক্রিয়াপদ historia বা Histor যার অর্থ জ্ঞান অন্বষণের কাজ এবং ল্যাটিন Istorie বা Histoire শব্দ থেকে Hostory বা ইতিহাস শব্দটি এসেছে। সভ্য সমাজে বসবাসকারী মানুষের অভিজ্ঞতার কাহিনি হল ইতিহাস এটিই ইতিহাসবিদদের অভিমত। তাই বলা হয়, ইতিহাস হচ্ছে ইতিহাসবিদদের দ্বারা সৃষ্ট অতীত সম্পর্কে আহরিত জ্ঞানের সমষ্টি, যাহা জ্ঞানের উপাদান, যোগাযোগ ও শিক্ষা দানের সাথে জড়িত সকল মানবিক বিষয়াদি যেমন কর্মে নিয়োজিত মানুষ এবং তাদের বাস্তব ঘটনাবলী, মানুষের নিজস্ব চিন্তা ও অনুভূতি সমূহ আমাদের জানান দেয়। অতীত বৃত্তান্ত, সত্যানুসন্ধান ও গবেষণা, কালানুক্রমিক অতীত কাহিনি ও কার্যকলাপ লিখন, বিশ্লষণ ও অধ্যয়নই ইতিহাস গবেষণার মূখ্য উপাদান অনুসঙ্গ।

অতীতের পদ্ধতিগত অধ্যয়ন যা মানুষের অতীতের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে তাই ইতিহাস। মানুষ তার পারিপার্শ্বিকতা, প্রকৃতি, পরিবেশ, সমাজ ও সংস্কৃতি, সভ্যতার বিকাশ, পরিবর্তন, শিল্প, সাহিত্য, দর্শন, স্থাপত্য, রাজনীতি, যুদ্ধ ,ধর্ম, আইন সামগ্রিকভাবে যা কিছু সমাজ ও সভ্যতার বিকাশে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করেছে তাই ইতিহাসের গবেষণার বিষয়বস্তু।

ইতিহাস আমাদের অস্তিত্বের, সামাজিক সাংস্কৃতিক পটভূমি এবং জীবনের অর্থের ধারণা দেয় যা ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক উপাদানে পরিপূর্ণ। অতীতে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলী কে সুনির্দিষ্ট তথ্য, সূত্র ও প্রমাণের ভিত্তিতে গবেষণা ও অনুসন্ধান চালিয়ে সত্য উদঘাটন করে ইতিহাস।

ইতিহাস সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তনের অধ্যয়ন করে, মানব সমাজের সকল দিককে অন্তর্ভূক্ত করে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বিষয়ের সাথে বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তিগত, চিকিৎসা ও সামরিক উন্নয়ন সহ সব বিষয় কে সম্পৃক্ত করে।

ইতিহাস জানতে চায়, মানুষ কেমন করে মানুষ হল, অতীতে সে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে প্রয়োজনে কী কী করেছে? ঐ সকল বিষয়ের ঐতিহাসিক তাৎপর্য, প্রাথমিক উৎস, প্রমাণ, ধারাবাহিকতা এবং এর পরিবর্তনের কারণ ও পরিণতি এর ঐতিহাসিক দংষ্টিভঙ্গী সমূহের বিশ্লেষণ করে ।

ইতিহাস অনুসন্ধান ও তদন্তের মাধ্যমে সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তনের অধ্যয়ন, তথ্যসূত্র, তারিখ, নাম, স্থান, ঘটনা থেকেই ইতিহাস তার উপাদান সংগ্রহ এবং জ্ঞান আহরণ করে।

ইতিহাস গঠনের আরো উৎস হচ্ছে অতীতের ব্যক্তিগত ডকুমেন্ট, জার্নাল, ডায়রী, স্মারক, স্বাক্ষরিত চিঠিপত্র, আদালতের কার্যক্রম, আইন সভার কার্যবিবরণী, সংবাদপত্র, ম্যাগাজিনের নিবন্ধ, চলচ্চিত্র, সংগীত, শিল্প, বিবিধ দলিল, নিদর্শন, শিলালিপি, মৌখিক ঐতিহ্য, চিত্রকলা, অংকন, কার্টুন, পোস্টার। অন্যদিকে ঐতিহ্য হল বিশ্বাস বা আচরণের একটি ব্যাখ্যা। যা একটি গোষ্ঠী বা সমাজের মধ্যে যুগ যুগ ধরে ধারাবাহিকভাবে প্রবাহিত হয়ে আসছে। যেমন রীতিনীতি, বিশ্বাস, আচার অনুষ্ঠান, শিল্পসাহিত্য, জ্ঞানপ্রযুক্তি, ভাষা, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক উপাদান যা অতীতের সাথে যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে আমাদের পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে।

উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত, প্রতিষ্ঠিত অথবা প্রচলিত চিন্তা, ভাবনা, কার্য ও আচরণের ধরন এবং অতীতের সাথে সম্পর্কিত সকল বিষয় ঐতিহ্য। এ প্রসঙ্গে পেকুয়ার কৃতী সন্তান ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ এইচ এম ফজলুল কাদের লিখিত সুন্দর ও দৃষ্টি আকর্ষণ করে এমন নান্দনিক প্রচ্ছদ সম্বলিত ‘পেকুয়ার ইতিহাস ও ঐতিহ্য’ গ্রন্থটি আমাদের হাতে এসেছে। লেখক অনেক তথ্য উপাত্ত বিশিষ্ট জনের সাক্ষাৎকার, প্রত্যন্ত অঞ্চল পরিভ্রমণ ও পরিদর্শন করে তথ্য নির্ভর এ গ্রন্থটি আমাদের জন্য উপস্থাপন করেছেন।

যেখানে পেকুয়া নামের উৎপত্তি, কক্সবাজার থেকে পেকুয়া, পেকুয়া উপজেলা সৃষ্টি, পেকুয়ার জনতাত্ত্বিক বিশ্লষণ, পরিবেশ, প্রকৃতি, জলবায়ু, আরকানী শাসন, মোঘল শাসন, সুলতানী আমল, বৃটিশ শাসন, পুর্তগীজ লুণ্ঠন, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন যেমন বর্ণনা করেছেন তেমনি আবার পেকুয়ার শিল্প সংস্কৃতি, সাহিত্য, ছড়া, ধাঁধা, সাহিত্যিক, কবি, লেখক ও পেকুয়ার স্মরণীয় বরণীয় বিশিষ্ট ব্যক্তি, সরকারের বিভিন্ন পদে অধিষ্ঠিত পেকুয়ার কৃতী সন্তান, উজ্জ্বল ব্যক্তিবর্গ, ব্যাংকার, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও অধ্যাপক সহ শিক্ষাবিদ, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, আইনজীবী, বিশিষ্ট ব্যবসায়ীদের পরিচয় তুলে ধরেছেন।

আবার বিবিধ নৃগোষ্টী ও জনগোষ্ঠীর পরিচয়, ইউনিয়ন ও বিভিন্ন এলাকার নামকরণ সহ পেকুয়া উপজেলার সরকারি বেসরকারি স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল ও মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পেকুয়া, চকরিয়া তথা কক্সবাজারের গৌরব সালাহউদ্দিন আহমেদ এমপির অবদান উন্নয়ন ও জনসেবামূলক কর্মের সুন্দর বর্ণনা ও উপস্থাপন করেছেন ।

এ প্রসংগে আমাদের দৃষ্টিতে এসেছে এলাকায় বসবাসরত জমিদার শ্রেণির পূর্ব ও বর্তমান অবস্থান, চাষাজমিদার সম্পর্ক, বৃহৎ জমিদার পরিবার সমূহ, তাদের দাপট, তাদের ভাষার রূপ, দৈহিক গঠন, অবয়ব, ভাষার ধরণ, রোসাংগিরী বা রোয়াই, চাটগাঁইয়া বা চাটি সম্পর্ক অথবা তাদের মধ্যে স্থিত আন্তঃসম্পর্ক, সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্ক, বিভক্তি, তিক্ততা, দাঙ্গা হাঙ্গামা, লাঠিয়ালদের দৌরাত্ম্য, মারামারি, মামলা মোকদ্দমা, জমি জমা ও ক্ষমতার প্রদর্শন সম্পর্কে তেমন বিবরণ প্রত্যক্ষ নয় যেটি হরহামেশা ঘটে থাকত।

আমি বইটির ভবিষ্যতে প্রকাশিতব্য বর্ধিত সংস্করণ যাতে আরো তথ্য সমৃদ্ধ ও নতুন করে সন্নিবেশনের জন্য নিম্নোক্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাবলি সংযোজনের জন্য বিনীত আবেদন করলাম।

পেকুয়ার অবস্থান (যা আগে উল্লিখিত) প্যারাবন, পেক বা কাদা থেকে একা ফতেহআলী খ্যাত ফতেহআলী মাতব্বর চৌধুরী কর্তৃক পেকুয়াকে আবাদ ও বাসযোগ্য করে তোলা। গোয়াগাছ থেকে গোঁয়াখালী। নদী ও খাল বেষ্টিত কাদা মাটির বিস্তীর্ণ এলাকা। মুসলমান, মগ, হিন্দু অধ্যুষিত জনপদ। বৃহৎ জমিদারদের বংশ ও বিভিন্ন শ্রেণি মানুষের কুতুবদিয়া, বাঁশখালী, সন্দীপ, আনোয়ারা, বোয়ালখালী থেকে আগমন। তাদের আবাস পত্তন ও ভূমির আবাদযোগ্য করে গড়ে তোলার ইতিহাস। নদনদীমাতামুহুরী নদী, ভোলা খাল, রূপাইখাল, বেরাদিয়া খাল, হরিণাফাড়ি খাল। কুতুবদিয়া থেকে মগদের নেমে আসা থেকে নাম হয় মগনামা, মগকাটা, মগঘোণা। পেকুয়ার চতুর্দিকে বেষ্টিত থানা সমূহ, সন্দীপ, কুতুবদিয়া প্রণালী ও পেকুয়ার মূল ভূখণ্ডের সাথে কুতুবদিয়া, মহেষখালীর দ্বীপাঞ্চল ও সাগরের নৈকট্য। প্রকৃতি পাহাড়, বিবিধ সম্পদ। উৎপাদিত পণ্য, একা ফতেহআলী মাতব্বরের পেকুয়া, বারবাকিয়া সোনাইছড়ির পাহাড়, মগনামা, উজানটিয়া দখল ও আবাদ। মগদের পুনর্বাসন ও পরে মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করা রোঁসাই বা রোঁসাংগিরী নাম ধারণ। ফতেহআলী মাতব্বরের মৃত্যু পরবর্তী পুত্রদের কোলকাতা রেঙ্গুনে দীর্ঘ দিন অবস্থান ও বিলাস জীবন যাপনের কারণে তারা একা ফতেহআলীর সম্পত্তি দখল করে বৃহৎ জমিদার হয়ে ওঠার ইতিহাস। রোসাংগিরী চাটগাঁইয়া জমিদারদের সম্পর্ক, জমিজমা, প্রজাদের উপর ও এলাকায় প্রভাব, প্রতিপত্তির কারণে একে অন্যের প্রতি হিংসা, বিদ্বেষ, ক্রোধ। তাদের ভাষাগত পার্থক্য, দৈহিক গঠন, চেহারা, চোখ, অবয়ব। উভয়ের মধ্যে প্রতিনিয়ত জমিজমা নিয়ে লেগে থাকা মামলা মোকদ্দমার কারণে সংঘটিত হত ভয়ংকর দাঙ্গা হাঙ্গামা, খুনোখুনি। রোসাংগিরীদের মধ্যে পারিবারিক ও আন্তঃসম্পর্ক, চাটগাঁইয়াদের সাথে তাদের সামাজিক ও বৈবাহিক সম্পর্ক। কক্সবাজার জেলায় পেকুয়ার গুরুত্ব, উৎপাদিত ফসল, ধান, মাছ, লবণ। তৎকালীন হিংস্র জীব জন্তুর অবস্থান, যেমন বাঘের অবস্থানের কারণে বাঘগুজারা, বাঘফালানির চউরী (বাঘের লাফালাফির চত্তর) ইত্যাদির নামের উৎপত্তি হয়। বিলহাইচোরা ঘোনার ( ১৩০ দ্রোন বিশাল মাছ ও লবণের জমি বছরের দীর্ঘ সময় সাঁতরিয়ে বা নৌকা দিয়ে পার হতে হত) ইতিবৃত্ত ইত্যাদি সম্পর্কে অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সংযুক্তিকরণ। এই পেকুয়া মগনামার পূর্বে পাশাপাশি অবস্থিত, কুতুবদিয়া চ্যানেল যার পশ্চিমে প্রবাহিত। তার উত্তর পশ্চিমে কুতুবদিয়া দ্বীপ অবস্থিত। ধন্যবাদ, ফজলুল কাদেরকে প্রকাশিত বই এর জন্য। আশা করি পুনঃপ্রকাশকালে উপরোক্ত বিষয় সহ আরো নতুন তথ্যাবলি উপস্থাপন করবেন। লেখক : সংগীতশিল্পী, লোকগবেষক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধনতুন বছর
পরবর্তী নিবন্ধইরানের পরাজয় হলে দায়ভার নিতে হবে মুসলিম বিশ্বকে