পাঠ প্রতিক্রিয়া : কিশোর গল্পগ্রন্থ ‘আমাদের নেই কোনো ভয়’

ইফতেখার মারুফ | বৃহস্পতিবার , ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৭:৪১ পূর্বাহ্ণ

শিউলী নাথ লেখক হিসাবে নবীনের কাতারে। তবে তার উত্তরণ বেশ ভালোই হচ্ছে মনে হয়। ইতোমধ্যে তার একটি কাব্যগ্রন্থ ও ছোটোদের একটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। আমার আলোচ্য বইটি তার সদ্য প্রকাশিত কিশোর গল্পগ্রন্থ ‘আমাদের নেই কোনো ভয়’। তার এই বইটিতে ১০টি গল্প স্থান পেয়েছে। প্রথম গল্প ‘দুরন্ত ছেলেরা’। ঐ বয়সে তাদের মধ্যে কিছু ভালো কাজ করার ইচ্ছে থাকে। এই কাজের ইচ্ছেই তাদের সাহসী করে তুলে। সেটা বেশ সুন্দরভাবেই ফুটিয়ে তুলেছেন গল্পকার শিউলী নাথ। ২য় গল্প ‘গ্রীষ্মের ছুটি’এখানে বিপন্ন দুটি বিড়াল ছানাকে ঘিরে কাহিনি এগিয়ে গেছে। গ্রীষ্মের ছুটিতে বেড়াবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রচণ্ড বৃষ্টির কারণে ভাইবোন অস্মিও বিভানের বেড়ানো আর হয় না। এ সময় পানিতে ভেসে আসা দুটি বেড়াল ছানা পায়। এ দুটি বেড়াল ছানার যত্ন করতে করতে তাদের সময় বেশ ভালোভাবেই কেটে গেল। এদিকে দেখতে দেখতে তাদের ছুটি শেষ হয়ে গেল। এতে তাদের মন খারাপই হওয়ার কথা। কিন্তু বেড়াল ছানাদুটির যত্ন্‌ আত্তি করতে করতে তাদের সময়টা বেশ আনন্দেই কেটে গেল। তাই তাদের মন খারাপ হয় না। গল্পটি পড়তে পড়তে অবোধ প্রাণীর প্রতি ভালোবাসায় জেগে ওঠে।

৩য় গল্প ‘বনির গাড়ির স্বপ্ন’ গাড়ির প্রতি বনির যে আকর্ষণ, তার যে সুন্দর ভাবনা চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন গল্পকার। অনেক সময় আমাদের মনে সে সুন্দর ভাবনা আসে, দেখা যায় স্বপ্নে সেটা অন্যরকম দেখি। যেটা আমাদের দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত করে তুলে। এ রকম স্বপ্ন আসলে দুঃস্বপ্ন। এ রকম স্বপ্নে ভেঙে না পড়ে সুন্দর স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাওয়া উচিৎ। এটা সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন গল্পকার। ৪র্থ গল্প ‘রানার সততা’। গরীবের ঘরে জন্ম নেয়া বালক রানা। নিজেরা অর্থকষ্টে থাকলেও অসহায় দুঃখী মানুষের জন্য তার মন কাঁদে। একদিন সে একটি ব্যাগ কুড়িয়ে পায়। তাতে টাকা স্বর্ণালংকারে ভর্তি ছিল। এটা পাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেক রানা খুশি হয়। কিন্তু রানা মায়ের কাছ থেকে যে শিক্ষা পায় পরের ধন আত্মসাৎ করার মধ্যে কোন গৌরব নাই। পারিবারের শিক্ষা শিশু কিশোররের দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে। বাবা মায়ের কাছে থেকে সঠিক নির্দেশনা পেলে তারাও ভালভাবে নিজেদের গড়ে তুলবে। রানার মায়ের সঠিক শিক্ষা পরবর্তীতে তাকে ভালো মানুষ হিসাবে গড়ে উঠতে সাহায্য করবে। রানার সততা গল্পে অভিভাবকদের জন্য শিক্ষা রয়েছে। ৫ম গল্প ‘সেই ছেলেটি’। দুরন্ত ছেলেরা সাধারণত মেধাবী হয়। কিন্তু দুরন্তপনার কারণে তারা পরীক্ষার ফলাফলে পিছিয়ে থাকে। দেখা যায় কোন একটা কারণে সে বুঝতে পারে নিজের ভুল। তখনই তার ভালো ফলাফল করা শুরু হয়। এক সময় সে বড় সাফল্য অর্জন করে তাক লাগিয়ে দেয়। এই গল্পটা সে সব দুরন্ত বা দুষ্টু ছেলেদের পড়ালেখায় মনোযোগী হতে আগ্রহী করে তুলবে। আমরাতো ছোট গল্পের ক্ষেত্রে রবীন্দ্র নাথের ‘শেষ হয়েও হইল না শেষ’ সেই সংজ্ঞা মেনে চলি। এখানে তা ব্যাহত হয়েছে। শেষটাই উপদেশ যেভাবে আসার কথা সেভাবে না আসায় গল্পটার সম্ভাবনাটাই মুখ থুবড়ে পড়ল। যে ম্যাসেজ দিতে চান তা গল্পকার কাহিনির বিন্যাসেই নিয়ে আনবেন। পাঠক তা বুঝে নেবে। এই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারলে গল্পটি উৎরে যেত।৬ষ্ঠ গল্প ‘শিমুর মুখে হাসি’। শিমুদের হাসিখুশি এই ছোট্ট সংসারটাতে ভাইয়ের মৃত্যুতে নেমে আসে বিষাদের ছায়া। শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতে শুরু হয় মায়ের অসুস্থতা অবশেষে বড় দু:শ্চিন্তা থেকে মুক্তি।

৭ম গল্প ‘সৌম্যের প্রতীক্ষা’। সৌম্য তার মা ও সূর্যের মধ্যে দারুণ মিল খুঁজে পায়। বন্ধু দীপের কাছে দেয়া এর ব্যাখ্যা দেখে আমিতো চমকে উঠেছি। মনে পড়ে গেল আমার মায়ের কথা। আমার মায়ের স্বভাবওতো সূর্যের সাথে মিল ছিল। আসলে সব মায়ের সাথে সূর্যের মিল রয়েছে। সূর্য যখন উঠে তখন তেজিভাব নিয়ে ওঠে। সময়ের সাথে সাথে চরম থেকে চরমতম হয়ে যায় শেষ বেলাতে এসে তার সে তেজ থাকে না। চরমভাবও কোমল হয়ে যায়। খুব ভোরে মায়েদের উঠতে হয়। তখন নাস্তা তৈরি, একদিকে স্বামী ও সন্তানদের খাইয়ে দাইয়ে অফিসে, স্কুলে পাঠানো। আবার স্কুল থেকে বাচ্চাদের নিয়ে আসা আবার রান্নাবান্না করা। এসব যথাসময়ে শেষ করার জন্য ঘুম থেকে উঠেই তাদের টেনশন করতে হয়। তাই এ সময় তাদের মেজাজ থাকে সূর্যের মতোই চরমে। দুপুরে সবার ভাত খাওয়া শেষ হলে তাদের সে মেজাজ তিরিক্ষি থাকে না ফুরফুরে হয়ে যায়। ঠিক সূর্যের মতো। এটি একটি চমৎকার উপমা। ৮ম গল্প ‘অর্ক বড় হয়েছে’ গল্পটিতে ভাইবোনের খুনসুটি, পরস্পরের প্রতি মায়ার ব্যাপারটি ফুটে উঠেছে। ৯ম গল্প ‘স্কুল পাগল মেয়েটি’ গল্পটি স্কুলমুখী এক কিশোরীর স্কুলে যাওয়ার আকুতি তুলে ধরা হয়েছে। ১০ম শেষ গল্প ‘রাজুর কীর্তি’। মাইলস্টোন স্কুলে বিমান ট্‌্র্যাজেডি আমাদের স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করছে। রাজু নামের এক মানবিক কিশোরের সাহসিকতার কথা তুলে ধরা হয়েছে।

শিউলী নাথের এ সব গল্পে হাসি, কান্না, ভয়, স্বপ্ন, সাহস, দুরন্তপনা, মানবিকতা চমৎকারভাবে উঠে এসেছে। শিউলী কিশোর মনস্তত্ত্ব ভালোভাবে উপলব্ধি করেছেন। তাই গল্পগুলি হয়ে উঠেছে উপভোগ্য ও হৃদয়স্পর্শী।

শিউলী একজন শিক্ষক। তাই তার প্রতিচ্ছবি গল্পগুলিতে দেখা যায়। তার গল্পগুলোতে তিনি ম্যাসেজ দিতে চান, কিছু শেখাতে চান। এই ম্যাসেজ দেয়া শেখানোর চেষ্টা আরোপিত নয়। স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাহিনির ধারাবাহিকতায় আসাতে গল্পগুলি পেয়েছে প্রাণ। এক্ষত্রে গল্পকার পুরোপুরি সফল। আমাদের নতুন প্রজন্ম বেয়াড়া হয়ে গেছে বলে হা হুতাশ করি। শিউলী নাথের গল্প পড়লে তাদের মানসিকতায় পরিবর্তন আসবে। তারা মানবিক চেতনার অধিকারী হবে।

ছোটখাট কিছু ত্রুটি যে নাই তা নয় তবে তা গৌণ। তার উত্তরণ হয়েছে এ কথা বলতেই হয়। তার হাত দিয়ে আরো ভালো ভালো গল্প বেরিয়ে আসুক। বইটি কিশোরদের হাতে হাতে শোভা পাবে সে প্রত্যাশা আমাদের।

লেখক: গল্পকার।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবিষাদের আশ্বিন
পরবর্তী নিবন্ধপারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধের নতুন সমীকরণ ও বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার সংকট