জুলাই আন্দোলনের সময় তখনকার তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের নির্দেশে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খুলে সারাদেশে ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়েছিল বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দিয়েছেন বিটিআরসির এক কর্মকর্তা। ইন্টারনেট বন্ধ করে মারণাস্ত্র ব্যবহারে উসকানি ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং পলকের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় গতকাল বৃহস্পতিবার তিনি সাক্ষ্য দেন। খবর বিডিনিউজের।
বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১ বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন–বিটিআরসির উপপরিচালক পদমর্যাদার ওই কর্মকর্তা জবানবন্দি গ্রহণ করেছে। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম, তার সঙ্গে ছিলেন কৌঁসুলি বি এম সুলতান মাহমুদ, গাজী এম এইচ তামিমসহ অন্যরা। প্রধান কৌঁসুলির অনুরোধে নিরাপত্তার স্বার্থে সাক্ষ্য দেওয়া ওই বিটিআরসি কর্মকর্তার নাম ও পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। এদিন তার জবানবন্দি শেষ না হওয়ায় রোববার পর্যন্ত মূলতবি রাখা হয়েছে।
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলন সহিংসতার জের ধরে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। পতন ঘটে আওয়ামী লীগ সরকারের। আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে যেভাবে ইন্টারনেট বন্ধ হয় তার বর্ণনা দিয়ে ট্রাইব্যুনালে বিটিআরসির এই কর্মকর্তা বলেন, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই সন্ধ্যা ৭টায় তৎকালীন বিটিআরসির মহাপরিচালক কাজী মোস্তাফিজুর রহমান টেলিফোনে তাকে ইন্টারনেট বন্ধের নির্দেশনা পাওয়ার বিষয়টি জানান। প্রতিমন্ত্রী পলক সংস্থার চেয়ারম্যান মো. মহিউদ্দিন আহমেদকে ইন্টারন্যাশনাল টেরিস্ট্রিয়াল কেবল অপারেটরদের আপস্ট্রিম বন্ধ করার জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন বলে মহাপরিচালক তাকে বলেছেন। এই নির্দেশনার পর তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, তৎকালীন মহাপরিচালক কাজী মোস্তাফিজুর রহমান ওই নির্দেশনা ইন্টারন্যাশনাল টেরিস্ট্রিয়াল কেবল অপারেটরদেরকে অবহিত করার জন্য একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খুলতে আমাকে নির্দেশনা দেন। ওই নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে আমি আমার অফিসিয়াল মোবাইল ফোন নম্বর ০১৫৫২২০২৭৮৯ থেকে ইন্টারন্যাশনাল টেরিস্ট্রিয়াল কেবল অপারেটরদের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি গ্রুপ ‘এইটিন জুলাই আইসিটি অপারেশন্স’ নামে একটি গ্রুপ খুলি। কাজী মোস্তাফিজুর রহমান, সামিট কমিউনিকেশন লিমিটেডের খালিদ, ফাইবার অ্যাট হোম এর মশিউর, নভোকম এর আজিজ, বিডি লিংক এর একজন, ম্যাংগোর জাহিদ, বিটিসিএল এর আনোয়ার মাসুদ ও বিএসপিএলসি এর ওহাবের সমন্বয়ে ওই গ্রুপটি খোলা হয়।
গ্রুপ খোলার পর মহাপরিচালক সরাসরি যুক্ত হয়ে নির্দেশ দিয়েছে দাবি করে বিটিআরসির এই কর্মকর্তা ট্রাইব্যুনালকে বলেন, এই হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপটি খোলার পর আমি ওই গ্রুপেই আমাদের মহাপরিচালককে বিষয়টি অবগত করি। এরপর তিনি একটি গ্রুপ কল করেন। গ্রুপ কলে তৎকালীন মহাপরিচালক ইন্টারন্যাশনাল টেরিস্ট্রিয়াল কেবল অপারেটরদেরকে আপস্ট্রিম (ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ) বন্ধ করার ব্যাপারে সরকারের নির্দেশনা অবহিত করেন। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ২০২৪ তারিখে আনুমানিক রাত ৯টায় অপারেটরদের মাধ্যমে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়।
অপারেটরদের কাছ পাঠানো বার্তার বিষয়ে বিটিআরসি এই কর্মকর্তা বলেন, আইআইজি (ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেইটওয়ে) অপারেটরদের সমন্বয়ে পূর্বে গঠিত একটি গ্রুপে তৎকালীন মহাপরিচালক মহোদয় আমাকে একটি এসএমএস করার নির্দেশনা দেন। এসএমএসটি ছিল, ‘As per the instruction I am directed to inform you to shutdown the internet from your IIG and send done after completion।’ এই এসএমএসটি ইন্টারনেট বন্ধ করার পূর্বেই নির্দেশিত হয়ে অবহিত করা হয়। এরপর ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যায়। ১৮ জুলাই রাত ৯টা থেকে ২৩ জুলাই বিকাল পর্যন্ত ইন্টারনেট সম্পূর্ণরূপে বন্ধ থাকে।
সামাজিক মাধ্যম বন্ধ রেখে সীমিত চালুর নির্দেশ : ইন্টারনেট বন্ধ থাকার পর কিছু স্থানে সংযোগ দেওয়া নিয়ে জবানবন্দিতে সাক্ষী বলেন, ২৩ জুলাই প্রতিমন্ত্রী পলক আইআইজি (ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে) এবং সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিনিধির সমন্বয়ে একটি সভায় ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটক বন্ধ রেখে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থানে (যেমন ব্যাংক, সংসদ ভবন, ক্যান্টনম্যান্ট ইত্যাদি) সীমিতভাবে ইন্টারনেট চালুর নির্দেশনা দেন। ৩১ জুলাই প্রতিমন্ত্রী বিটিআরসি চেয়ারম্যানের ইন্টারনেট পুনরায় চালু করার নির্দেশনা দেন। পুরো প্রক্রিয়ার দালিলিক প্রমাণের বিষয়ে তিনি আদালতকে নিশ্চিত করে বলেন, উপরে বর্ণিত সকল কার্যক্রম নথির মাধ্যমে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট হতে অনুমোদন গ্রহণ করা হয়েছে, যা নথিতে সংরক্ষিত আছে। আমার যে মোবাইল ফোনসেট থেকে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপটি চালু করা হয়েছিল তা তদন্তকারী কর্মকর্তা জব্দ করেন।











