
বছর ঘুরে আবারও এসে গেলো পয়লা বৈশাখ বা নববর্ষ। এই বাংলাদেশ আবারও উদ্ভাসিত হবে আনন্দ উচ্ছাসে নতুন বছরের সমৃদ্ধি কামনায়। এই বাংলা নতুন বছরের আবাহন বিশেষ কোনো সমপ্রদায় কিংবা গোষ্ঠীর নয়, এটি বাঙালী জাতিরই প্রানের উৎসব। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল, ঈদ, পূজা এবং অন্যান্য ধর্মীয় উৎসবের মতো বাংলা নববর্ষ পালনকে আমরা একটি মর্যাদাপূর্ণ উৎসব হিসেবেই পালন করে আসছি যুগ যুগ ধরে। আমরা জানি , ১৯৬৭ সালে ছায়ানট প্রথম ঢাকার রমনার বটমূলে এই বর্ষবরণের আয়োজন করেছিলো এবং সময়টা ছিলো পাকিস্তানী আমল। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে সাহসী ভূমিকা পালন করেছিলেন প্রয়াত সঙ্গীতশিল্পী সনজীদা খাতুন। তাঁর একটি দর্শনই ছিলো, বাঙালী জাতির প্রতিটি মানুষকে নৈকট্যের মধ্যে নিয়ে আসা এবং আপন জাতিসত্তার বোধে সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ চলমান রাখা। তাঁর সাথী হয়েছিলেন শিল্পী ওয়াহিদুল হক । সেই থেকে বাংলা বর্ষবরণ পরম্পরার উৎসব হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। প্রভাতের নরম আলোয় নববর্ষের সেই ক্ষণ বাঙালি জাতিকে মুক্তিকামী করেছিল , এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল একাত্তরের স্বাধীনতার পথে।
ইংরেজি বর্ষবরণের সাথে বাংলা বর্ষবরণের একটি তফাৎ রয়েছে। ইংরেজি বর্ষবরণ পালন করা হয় রাত বারোটায়, কিন্তু বাংলা বর্ষবরণ হয় খুব ভোরে। সকালের স্নিগ্ধতায় নতুন বছরের আবাহন প্রত্যাশার আলোকে নবতর দিগন্তে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে। আমরা কখনোই বাংলা নববর্ষকে রাতের ব্যাপার হিসেবে দেখিনি। আমরা দেখেছি আলোয় উদ্ভাসিত জীবনের জয়গান হিসেবে। একুশে ফেব্রুয়ারিকে আমরা রাত ১২ টা ১ মিনিটে পালন করা শুরু করি, এটা শুরু হয়েছিল স্বাধীনতার পর। বাঙালীপনার দিক থেকে এটা অপ্রত্যাশিতই বটে কিন্তু আমরা পশ্চিমী সংস্কৃতির ধ্যান ধারনাকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে এমনটি করেছি। যদিও মধ্যরাতে একুশ পালন এক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় চলে যায় অন্তত মেয়েদের জন্য, কিন্তু পয়লা বৈশাখতো সেভাবে হতে পারে না , যেখানে নারীপুরুষের মিলনমেলা দিবসের আলোতেই পরিপূর্ণতা পায়।
বাঙালী হিসেবে আমাদের গর্ব করার মতো একটি বিষয় রয়েছে যে, একুশে ফেব্রুয়ারী ইউনেস্কো কর্তৃক আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হয়েছে। আমাদের বাংলা ভাষা নিছক কোন অবহেলিত বিষয় নয়, ৫২ তে আন্দোলনের মাধ্যমে অর্জিত মাতৃভাষা। আমাদের এই বাংলাকে, বাঙালী সংস্কৃতিকে পয়লা বৈশাখের কাছে যেতেই হয়। কেননা এই বৈশাখই আমাদের শিখিয়েছে বাংলা এবং বাঙালী সংস্কৃতির গুরুত্ব কতটুকু।
এ বছরও ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ এবং ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ নিয়ে বিতর্ক চলছে। গত বছরই একজন উপদেষ্টার সিদ্ধান্তে একে ‘আনন্দ শোভাযাত্রা ‘নামে আখ্যা দিয়ে র্যালী হয়েছিল। কিছু ধর্মীয় সংগঠনও নামের এই পরিবর্তনের পক্ষে ছিল। কিন্তু তারা হয়তো জানেননা, এই মঙ্গল শোভাযাত্রা একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও সর্বজনীন র্যালি। ১৯৮৯ সাল থেকে এটি আনন্দ শোভাযাত্রা নামে শুরু হলেও ১৯৯৬ সালে মঙ্গল শোভাযাত্রা নামে খ্যাতি পায়। এর মধ্যে না ছিল কোনো সমপ্রদায়গত ভাবনা, না কোনো ধর্মীয় দর্শন। কেউ কেউ মঙ্গল আর আনন্দ শোভাযাত্রার মধ্যে পার্থক্য খুঁজে পান না। আনন্দ শোভাযাত্রার মধ্যে শুধুমাত্র আনন্দ আর হৈ হুল্লোরের বহিঃপ্রকাশ ঘটে কিন্তু মঙ্গল শোভাযাত্রায় অশুভ শক্তিকে দূর করে দিয়ে সমাজে শুভ ভাবনার প্রতিফলন ঘটিয়ে মঙ্গলের বারতা নিয়ে আসার প্রত্যয় প্রকাশিত হয়। সর্বোপরি ,২০১৬ সালে এই ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’কে ইউনেস্কোর বিশ্বব্যপী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে তাৎপর্যমন্ডিত করা হয়েছে। অধ্যাপক ড. সৈয়দ আলী আহসান তাঁর এক প্রবন্ধে বলেছিলেন ‘পয়লা বৈশাখ ধর্মাশ্রিত কোন দিন নয়, এটি সামাজিকতার প্রভায় উদ্ভাসিত। এটা ঠিক যে, বাংলা নববর্ষ উদযাপনের ক্ষেত্রে হিন্দুদেরই তৎপরতা ছিল বেশি, মুসলমানদের নয়। কিন্তু বর্তমানে আজকের ঢাকায় চকবাজার, ইসলামপুর, বাদামতলী এবং চুরিহাটার মহল্লায় মুসলমানরা জমজমাট ব্যবসা করছেন এবং পয়লা বৈশাখে হালখাতা করেন। হিন্দুদের হাতে থেকে পয়লা বৈশাখ যেমন হিন্দুদের অনুষ্ঠান হয়নি, তেমনি মুসলমানদের হাতে এসে এটা কেবল মুসলমানদের অনুষ্ঠান হচ্ছে না। কোন মাত্রাতেই এটা ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়’ ( নববর্ষ : আমাদের জন্য)। তাই বলা যায় পয়লা বৈশাখ উৎসব একটি জাতীয় উৎসব।
ধর্মীয় সীমাবদ্ধতায় নববর্ষকে এখন বেঁধে রাখা আর সম্ভব নয়। যেমনটি পারেনি পাকিস্তানীরা, যখন শুরু হল বর্ষবরণ, তখনো বাঙালী সংস্কৃতির লালন পালনকে উপনিবেশিক শক্তি দমিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সফল হয়নি। এখনো পারবেনা। বাংলা নববর্ষ পালন আমাদের সংস্কৃতিরই একটি অংশ এবং এ সংস্কৃতির ওপর বিভিন্ন সময় আঘাত এসেছে। আমরা দেখেছি, ২০০১ সালে রমনার বটমূলে পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠানে মৌলবাদীদের হামলার ঘটনা, গতবছর দেখেছি ছায়ানটে হামলার দৃশ্য কিংবা চট্টগ্রামের ডিসি হিলে বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে হামলা। যদি বলি সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র ডিসি হিলের কথা তবে সেটাও এখন অবরুদ্ধ আমলাতন্ত্রের কাছে। এগুলো আমাদের মনকে নাড়া দেয়, বিক্ষুব্ধ করে তোলে। কিন্তু আমাদের পারস্পরিক বন্ধনকে ছিন্ন করতে পারেনি। দিনে দিনে তা আরো বেশি মজবুত হচ্ছে। বিদেশী সংস্কৃতির ডামাডোলের মাঝেও আমরা বাঙালি সংস্কৃতির স্পন্দনে সি আর বি’র শিরিষ তলাকেও প্রাণময় করেছি। বিভিন্ন লোকজ মেলার মাধ্যমে প্রাণময় করেছি দেশের প্রতিটি অঞ্চলকে। এবারতো চট্টগ্রামে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান করতে চলেছি শহীদ মিনারের পাদদেশেও। এগুলো নানা বিরুদ্ধতার মাঝে বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে একত্রিত করার প্রয়াস।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘প্রতিদিন মানুষ ক্ষুদ্র, দীন, একাকী। কিন্তু উৎসবের দিনে মানুষ বৃহৎ, সে সমস্ত মানুষের সংগে একত্র হইয়া বৃহৎ, সেদিন সমস্ত মনুষ্যত্বের শক্তি অনুভব করিয়া বৃহৎ।’ আজ থেকে একশো বছর আগেও রবীন্দ্রনাথ ভেবেছিলেন মানুষে মানুষে যুথবদ্ধতার তাৎপর্য, উৎসবের জীবন্ত আনন্দের রূপময়তা। এত বছর পরে এসেও এ কথার মর্মার্থ ম্লান হয়নি বরং গুরুত্ব বেড়ে গিয়েছে। আমাদের হানাহানি, সামাজিক বিশৃঙ্খলা এসবের মধ্যে উৎসবের পরিসরে সে হোক ঈদ, পূজাপার্বণ, লোকজ মেলা কিংবা পয়লা বৈশাখ, সব মিলনমেলাতেই এক মনুষ্যত্বের উপলব্ধি জাগ্রত করে প্রাণময় হবার আকাঙ্ক্ষা।
জাতি হিসেবে আমাদের রয়েছে নিজস্ব ভূখন্ড, নিজস্ব ভাষা, রয়েছে নিজস্ব কৃষ্টি, সংস্কৃতি। এ আমাদের আত্মপরিচয় । এ না থাকলে জাতি হিসেবে রাষ্ট্র গঠনে আমাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়না। বাঙালি সত্তা জাগিয়ে তোলার ক্ষেত্রে মূল্যবোধ, সামাজিক রীতিনীতি পালনের তাগিদ অনুভব করার জন্য পয়লা বৈশাখ পালনের সংস্কৃতি বড়ো প্রয়োজন। জাতীয় জীবনে দেশজ সংস্কৃতি প্রভাব বিস্তার করে সুস্থ ও সচেতন সমাজ গঠনে সহায়তা করে। বিভিন্ন লোকাচার এবং গ্রামীণ সংস্কৃতি মানুষের মানস গঠনে প্রভাব বিস্তার করে।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ যেভাবে বলেছিলেন তাঁর এসো হে বৈশাখ’ কবিতায় ‘তাপস নিশ্বাস বায়ে, মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে’ কিংবা ‘মুছে যাক গ্লানি মুছে যাক জরা, অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা’ তাঁর এ কথা বাঙালীর নববর্ষ পালনে এক দর্শনের জন্ম দেয় যা পুরাতনকে বিদায় করে নতুনের আবাহন জাগ্রত হয়। বিশ্ববিধাতা আমাদের মাঝে যে নববর্ষ পাঠিয়েছেন তার সমস্ত শক্তি পরম্পরায় মানুষের মাঝে চিরজাগরূক থাকুক এটাই প্রত্যাশা। নববর্ষের শান্ত প্রভাত আমাদের সমস্ত গ্লানি, আজকের যুদ্ধময় বিশ্বের হানাহানি এ সব কিছুর অবসানে কল্যাণের বারতা নিয়ে আসুক।
লেখক : প্রাবন্ধিক, আবৃত্তিশিল্পী













