
১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর ‘বঙ্গভঙ্গ’ যখন আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়, সেই সময় নজরুল ছয় বছরের বালক (১৯৯৯–১৯৭৬), ডাক নাম দুখু মিয়া। ভারতীয় উপ–মহাদেশে পোক্ত হয়ে বসা শাসক ব্রিটিশ রাজনীতির হালচাল, গতি–প্রকৃতির বাইরে তিনি তখন বর্ধমান জেলার চুরুলিয়ার রুক্ষ কঠিন, কয়লা খনির পাথুরে মাটির সান্নিধ্যে বেড়ে উঠছেন। কলকাতা শহর থেকে ২২৮ কিলোমিটার দূরে, যোগাযোগ সংকুল রাঢ় বাংলার শেষ সীমান্ত সেটি। যেন কাকতালীয়, এদিকে বৃহৎ বঙ্গের রাজনীতিতেও হিন্দু–মুসলিম দুই সমপ্রদায়ের সম্মিলিত শক্তিকে খর্ব করার জন্য সূচনা হয়েছে দুঃখের ফাটল যার প্রধান উদ্যোক্তা ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড কার্জন। বঙ্গভঙ্গের যে–বিষময় ফল তার সঙ্গে ভবিষ্যতের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম মুখোমুখি হবেন এর দেড়যুগ পরে করাচির পল্টন থেকে ফিরে কলকাতায়, কবি কাজী নজরুল ইসলাম নামে লেখক জীবনের শুরুতেই।
তৎকালীন বৃহৎ–বাংলাকে ভাগ করে ভারতীয় রাজনীতিকে বিভক্ত করার জন্য সবচেয়ে বেশি আগ্রহ ছিল বাঙালি বিদ্বেষী ইংরেজ ভাইসরয় লর্ড কার্জনের। তিনি বঙ্গবিভাগের আগে জনমত তার পক্ষে আনার জন্য পূর্ববঙ্গ সফর করেছেন। সেই সময় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা যাবার পথে ট্রেনে বসে তাঁর সময়ের ভারত সচিবকে ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে চিঠি লিখে ‘বঙ্গবিভাগ’ সম্পর্কে তার মনোভাব প্রকাশ করেছেন। সেই চিঠিতে তিনি পরিষ্কার ভাবেই বলেছেন,
‘বাঙালীরা, নিজেদেরকে যারা একটি জাতি বলে ভাবতে পছন্দ করে, এবং যারা এমন একটি ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে যখন ইংরেজদেরকে বিদায় করে দিয়ে কলকাতার গভর্নমেন্ট হাউজে একজন বাঙালী বাবুকে অধিষ্ঠিত করবে, তারা অবশ্যই তাদের ওই স্বপ্ন বাস্তবায়নে হস্তক্ষেপ ঘটতে পারে এমন যে কোনো প্রতিবন্ধকের ব্যাপারে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করবে। আমরা যদি তাদের হৈচৈ–য়ের কাছে নতি স্বীকার করার মতো দুর্বলতা প্রকাশ করি, তাহলে আগামীতে বাংলাকে কখনোই খণ্ডিত বা দুর্বল করতে পারবো না, এবং ভারতের পূর্ব পার্শ্বে আপনি এমন একটি শক্তিকে সংযুক্ত ও দৃঢ় করবেন যেটি ইতিমধ্যেই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে এবং ভবিষ্যতে তা ক্রমবর্ধমান গোলযোগের নিশ্চিত উৎস হয়ে দাঁড়াবে। (উদ্ধৃতি : সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : জাতীয়তাবাদ, সামপ্রদায়িকতা ও জনগণের মুক্তি : সংহতি : পৃষ্ঠা : ১৫)
বাঙালিদের দুর্ভাগ্য, তারা লর্ড কার্জনের ইচ্ছের ফাঁদে পা দিয়েছে। ভারতীয় রাজনীতিতে কংগ্রেস তখন প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু তারা বৃহৎ অংশ মুসলমানদের আশা–আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। ফলে মুসলিম সমপ্রদায় বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হওয়ার পরের বছরই স্বতন্ত্র দাবি করে রাজনৈতিক সংগঠন মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা (১৯০৬) করেছে। এতে ইন্ধন ছিল ব্রিটিশ শাসকের, ইন্ধন ছিল হিন্দু জাতীয়তাবাদী সামাজিক নেতাদের, রাজনীতিকের, প্রভাবশালী শক্তিশালী লেখকের, নব্য জমিদার প্রভাবশালীদের। বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে প্রবল আন্দোলনের ফলে পরবর্তী ব্রিটিশ শাসক ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ রদ করেছে। একথা মনে করা যাবে না যে, রঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলনে মুসলমানেরাও বিশেষ করে, পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুদের সঙ্গে সমানতালে অংশগ্রহণ করেছিল। না, তা করেনি। যার ফলে, লক্ষ করা গেছে যে, ১৯০৫–এর সময়ের আগের বাঙ্গদেশ আর ১৯১১–এর পরের যুক্তবাংলা এক ছিল না। প্রাগুক্ত গ্রন্থের লেখকের রচনায় তখনকার রাজনৈতিক সামাজিক পরিস্থিতির বিবরণ সংক্ষেপে এমন : ব্রিটিশ শাসক ভয় পাচ্ছিল বাঙালীদের রাজনৈতিক চেতনাকে, সম্মিলিত শক্তিকে। যার ফলে শাসনতান্ত্রিক সুবিধার কথা বলে ভাগ করেছে। ‘বঙ্গবিভাগ’ হওয়ার পর বিত্তবান বাঙালীরা দেখতে পাচ্ছিল, বঙ্গবিভাগ তাদেরকে স্থায়ীভাবে দুর্বল করে দেবে। বিশেষ করে, আর্থিক দিক থেকে তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কেননা, ততদিনে কলকাতাকে কেন্দ্র করে অবিভক্ত বঙ্গে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক জীবন গড়ে উঠেছিল। এর সাথে সম্পৃক্ত ছিল জমিদার, চাকুরিজীবী, পেশাজীবী, ব্যবসায়ী, ব্যারিস্টার সকলে। নব্য জমিদারদের বেশির ভাগ থাকতো কলকাতায়, কিন্তু তাদের জমিদারী ছিল পূর্ববঙ্গে। তাদের আয়ের প্রধান উৎস ছিল ওই জমিদারী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে বঙ্গভঙ্গের পক্ষে নিজেকে সরাসরি যুক্ত করেছিলেন, যদিও তিনি এর সামপ্রদায়িক চেহারা দেখতে পেয়ে সরে এসেছিলেন, তার কারণও ছিল পূর্ববঙ্গে তাঁর জমিদারী হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার আশংকা।
‘বঙ্গভঙ্গ’ যেদিন আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়েছে, সেদিন কলকাতায় হরতাল হয়েছে। বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলনের ভিতর একটি জাতীয়তাবাদী ঐক্য গড়ে উঠার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। কিন্তু ঐতিহাসিক ভুল হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের ‘বন্দেমাতরম’ গান এবং ধ্বনির উল্লেখযোগ্য ভূমিকা হিন্দু–মুসলমানের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক বিভাজন তৈরি করলো। যার ফলে সামপ্রদায়িক বিভাজন ও সামপ্রদায়িকতার কদর্য রূপ পরে এমনভাবে প্রকাশ পেল, যার ভবিষ্যৎ পরিণাম সম্পর্কে খুব ভালো করেই অবহিত ছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেমে গেলে করাচির পল্টন থেকে ফেরৎ ‘নবযুগ’র কবি কাজী নজরুল ইসলাম। ১৯০৫ সালে যিনি ছিলেন ছয় বছরের বালক, বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তবঙ্গের কলকাতায় (১৯২০) দুই সমপ্রদায়ে বিভক্ত ভারতীয় রাজনৈতিক আগুনে পা রাখা নবীন কবি হাবিলদার কাজী নজরুল ইসলামের বয়স তখন ২১ বছর।
কাজী নজরুল ইসলাম সাংবাদিক হিসেবে সুহৃদ মুজফফর আহমদের সঙ্গে যুগ্মভাবে ‘দৈনিক নবযুগ’ পত্রিকা সম্পাদনার মধ্য দিয়ে পূর্নভাবে লেখক জীবন শুরু করেন। বলেছি, তিনি অবহিত ছিলেন সামপ্রদায়িক বিভাজনের হোতা সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশের শাসনের ‘ভাগ কর এবং শাসন কর’ নীতির বিষময় ফল। হিন্দু–মুসলমান উভয় সমপ্রদায়ের নিজেদের ভিতরের দুর্বলতার ফাঁকটুকুও নজরুল অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলনের ইতিবাচক দিক হতে পারতো ব্রিটিশ বিরোধী সম্মিলিত জাতীয়তাবাদী ঐক্য। যার ভিত্তিতে স্বাধীনতার জন্য প্রবল আন্দোলন সৃষ্টি হলে সাম্রাজ্যবাদী শাসক ক্ষমতায় টিকতে পারতো না। কিন্তু তা না হয়ে এই বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলনের আড়ালে একটি অন্ধকার বিভেদের স্বার্থ ক্রমশ দানা বাঁধলো। আর তা হলো, আন্দোলনে ধর্মকে ব্যবহার করা হয়েছে। যার ব্যবহার দিনে দিনে বেড়েছে। ব্রিটিশ শাসকেরা হিন্দু–মুসলমান উভয়ের সামপ্রদায়িক মানসিকতা বুঝতে পেরে তা বৃদ্ধিতে উভয় সমপ্রদায়কে উৎসাহিত করেছে। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগে উপরতলার রাজনীতির সঙ্গে যারা যুক্ত ছিলেন তারা তাদের অজান্তেই যেন ১৯৪৭–এর সময়ের বিভক্তিকে অনিবার্য করে তুলেছে। বলা হয়েছে, ১৯০৫ সালে রাজনৈতিক পক্ষ ছিল দু’টি, ব্রিটিশ শাসক ও শাসিত জনগণ; ১৯০৬–এ নিখিল ভারত মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তৈরি হলো তিনটি পক্ষের– ব্রিটিশ শাসক, শাসিত হিন্দু এবং শাসিত মুসলমান। (প্রাগুক্ত : পৃষ্ঠা : ১৫–২৫)
এমন বিভাজন সম্পর্ক, ভেদনীতি মানবতাবাদী অসামপ্রদায়িক কবি নজরুলের কখনোই কাম্য ছিল না। যে–কারণে নজরুল কাব্য–সাহিত্যাঙ্গনে আবির্ভাবের সময় থেকেই হিন্দু–মুসলিম উভয় সমপ্রদায়ের মধ্যে মিলনের জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, নজরুল ‘যুগবাণী’ (১৯২২) প্রকাশের পর থেকে ‘সাম্যবাদী’, ‘সর্বহারা’ (১৯২৬) কাব্যগ্রন্থ পর্যন্ত যেতে যেতে বুঝে গিয়েছিলেন, হিন্দু–মুসলিম মিলনের প্রচেষ্টাকে উভয় সমপ্রদায়ের অধিকাংশই সুনজরে দেখেনি। যেমন, তিনি বলেছেন, কেউ বলেন, আমার বাণী যবন, কেউ বলেন, কাফের। আমি বলি, ও দুটোর কোনটাই নয়। আমি হিন্দু–মুসলমানকে এক জায়গায় ধরে এনে হ্যাণ্ডশেক করাবার চেষ্টা করেছি। গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছি। (ন র, বা এ ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা : ৯১)
‘বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির জু্বলী উৎসবে’ সভাপতির ভাষণে নজরুল নিজের ভূমিকা সম্পর্কে বেদনা নিয়েই বলেছেন, ‘হিন্দু মুসলমানে রাতদিন হানাহানি, জাতিতে জাতিতে বিদ্বেষ, যুদ্ধ–বিগ্রহ, এই অসাম্য, এই ভেদজ্ঞান দূর করতেই আমি এসেছিলাম। আমার কাব্যে, সঙ্গীতে, কর্মজীবনে অভেদ সুন্দর সাম্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম। অসুন্দরকে ক্ষমা করতে, অসুন্দরকে সংহার করতে এসেছিলাম। (যদি আর বাঁশি না বাঁজে : ন র ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ১২৭)
কার্যত উভয় সমপ্রদায়ের মধ্যে মিলন প্রচেষ্টায় নজরুল সফল হননি। কেননা, ১৯২০ সালের এপ্রিলে কলকাতায় ফিরে আসা সেই সময়ের উদ্দমী নজরুল আর ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে ২২মে কৃষ্ণনগর সম্মেলনের উদ্বোধনী মঞ্চে যে নজরুল, এই দুই সময়ের মধ্যে তখন বিরাট ফারাক। বিগত ছয়বছরে প্রবল উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে নজরুল গণ–আন্দোলনের পুরোধায়ী হয়ে. রাজনীতিক না হয়েও রাজনীতির মঞ্চে, সারাদেশে চারণের ভুমিকায় নেমেছিলেন। কৃষ্ণনগর সম্মেলনের উদ্বোধনী মঞ্চে সদ্য লিখিত ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ গান গেয়ে তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে ‘হুঁশিয়ার’ করতে হলো কেন?। কেননা, তার আগে দুটি রাজনৈতিক ঘটনা ঘটেছে। যাতে নজরুল শংকিত হয়েছেন সেই সঙ্গে হতোদ্যম হয়েছেন। প্রথম ঘটনা : ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দের ২রা এপ্রিল শুক্রবার থেকে কলকাতায় রাজরাজেশ্বরী মিছিল উপলক্ষে সামপ্রদায়িক সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়েছে। দ্বিতীয় ঘটনা : দাঙ্গার পরের মাসে ২২মে কৃষ্ণনগর বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনে কংগ্রেস–কর্মী–সংঘের সদস্যদের উদ্যোগে ‘হিন্দু–মুসলিম প্যাক্ট’ নাকচ করে প্রস্তাব গ্রহণ। যার ফলে, এই সম্মেলনেই নজরুল ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ গান গেয়ে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে সতর্ক করেছেন। কিন্তু কাণ্ডারীদের কানে তাঁর আবেদন পৌঁছেনি। ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ ১৩৩৩ (১৯২৬) জৈষ্ঠের ‘বঙ্গবাণী’তে প্রকাশিত হয়। এতে পাদটিকা দেওয়া ছিল : ‘কৃষ্ণনগর প্রাদেশিক সম্মিলনীতে গীত।’ ১৩৩৩ আশ্বিনের ‘কালি–কলমে’ও এই গানটির কবি–কৃত স্বরলিপি–সহ প্রকাশিত হয়েছে। বলা বাহুল্য, গণ–সংগীতের ভান্ডারে ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ উল্লেখযোগ্য সংযোজন।
আমাদের জানা আছে, এ–বছর (১৯২৬) ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতাটির একশত বছর পূর্ণ হয়েছে। ‘সর্বহারা’ কাব্য–গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত এই কবিতাটির আবেদন চিরকালের। যে–পরিস্থিতির কারণে নজরুল কালজয়ী এই কবিতা / সংগীতটি রচনা করেছিলেন সেই সময় থেকে এই একুশ শতকে আমরা একটুও এগিয়ে আসিনি বরং উপ–মহাদেশের সামপ্রদায়িক পরিস্থিতি আরও নিম্নগামী হয়েছে। কবিতাটিতে নজরুল যে–ভাব ব্যক্ত করেছেন, সকলের জন্য আজকের এই বিভেদের রাজনীতির যুগে তার অনুধাবন প্রয়োজন। সত্যিকার অর্থে জাতির সামনে তখন ‘কাণ্ডারী’ বলতে কেউ ছিল না। তারা ছিল দ্বিধা–বিভক্ত। কেউ কংগ্রেস, কেউ মুসলিম লীগ। চোখ ছিল তাদের ক্ষমতার দিকে। মানুষের দিকে নয়। নেতৃবৃন্দকে উদ্দেশ্য করে নজরুল বলছেন, সামনের পথ বিপদ–বিপদ সংকুল, কঠিন এই পথ পাড়ি দিতে তাই তিনি সাহসী তারুণ্যকে আহ্বান করছেন :
দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, ভুলিতেছে মাঝি পথ,
ছিঁড়িয়াছে পাল, কে ধরিবে হাল, আছে কার হিম্মৎ ?
কে আছ জোয়ান হও আগুয়ান হাঁকিছে ভবিষ্যৎ।
এ তুফান ভারি, দিতে হবে পাড়ি, নিতে হবে তরী পার।।
প্রকৃতপক্ষে, ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতাটির প্রতিটি স্তবকে আছে বিগত দিনের সমকালের রাজনীতি। বিভেদের ষড়যন্ত্র ছেড়ে কবির প্রত্যাশা, অভেদ ধর্মনীতির চর্চা। কেননা, ধর্মের আগে তো মানুষ। মানবতাবাদী কবি নজরুলের এই বিশ্বাস চব্বিশ বছরের সাহিত্য জীবনে বজায় ছিল। আর্য সমাজের ধর্মীয় মিছিলে হামলাকে কেন্দ্র করে কলাকাতায় ২রা এপ্রিল শুরু হওয়া সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ৬ তারিখ পর্যন্ত চলে। জানা যায়, এই সময় নজরুল ‘লাঙ্গল’ পত্রিকার কাজে কলকাতায় অবস্থান করছিলেন। নজরুল হিন্দু–মুসলমানের মধ্যে এই রক্তক্ষয়ী হানাহানির প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। এতে তিনি বেদনাক্ষুব্ধ হন। এরই প্রতিক্রিয়ায় লিখেন ‘মন্দির ও মসজিদ’ এবং ‘হিন্দু–মুসলমান’ নামে দুটি প্রবন্ধ।
‘মন্দির ও মসজিদ’ রচনায় নজরুল প্রকৃত সত্যটাই ফুটিয়ে তুলেছেন । লিখেছেন :
‘মারো শালা যবনদের!’ ‘মারো শালা কাফেরদের!’ – আবার হিন্দু মুসলমানি কাণ্ড বাধিয়া গিয়াছে। প্রথমে কথা–কাটাকাটি, তারপর মাথা–ফাটাফাটি আরম্ভ হইয়া গেল।ৃ আল্লার এবং মা কালীর ‘প্রেস্টিজ’ রক্ষার জন্য যাহারা এতক্ষণ মাতাল হইয়া চিৎকার করিতেছিল তাহারাই যখন মার খাইয়া পড়িয়া যাইতে লাগিল, দেখিলাম–তখন আর তাহারা আল্লা মিয়া বা কালী ঠাকুরানির নাম লইতেছে না। হিন্দু–মুসলমান পাশাপাশি পড়িয়া থাকিয়া এক ভাষায় আর্তনাদ করিতেছে, ু ‘বাবা গো, মা গো!’ ু মাতৃপরিত্যক্ত দুটি বিভিন্ন ধমের্র শিশু যেমন করিয়া এক স্বরে কাঁদিয়া তাহাদের মাকে ডাকে! দেখিলাম, হত–আহতদের ক্রন্দনে মসজিদ টলিল না, মন্দিরের পাষাণ দেবতা সাড়া দিল না। ৃ
মন্দির এবং মসজিদ চিড় খাইয়া উঠিল, মনে হইল যেন উহারা পরস্পরের দিকে চাহিয়া হাসিতেছে! -(মন্দির মসজিদ : নজরুল রচনাবলী, ২য় খণ্ড, বা এ, পৃষ্ঠা : ৪৩১–৪৩৩)
নজরুলের উপর্যুক্ত রচনারই প্রতিধ্বনি আছে ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতার নিম্নোক্ত স্তবকে :
অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া, জানে না সন্তরণ,
কাণ্ডারী! আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তিপণ!
‘হিন্দু না ওরা মুসলিম?’ ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?
কাণ্ডারী! বলো ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র!
‘হিন্দু–মুসলমান’ রচনায় ধর্মের নামে মনুষ্যত্বের বিনাশে ক্ষুব্ধ নজরুল গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রসঙ্গ টেনে মানুষ নামের পশুকে চিহ্নিত করেছেন। লিখেছেন,
‘গুরুদেব বললেন, দেখো, যে ন্যাজ বাইরের, তাকে কাটা যায়, কিন্তু ভিতরের ন্যাজকে কাটবে কে? হিন্দু–মুসলমানের কথা মনে উঠলে আমার বারেবারে গুরুদেবের ঐ কথাটাই মনে হয়।
সঙ্গে সঙ্গে এ প্রশ্নও উদয় হয় মনে, যে এ–ন্যাজ গজালো কী করে? এর আদি উদ্ভব কোথায়? ওই সঙ্গে এটাও মনে হয়, ন্যাজ যাদেরই গজায় তা ভিতরেই হোক আর বাইরেই হোক–তারাই হয়ে ওঠে পশু। -(হিন্দু–মুসলমান : প্রাগুক্ত : পৃষ্ঠা : ৪৩৬)
প্রকৃতপক্ষে, এই পশুদের অপ–তৎপরতায় ভূ–ভারতের অসামপ্রদায়িক ইতিহাস বারবার পদদলিত হয়েছে। ব্রিটিশের পদলেহী বিশ্বাসঘাতকের ষড়যন্ত্রে বাঙালির স্বাধীন সুর্য অস্ত গেছে। ক্লাইভের খঞ্জর পলাশির প্রান্তরে লাল হয়েছে। আজও বিভেদের রক্ত ঝরার শেষ নেই। তথাপি, কবির বিশ্বাসেরও তো মৃত্যু নেই। ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিয়ে নজরুল ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন,
কাণ্ডারী! তব সম্মুখে এ পলাশীর প্রান্তর,
বাঙালির খুনে লাল হলো যেথা ক্লাইভের খঞ্জর!
ঐ গঙ্গায় ডুবিয়াছে হায়, ভারতের দিবাকর।
উদিবে সে রবি আমাদেরি খুনে রাঙিয়া পুনর্বার।
‘ধূমকেতু’র পরে স্বাধীনতা, মুক্তির আকাঙ্ক্ষা নজরুল আবারও ব্যক্ত করছেন খোলা ময়দানে। কেননা, ফাঁসীর মঞ্চে বিপ্লবীদের আত্মবিসর্জন কখনো বৃথা যেতে পারে না। যতই ষড়যন্ত্র, বিভেদের জন্য মন্ত্রণা থাকুক না কেন, মুক্তির মিছিলে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে রাজপথে জনগণের পিছনে আছে সেই শক্তি যাঁরা মৃত্যুকে ভয় করে না। কবিতায় নজরুল শহীদের স্মরণ করছেন, এ–কথা মনে করিয়ে দিয়ে,
ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেল যারা জীবনের জয়গান
আসি অলক্ষ্যে দাঁড়ায়েছে তারা, দিবে কোন বলিদান?
আজি পরীক্ষা জাতির অথবা জাতের করিবে ত্রাণ/
দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, কাণ্ডারী হুঁশিয়ার!
সন্দেহ নেই, জাতির অথবা জাতের পরীক্ষা বাঙালিকে আজও দিতে হচ্ছে। ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতার বিষয় ও ভাব যে–কারণে আজও সমান প্রাসঙ্গিক। বিশ্বাস করি, এই বাংলাদেশ নজরুলের বাংলাদেশ। আমাদের সংকটে বিপদে স্মরণে কবিতায় তিনি যেমন বলেছেন, তেমনি অলক্ষ্যে আমাদের সঙ্গে চলেন রাজপথে, মিছিলে। অবিনাশী কবি’র মৃত্যু নেই। মৃত্যু নেই তাঁর কবিতার।
লেখক: প্রফেসর (সাবেক) বাংলা বিভাগ, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ, হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলা একাডেমি ‘নজরুল পদক–২০২৫’ প্রাপ্ত নজরুল গবেষক।













