দেশে বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র সঙ্কটে রেমিটেন্স প্রবাহ বৃদ্ধি প্রসঙ্গ

মোহাম্মদ আলম | বৃহস্পতিবার , ২৬ জানুয়ারি, ২০২৩ at ৯:০৩ পূর্বাহ্ণ

২০২০ সালে এপ্রিল মাস থেকে কোভিড১৯ এবং ২০২০ সাল থেকে রাশিয়াইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পৃথিবীর সব দেশ কমবেশি প্রচণ্ড আর্থিক চাপে পড়েছে। কোভিড১৯ এর মারাত্মক আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে নেবার আগেই রাশিয়াইউক্রেন যুদ্ধ বর্তমান বিশ্বের জন্য বড় অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইতিমধ্যে কেবল গরিব দেশ সমূহ নয়, অনুন্নত, উন্নয়নগামী ও উন্নত সব দেশে মারাত্মকভাবে আর্থিক ক্ষতিগ্রস্তের আবর্তে পড়ে গেছে। এর থেকে উত্তরণের কোনো সুযোগ বা লক্ষণ এখনো পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না।

বিশাল জনসংখ্যা অধ্যুষিত দরিদ্র দেশ থেকে সদ্য উন্নয়নগামী বাংলাদেশকে এ যুদ্ধ মারাত্মক সংকটে ফেলে দিয়েছে। এতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকট ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, ক্রমাগত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাচ্ছে। এর থেকে উত্তরণের প্রধানতম ভরসা প্রবাসীদের রেমিটেন্স ও রপ্তানি খাত থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা করা। একই সাথে দেশে চরমভাবে আর্থিক দুর্নীতির গতিরোধ করা অপরিহার্য।

ইতিমধ্যে সরকার এর গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পেরে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় রেমিটেন্স প্রবাহ বৃদ্ধি করার যে প্রচেষ্টা করছে, আমি আশা করছি যদি প্রয়োজন ও বাস্তবতার নিরিখে আন্তরিকভাবে কিছু পদক্ষেপ নিয়ে এ চেষ্টা চালিয়ে যায় তাহলে বাংলাদেশের আর্থিক ক্রান্তিলগ্নে প্রবাসীরা রেমিটেন্স প্রবাহ বৃদ্ধি করে দেশের এ তীব্র সংকটে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে।

বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রায় এক কোটি ত্রিশ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ সহ অন্তত ৪২ দেশে কর্মরত আছেন। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী বছের ২২ থেকে ২৪ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত রেমিটেন্স এসেছিল। কিন্তু গত আর্থিক বছরে বৈশ্বিক আর্থিক মন্দা ও অন্যান্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণে রেমিটেন্স প্রবাহ কমে গেছে।

বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী বৈদেশিক মুদ্রার রেমিটেন্স সৌদিআরব থেকে প্রায় ৩০%, মধ্য প্রাচ্যের অন্যান্য দেশ থেকে প্রায় ৩০% আর অবশিষ্ট প্রায় ৪০% আসে ইউরোপ, আমেরিকা, মালেশিয়া সহ অন্যান্য সব দেশ থেকে। বর্তমানে গোটা বিশ্বে আর্থিক মন্দার কারণে প্রবাসীদের কর্মক্ষেত্রেও বিরূপ প্রভাব পড়েছে, তাদের আয় কমেছে অথচ খরচ বেড়ে গেছে। বর্তমানে রেমিটেন্স ভাটার ক্ষেত্রে ইহা একটি অন্যতম কারণ হলেও আরো কিছু বড় প্রতিবন্ধকতা রয়েছে।

আমি দীর্ঘ প্রায় চার দশক সৌদিআরব প্রবাসী হবার সুবাদে এদেশ থেকে প্রবাসীদের দেশে স্বতঃস্ফূর্তভাবে রেমিটেন্স পাঠানোর ক্ষেত্রে কিছু নিরুৎসাহ সহ আরো প্রতিবন্ধকতা নিবিড়ভাবে উপলব্ধি ও পর্যবেক্ষণ করেছি। আমার এই লেখায় এসব সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতা নিয়ে আলোকপাত করার চেষ্টা করছি।

এসব সমস্যা কিংবা প্রতিবন্ধকতার মধ্যে কিছু কিছু সমস্যা সব দেশের প্রবাসীদের জন্য অভিন্ন হলে ও সৌদিআরব থেকে রেমিটেন্স পাঠাতে কিছু ভিন্ন সমস্যা রয়েছে। সৌদিআরব সরকারের তাদের কিছু কঠোর আইনের কারণে এদেশ থেকে কোনো প্রবাসী চাইলেও নিজের প্রয়োজন মত রেমিটেন্স পাঠাতে পারে না। প্রবাসীদের চাকরি, রেসিডেন্স পারমিট বা একামার পেশা এবং মাসিক প্রাপ্ত বেতনের পরিমাণের উপর রেমিটেন্সের পরিমাণ নির্ভর করে। যেমন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, ম্যানেজার, মার্কেটিং বা সেলস রিপ্রেজেন্টটেটিভ এবং অন্য কোনো ভালো পেশায় যারা অপেক্ষাকৃত ভালো বেতন পেয়ে থাকেন, তারা মোটামোটি ভালো পরিমাণ অর্থ রেমিটেন্স পাঠাতে পারেন। তবে তাদের সংখ্যা খুবই কম।

সৌদিআরবে অধিকাংশ বাংলাদেশি প্রবাসীর পেশা লেবার বা সমমানের অন্যান্য পেশা। এসব পেশাদারীদের বেতন খুবই কম। এরা নিয়মিতভাবে দেশে পরিবারের কাছে টাকা পাঠায়। এদের অন্তত ৫০% হুন্ডিতে পাঠায়। এর কারণ হুন্ডিতে টাকার বিনিময় রেট বেশি, এবং কোনো খরচ ছাড়া পাঠানো ও খুব সহজ। হুন্ডির এজেন্টরা দেশের পরিবারের কাছে টাকা পাঠিয়ে তারপর প্রবাসীর কাছ থেকে সৌদি রেয়াল তাদের বাসায় গিয়ে সংগ্রহ করে। এদেশে বাংলাদেশের অনেকেই বিভিন্ন রকম ব্যবসা করেন। যদি ও বিগত কয়েক বছর ধরে সৌদি সরকারের কিছু কঠোর নীতির কারণে অনেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন।

তারপরও যেসব ব্যবসায়ী সম্প্রদায় এ দেশে আছে তারা অধিকাংশ টাকা হুন্ডিতে প্রেরণ করে। তার প্রধান কারণ ব্যাংক এর মাধ্যমে টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে এ দেশে আইনগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাছাড়া হুন্ডির রেট বেশি ও সহজে দেশে টাকা পাঠানো যায়। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় কর্তৃক আন্তরিক প্রচেষ্টায় বর্তমান সরকার রেমিটেন্সের উপর ২.% প্রণোদনা নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় ভাল উদ্যোগ। এর সুফল ও পাওয়া গেছে। কিন্তু বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষাপটে প্রকৃত সমস্যা অনুধাবন করে নিম্ন লিখিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারলে প্রবাসীদের আয় কমে যাওয়া সত্ত্বেও রেমিটেন্স প্রবাহ যথেষ্ট বৃদ্ধি পাবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে আশাবাদী।

এখানে একটি কথা বলা সংগত মনে করছি এদেশে থেকে যারা হুন্ডি এজেন্টের মাধ্যমে সৌদি রেয়াল সংগ্রহ করছে, তাদের পিছনে দেশে অবস্থানরত বড় কারো হাত দিয়ে যারা দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করে দিচ্ছে তাদের খুঁজে নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারলে এক্ষেত্রে ইতিবাচক ফল পাওয়া যেত।

প্রণোদনা বাড়িয়ে কিংবা অন্যভাবে হলেও টাকার বিনিময় রেট বাড়িয়ে অন্তত হুন্ডির সমান করতে পারলে তার সাথে সৌদি আরব সহ যেসব দেশ থেকে রেমিটেন্স পাঠানোর ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা সহ বিভিন্ন কড়াকড়ি রয়েছে তা সুরাহা করতে সংশ্লিষ্ট দূতাবাস ও বাংলাদেশ সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে আলোচনা করে সুফল পাওয়া যেতে পারে। এর সাথে খুবই গুরুত্বপূর্ণ আর একটি মত হচ্ছে সবচেয়ে বেশি রেমিটেন্স সৌদিআরব থেকে যায় অথচ এখানে বাংলাদেশের কোনো ব্যাংকের শাখা বা মানি এক্সেচেইঞ্জ নেই।

যদি তা থাকতো তাহলে একদিকে তারা অপেক্ষাকৃত ভালো রেট দিয়ে আরো বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ বা সংগ্রহ করত পারতো। এছাড়া সৌদিআরবে প্রবাসরত প্রায় ২৫ লাখ বাংলাদেশি স্বদেশী ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিটেন্স প্রেরণে স্বাচ্ছন্দবোধ করত। উল্লেখিত বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় যথাযথ উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি দেশে বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রার আপদকালীন সময়ে আরো বেশি রেমিটেন্স আহরণের ক্ষেত্রে বিশেষ প্যাকেজসহ প্রবাসীদের জন্য আরো সুবিধার ব্যবস্থা গ্রহণ করে তা ব্যাপকভাবে প্রচার করলে রেমিটেন্স বৃদ্ধিতে দ্রুত ইতিবাচক ফলাফল পাওয়ার সম্ভাবনা আরো বৃদ্ধি পাবে।

প্রস্তাবিত প্যাকেজ ও সুবিধা সমূহ :

. প্রবাসীদের জন্য আকর্ষণীয় ও লাভজনক কোনো প্রকল্প গ্রহণ যেমন ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগীয় শহরে সুলভ মূল্যে প্লট বরাদ্দ। এছাড়া অন্য কোনো লাভজনক ও নিরাপদ বিনিয়োগে প্রকল্প গ্রহণ। ২. প্রবাসীদের ছেলেমেয়ের জন্য সরকার সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অন্তত ৫% কোটা পদ্ধতি চালু। বর্তমানে সরকারি স্কুল ও কলেজে চালু আছে ০.%, যা একেবারেই অপ্রতুল। ৩. কমপক্ষে ১০,০০০ হাজার ইউএস ডলার সমপরিমাণ অর্থ একবছরে রেমিটেন্স পাঠালে তাদের পরিবারের জন্য অগ্রাধিকার কার্ড প্রদান। যা দেশের বিভিন্ন সেবা সংস্থায় অগ্রাধিকার পাবে। ৪. বিদেশে দূতাবাস, বিমানে ভ্রমণের সময়, দেশের বিমান বন্দরে সব সেবা সংস্থা প্রবাসীদের প্রতি আর ভালো আচরণ ও আন্তরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বিমানবন্দরে অভিযোগ বাক্স রাখা ও প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক সক্রিয় ভূমিকা পালন করা খুব প্রয়োজন। ৫. প্রতিটি থানায় প্রবাসীদের জন্য হেল্পডেস্ক খুলে বিভিন্ন সমস্যা আন্তরিকভাবে সহযোগিতার ব্যবস্থা করা। ইতিমধ্যে কিছু কিছু থানা ও জেলা পুলিশ সুপারের অফিসে তা খুলেছে, যা প্রশংসিত হয়েছে। ৬. রেমিটেন্সের টাকা স্থায়ী আমানতে রাখতে বাড়তি মুনাফা দিয়ে তা উৎসাহিত করা। দেশের ব্যাংক সমূহকে আস্থার সঙ্কট থেকে মুক্ত রাখা। ৭. প্রবাসীদের সার্বিক কল্যাণে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় কিংবা সরকারের নীতি নির্ধারক পর্যায়ে অভিজ্ঞ প্রবাসীদের প্রতিনিধি রেখে তাদের পরামর্শ নেয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ৮. সরকার ছাড়াও দেশে বেসরকারি আধা সরকারি বিভিন্ন সেবা প্রতিষ্ঠান যেমন বিভিন্ন ব্যাংক হাসপাতাল সহ অন্যান্য তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে প্রবাসীদের জন্য বিভিন্ন সুবিধার ঘোষণা করে রেমিটেন্স যোদ্ধাদের উৎসাহিত করতে পারে।

আই এম এফ থেকে কঠিন শর্তে যেখানে পাঁচ বিলিয়িন ডলার ঋণ এর জন্য সরকার আপ্রাণ চেষ্টারত। সেক্ষেত্রে প্রবাসীদের নিকট হতে রেমিটেন্স প্রবাহ বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারলে অনায়াসে প্রবাসীদের রেমিটেন্স বৃদ্ধি পেয়ে ২৪ বিলিয়ন থেকে ৩০ বিলিয়ন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে যোগ হতে পারে।

প্রবাসীরা মাতৃভূমির জন্য সর্বদা আন্তরিক। প্রতিজন প্রবাসী বিদেশে বিভিন্ন কষ্ট ও মানসিক চাপ নিয়ে কাজ করে। সরকার, দূতাবাস ও দেশবাসী প্রবাসী বন্ধুবা বা কর্মীদের প্রতি আন্তরিক, সহানুভূতিশীল ও শ্রদ্ধাবোধ বাড়ালে আশা করি সমস্ত প্রবাসী দেশের এ সংকট নিরসনে বড় ভূমিকা রাখবে, যা যা আমরা সব প্রবাসীদের একান্তভাবে কাম্য।

লেখক: সৌদি আরব প্রবাসী প্রাবন্ধিক, গল্পকার, সি আই পি (এন আর বি)

পূর্ববর্তী নিবন্ধপ্রত্যাশার যাতনা
পরবর্তী নিবন্ধআবদুল হাকিম (র:) মাইজভাণ্ডারীর জীবন ও কর্ম