সকালের সূর্য দেখে মনে হয় নির্মল আকাশে সূর্য তার তেজদীপ্ত প্রভা কখনই হারাবে না। সন্ধ্যা নামবে না। অমাবস্যার রজনী আসবে না। কিন্তু জাগতিক নিয়মে সবকিছুই আসে একে একে। জগতের সব কিছুই রূপাকারে প্রকাশ পায়। এটাই চিরন্তন সত্য। মানুষের জীবনও তাই। এই পৃথিবী স্রষ্টার অমোঘ সৃষ্টি যা মহাকালের বিস্ময়। যার কালস্রোতে হাজার কোটি বছরের অন্তহীন প্রবহমান। কেউ জানে না এই প্রবহমানতার শেষ কোথায়। প্রাণীকুলের অস্তিত্ব হলো দুইটি জন্ম–মৃত্যু। অবস্থানকাল খুবই সংক্ষিপ্ত ও ক্ষণস্থায়ী। এই পৃথিবী কল্যাণময় ও অপরূপ। আমরা এই পৃথিবীতে এসেছি একটা বিবর্তনের ধারায় প্রাকৃতিক নিয়মে। জীবন স্রষ্টার খুবই মূল্যবান উপহার। যেটা আমাদের প্রতিদিন শেখায়। এটা সুখে প্রতিযোগিতায়, সফলতায় ও ব্যর্থতায় পরিপূর্ণ। তাই শুধু বেঁচে থাকাটাই জীবন নয়। গভীরভাবে চিন্তা করলে বুঝা যায় মানুষের বেঁচে থাকার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রেরণা হলো তার দায়িত্ববোধ। এই দায়িত্ববোধ জীবন সংগ্রামে পরাজিত ব্যক্তি যে আত্মহত্যা করতে চেয়েও পারেনি। কারণ তার কাঁধে পরিবারের দায়িত্ব, সামাজিক দায়িত্ব, যেমন একজন অসুস্থ গার্মেন্ট শ্রমিক ‘মা’ তার অসুস্থ শরীর নিয়েও কাজ করেন কারণ পরিবারের ভাতের থালা তার কাঁধে। আমরা ছোট বেলা থেকে জেনে আসছি-‘এ জীবন নহে শুধু সুখ ভোগ তরে কঠিন কর্তব্য আছে মাথার উপরে।’ সুতরাং মানবজীবন গোলাপের পাপড়ি দিয়ে সাজানো বিছানা নয়। মানুষের জীবনে উত্থান পতন থাকবেই তাই ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবিলা করতেই হবে এবং ছেড়ে না দিয়ে লেগে থাকতে হবে। একদিন সব বাধা কেটে গিয়ে জীবন আলোকিত হবে। সুদিন ফিরে আসবে। মনে পোষণ করতে হবে সংগ্রামই জীবন। জীবন যুদ্ধে পরাজয়ের জন্য আমরা জন্ম নিই–নি, জয়ী হবার জন্য এসেছি সেটা যতই কণ্টকাকীর্ণ হোক। তাই গ্রীস দার্শনিক ‘সক্রেটিস’ বলে গেছেন অপরীক্ষিত জীবন বেঁচে থাকার যোগ্য নয়। তিনি বলেন, জীবনের প্রকৃত অর্থ খুঁজে পেতে হলে নিজের অস্তিত্ব, চিন্তা ও কর্মকে প্রশ্ন করতে হবে এবং সত্যের অনুসন্ধান করতে হবে। জার্মান দার্শনিক ফ্রেডরিক নিটশে বলে গেছেন জীবনের পূর্ব নির্ধারিত অর্থ নেই। প্রতিটি মানুষকে নিজের জীবনের অর্থ নিজেকেই সৃষ্টি করতে হবে, ব্রিটিশ দার্শনিক ‘টেরি ইগলটন’ বলেন জীবনের অর্থ এমনই কিছুই নয় যা বাইরের কোন উৎস থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয়। তার মতে ব্যক্তি যখন নিজেকে কেবল নিজস্ব সুখের জন্য সীমাবদ্ধ না রেখে অন্যের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করে তখন জীবনের প্রকৃত তাৎপর্য খুঁজে পায়। আমরা জীবনের অর্থ খুঁজতে দার্শনিক, চিন্তাবিদ, বিজ্ঞানী বা যুক্তিবাদদের কাছে যায়। সবার এক কথা আত্মোপলব্ধি। জীবনের চলার পথে আত্মোপলব্ধি। আত্মপ্রচেষ্টা করাটা বড় ব্যাপার, বিখ্যাত পদার্থ বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং মনে করেন দর্শন, আত্মজ্ঞান ও মূল্যবোধ ইহার উত্তর দিতে পারে। আবার ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে সৃষ্টিকর্তার আরাধনা, তার ইবাদত করা আল্লাহ/ঈশ্বরের মহিমা প্রচার করা, ন্যায়, অর্থ, কাম ও মোক্ষ অর্জন করা প্রভৃতি। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, ‘জীবে প্রেম করে যে জন সেজন সেবিছে ঈশ্বর’। ভিন্ন ভিন্ন মানুষের জীবনের অর্থ ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে যেমন কেই পরিবারকে ভালো রাখার চেষ্টা, কারো কাছে জ্ঞান চর্চা, কারো কাছে সৃষ্টিশীল কিছু করা, মানবতার কল্যাণে, সমাজ উন্নয়নে কাজ করা প্রভৃতি। অন্যদিকে বলা যায়, গণতন্ত্র, ন্যায় বিচার, অসাম্প্রদায়িকতা, জাতিকে কল্যাণমুখী করা, দ্বন্দ্বমুক্ত, ভ্রাতৃত্ববোধ, পর ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, গণতান্ত্রিক মানসিকতার প্রতি নিজেকে উদ্বুদ্ধ করা প্রভৃতি। স্রষ্টা জগৎ সৃষ্টি করে ছেড়ে দেন নি। তাদের জ্ঞান প্রদান করেছেন যাতে পৃথিবীটাকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে। বিবেকানন্দ এও বলেছেন মানুষ পশুত্ব, মানবতা এবং দেবত্বের মিশ্রণ। তিনি বলেছেন প্রকৃত শিক্ষা হলো সেটা –যেটা মানুষের জীবনে নিজের পায়ে দাঁড়াতে সক্ষম করে। মানুষের মাঝে কুপ্রবৃত্তি ও সুপ্রবৃত্তি দু’টাই আছে। এইগুলি পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের মধ্যে পড়ে। কুপ্রবৃত্তির তাড়নায় মানুষ ধ্বংস হয়ে যায়। আর সুপ্রবৃত্তির সুবাদে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। সুতরাং, কুপ্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। মানুষ পৃথিবীতে শুধু নিজ সুখ ভোগের জন্য জন্মায়নি। বর্তমান সমাজে কুপ্রবৃত্তির তাড়নায় এমন জঘন্য, অমানবিক, পৈশাচিক অপকর্ম সংঘটিত করে যা মানব সভ্যতাকে প্রতিনিয়ত কলঙ্কিত করছে।
আমাদের মতো স্বল্পোন্নত দেশে দারিদ্রতা অভিশাপ যার পেটে খিদা সে বুঝে খিদার জ্বালা কতটুক। জাতীয় কবি কাজী নজরুল দারিদ্র্যপীড়িত জীবন কাটিয়েছেন, দারিদ্র্যের কশাঘাত তাকে মহান করেছে। তাই বলেছেন ‘হে দারিদ্র্য তুমি মোরে করেছ মহান’। মানুষের ইতিহাস কেবল উন্নতির ধারা বিবরণী নহে–ইহা একই সঙ্গে আক্রোশ, প্রতিহিংসা ও ক্ষমতার দলিল। বৈষম্য বিরোধী সংগ্রামী নেতা মার্টিন লুথার কিং ভারতের মহাত্মাগান্ধীর ‘অহিংস নীতিতে ভীষণভাবে আকৃষ্ট হন। মানুষের জীবন এই আছে এই নাই– অথচ এই পৃথিবীতে যুদ্ধবিগ্রহ, ঔদ্ধত্য, দাম্ভিকতা, ক্ষমতার লড়াই। রাষ্ট্রীয় সম্পদের লুটপাট, দুর্নীতি, অর্থপাচার, অহরহ আইনের লঙ্ঘন কিছুই থামছে না। অথচ একজন লোকের দরকার শুধু সাড়ে তিনহাত মাটি। কুরআনে আছে–মৃত্যুর স্বাদ সকল লোককে পেতেই হবে তুমি যেখানেই থাকো না কেন।
গীতায় বলা আছে ‘জাতস্য হিধ্রুবো মৃত্যুধ্রুবং জন্ম মৃতস্য চ;’ অর্থাৎ যার জন্ম হয়েছে তার মৃত্যু নিশ্চিত। বাইবেল বলেছে ‘মানুষের জীবন কুয়াশার মতো যাহা অল্পক্ষণ দেখা যায়।’ আমেরিকার প্রয়াত ৩৯ তম প্রেসিডেন্ট যিনি ১০০ বছর বেঁচেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, শান্তি, মানবাধিকার ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। তিনি বর্ণ বৈষম্যের ঘোর বিরোধী ছিলেন। তাই ক্যাপিটাল ভবনে মার্টিন লুথার কিং এর ছবি স্থাপন করেছিলেন। এই বর্ণবৈষম্য তৎকালীন হিন্দু সমাজে প্রখর আকার ধারণ করে যা এখনও কিছু কিছু জায়গায় রয়ে গেছে।
জীবন স্রষ্টার অতিমূল্যবান উপহার, যার থেকে প্রতিদিন আমরা কিছুনা কিছু শিখি। জীবন সফলতায়, ব্যর্থতায় প্রতিযোগিতায় এবং সুখস্বাচ্ছন্দে পরিপূর্ণ। মনে পোষাণ করতে হবে জীবন সবসময় সহজ নয়। ঘাত প্রতিঘাত থাকবেই। কুসুমাস্তীর্ণ জীবন জীবনই নয়। অন্যকে ভালোবাসা, সাহায্য করা এবং পজিটিভ চিন্তাধারা জীবনকে অর্থবহ করে তোলে। তার সাথে সময়ের মূল্য দারুণভাবে বুঝতে হবে। কর্মমুখর, সৎ, সংযমী জীবন যাপন এবং নির্লোভ প্রত্যাশা মানুষের জীবনকে গড়ে তোলে সুন্দর ও গৌরবান্বিত।
লেখক : প্রাক্তন চিফ অ্যানাসথেসিওলজিস্ট,
বাংলাদেশ রেলওয়ে হাসপাতাল, চট্টগ্রাম।














