
সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক আকাশ আহমেদের কিশোর উপন্যাস ‘একলা মেয়ের মেঘলা দুপুর’ এবার চট্টগ্রাম একাডেমি প্রবর্তিত অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ শিশুসাহিত্য পুরস্কার’ ২০২৫ অর্জন করেছে। বইটি কেবল একটি ছিন্নমূল কিশোরীর গল্প নয়, বরং এটি আমাদের সমাজের রূঢ় বাস্তবতা, দারিদ্র্যের কষাঘাত এবং দিনশেষে এক পশলা বৃষ্টির মতো স্নিগ্ধ এক মানবিক সম্পর্কের দলিল।
উপন্যাসের শুরুতেই আমরা দেখি উপজেলা সদরের ইছাখালী সেগুন বাগানের এক চিলতে ঝুপড়ি ঘরে আলতা ও কুমকুমের জীবন–সংগ্রাম। প্লাস্টিকের বস্তার বেড়া আর ফুটো টিনের চাল দিয়ে চুইয়ে পড়া বৃষ্টির পানি’– এ যেন আমাদের চারপাশের গৃহহীন মানুষের চিরচেনা প্রতিচ্ছবি। রোয়াজারহাটে ব্রীজ নির্মাণের ফলে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় উন্নয়নের আড়ালে ঢাকা পড়ে যাওয়া সেইসব মানুষের কথা, যাদের মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও অনিশ্চিত। আলতার চরিত্রটি এখানে অনন্য; সে দারিদ্র্যের কষাঘাতে পিষ্ট হলেও ভিক্ষাবৃত্তিকে ঘৃণা করে। তার কদম ফুল বিক্রি করার চেষ্টা কেবল জীবিকা নয়, বরং এক প্রকার আত্মমর্যাদার লড়াই।
কাহিনির মোড় ঘুরে যখন ক্ষুধার জ্বালায় ও শারীরিক দুর্বলতায় আলতা শহরের রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে। এখানেই প্রবেশ ঘটে রেহনুমা শারমিন ও রায়হান দম্পতির। আধুনিক যান্ত্রিক জীবনে যখন মানুষের প্রতি মানুষের বিশ্বাস ও মমতা কমে আসছে, তখন এই দম্পতি আলতাকে পরম মমতায় আগলে নিয়ে আমাদের শেখায় মানবিকতা আজও মরে যায়নি। রক্তের সম্পর্কের বাইরেও যে আত্মার আত্মীয় হওয়া যায়, তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এই পরিবারটি।
কাহিনির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো আলতার আত্মত্যাগ। নিজের সুন্দর জীবনের হাতছানি উপেক্ষা করে সে তার ছোট বোন কুমকুমের ভবিষ্যতের কথা ভেবেছে। ‘কুমকুম আমাদের স্বপ্নের ফেরিওয়ালা হয়ে ফিরে আসবে’। আলতার এই একটি বাক্যই পুরো কাহিনির মূল সুর বেঁধে দেয়। এটি কেবল একটি বড় বোনের ত্যাগ নয়, বরং একটি সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণির শিক্ষার প্রতি গভীর আকুতি।
বারো বছর পরের প্রেক্ষাপটে গল্পের সমাপ্তিটি পাঠককে এক ধরণের প্রশান্তি দেয়। কুমকুমের এসএসসি পরীক্ষায় ‘গোল্ডেন এ–প্লাস’ পাওয়া কেবল একটি ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, এটি আলতার ত্যাগের ফসল এবং রায়হান দম্পতির মানবিকতার জয়। গল্পের শেষ দৃশ্যে জোছনা রাতে আলতার সেই বোধ– আকাশ থেকে পরি নেমে আসার রূপকটি অত্যন্ত চমৎকার। সেই পরিটি আর কেউ নয়, স্বয়ং কুমকুম; যে শিক্ষার আলোয় নিজের ও পরিবারের অন্ধকার দূর করেছে।
আশির দশক থেকে সাংবাদিকতা ও সাহিত্যের আঙিনায় বিচরণ করা আকাশ আহমেদ তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ছাপ রেখেছেন এই কাহিনিতে। তাঁর লেখনীতে কর্ণফুলীর তীরের হিজল গাছ, সেগুন বাগানের বৃষ্টির শব্দ আর গ্রামীণ মেঠো পথ জীবন্ত হয়ে উঠেছে। ২০২৫ সালের বইমেলায় তাঁর নতুন ছড়ার বই ‘ব্যাঙের মাথায় ব্যাঙের ছাতা’ প্রকাশের পর এই উপন্যাসটি নিয়ে আলোচনা পুনরায় প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
পরিশেষে বলা যায়, ‘একলা মেয়ের মেঘলা দুপুর’ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, সুযোগ পেলে প্রতিটি ‘মেঘলা জীবনই এক একটি উজ্জ্বল পরিতে’ রূপান্তর হতে পারে। দারিদ্র্য বিমোচন কেবল সরকারি অনুদানে নয়, বরং ব্যক্তিগত পর্যায়ের মানবিক বোধ এবং শিক্ষার প্রসারের মাধ্যমেই সম্ভব। আকাশ আহমেদ এই চিরন্তন সত্যটিই অত্যন্ত সহজ–সরল ও প্রাঞ্জল ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন। ৪৮ পৃষ্ঠার ক্রাউন সাইজের বইটির দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদ ও পাতায় পাতায় চাররঙা জীবন্ত সব ছবি এঁকেছেন চিত্রশিল্পী নিসা মাহ্জাবীন। বইটি প্রকাশ করেছে ঢাকার বাবুই প্রকাশ। মূল্য তিনশ’ টাকা।
লেখক : সাংবাদিক, রাঙ্গুনিয়া প্রতিনিধি, দৈনিক আজাদী।












