‘বিদ্যালয়’ শব্দটি শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক পরিচিত দৃশ্য: সারিবদ্ধ বেঞ্চ, ঘণ্টাধ্বনি, ইউনিফর্ম, নির্দিষ্ট পাঠ্যসূচি, পরীক্ষার খাতা, আর ‘ভালো ছাত্র‘ হওয়ার এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতা।
কিন্তু এই পরিচিত কাঠামোর ভেতরেই একটি মৌলিক প্রশ্ন বহুদিন ধরে নিঃশব্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে– কেন বিদ্যালয়গুলো প্রায়ই শিশুদের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে না? কেন অনেক শিশু বিদ্যালয়ে গিয়ে নিজের স্বাভাবিক কৌতূহল, সৃজনশীলতা কিম্বা স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে ফেলে? কেন বিদ্যালয় নামের প্রতিষ্ঠানটি অনেক সময় শিশুকে বোঝার বদলে তাকে ‘মানানসই’ করে তোলার চেষ্টা করে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ইতিহাস, মনোবিজ্ঞান, সমাজতত্ত্ব এবং আধুনিক গবেষণার দিকে তাকাতে হয়।
প্রথমত, অধিকাংশ আধুনিক বিদ্যালয়ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল শিল্পবিপ্লব–পরবর্তী সমাজের প্রয়োজন অনুযায়ী। তখন প্রয়োজন ছিল এমন শ্রমশক্তি, যারা সময় মেনে কাজ করবে, নির্দেশ পালন করবে, একই ধরনের দক্ষতা অর্জন করবে। ফলে বিদ্যালয়ও হয়ে উঠল অনেকটা কারখানার মতো– একই বয়সের শিশুদের একই ঘরে বসিয়ে একই পাঠ একই গতিতে শেখানো। কিন্তু মানুষ তো যন্ত্র নয়। প্রতিটি শিশুর শেখার ধরন, মানসিক গতি, আবেগীয় প্রয়োজন, পারিবারিক বাস্তবতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক প্রবণতা ভিন্ন।
তবু বিদ্যালয়গুলো প্রায়ই ধরে নেয়, একই পদ্ধতি সবার জন্য যথেষ্ট। শিক্ষাবিদ ঔড়যহ উববিু বহু আগেই বলেছিলেন, শিক্ষা যদি জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে সংযুক্ত না হয়, তবে তা শিশুর স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। পরবর্তীতে ঐড়ধিৎফ এধৎফহবৎ তাঁর সঁষঃরঢ়ষব রহঃবষষরমবহপবং ধারণায় দেখান, মানুষের বুদ্ধিমত্তা কেবল ভাষা বা গণিতে সীমাবদ্ধ নয়; সংগীত, শরীরচর্চা, সামাজিক সম্পর্ক, প্রকৃতি বোঝা– এসবও বুদ্ধিমত্তার অংশ। অথচ অধিকাংশ বিদ্যালয় এখনও খুব সীমিত কিছু দক্ষতাকেই মেধা হিসেবে মূল্যায়ন করে। এর ফলে যে শিশুটি হয়তো চমৎকার গল্প বলতে পারে, ছবি আঁকতে পারে, গাছপালা বুঝতে পারে কিংবা মানুষের আবেগ বুঝতে পারে– সে পরীক্ষার নম্বরের দুনিয়ায় দুর্বল ছাত্র হিসেবে চিহ্নিত হয়। ধীরে ধীরে সে নিজের সক্ষমতা নিয়েই সন্দিহান হয়ে পড়ে। মনোবিজ্ঞানে একে ‘ষধনবষরহম বভভবপঃ’ বলা হয়, অর্থাৎ একটি সামাজিক পরিচয় বারবার চাপিয়ে দিলে ব্যক্তি নিজেকেও সেভাবেই দেখতে শুরু করে।
বিদ্যালয়গুলোর আরেকটি বড় সংকট হলো, তারা প্রায়ই শিশুদের আবেগীয় বাস্তবতাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয় না। আধুনিক গবেষণা বলছে, শেখার ক্ষমতা কেবল ওছ–এর ওপর নির্ভর করে না; নিরাপত্তাবোধ, মানসিক চাপ, পারিবারিক পরিবেশ, শিক্ষক–শিক্ষার্থীর সম্পর্ক– এসবও গভীরভাবে প্রভাব ফেলে। যে শিশু ঘরে সহিংসতা, দারিদ্র্য, পারিবারিক অস্থিরতা বা সামাজিক অবহেলার মধ্যে বড় হচ্ছে, তার পক্ষে শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। কিন্তু বিদ্যালয় অনেক সময় আচরণকে অবাধ্যতা হিসেবে দেখে, তার পেছনের মানবিক বাস্তবতাকে নয়।
এখানেই শিক্ষা ব্যবস্থার একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব দেখা যায়: বিদ্যালয় প্রায়ই শৃঙ্খলাকে (ফরংপরঢ়ষরহব) অগ্রাধিকার দেয়, কিন্তু শিশু চায় বোঝাপড়া (পড়সঢ়ৎবযবহংরড়হ)। বিদ্যালয় চায় পূর্বনির্ধারিত কাঠামো, শিশু চায় অনুসন্ধান। বিদ্যালয় চায় মানদণ্ড, শিশু চায় স্বাতন্ত্র্য। এই সংঘাত যত বাড়ে, শিশুর সঙ্গে বিদ্যালয়ের দূরত্বও তত বাড়ে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মূল্যায়ন পদ্ধতি। পরীক্ষাভিত্তিক শিক্ষা প্রায়ই শেখাকে জ্ঞানার্জনের পরিবর্তে পারফরম্যান্স– এ পরিণত করে। শিশুরা তখন প্রশ্ন করতে শেখে না; বরং সঠিক উত্তর মুখস্থ করতে শেখে। ফলে কৌতূহল, যা শিশুমনের সবচেয়ে প্রাকৃতিক শক্তি, ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ছোট শিশুদের স্বতঃস্ফূর্ত প্রশ্ন করার প্রবণতা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যালয়কেন্দ্রিক চাপের কারণে কমে যেতে পারে।
ডিজিটাল যুগও বিদ্যালয়কে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। আজকের শিশুরা তথ্যের ভেতর বড় হচ্ছে। তারা ইন্টারঅ্যাকটিভ, দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল, বহুমাত্রিক শেখার পরিবেশে অভ্যস্ত। কিন্তু অনেক বিদ্যালয় এখনও একমুখী বক্তৃতাভিত্তিক শিক্ষাপদ্ধতিতে আটকে আছে। ফলে বিদ্যালয়ের বাস্তবতা এবং শিশুর দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার মধ্যে ফাঁক তৈরি হয়। তবে সমস্যাটি কেবল বিদ্যালয়ের অদক্ষতা নয়; এটি অনেকাংশে সামাজিক প্রত্যাশার সংকটও। অভিভাবক, রাষ্ট্র, চাকরির বাজার– সবই বিদ্যালয়ের ওপর ভিন্ন ভিন্ন চাপ সৃষ্টি করে। বিদ্যালয় তখন মানুষ গড়ার চেয়ে ‘প্রতিযোগিতামূলক উৎপাদন’ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। নম্বর, এচঅ, ভর্তি পরীক্ষা– এসবের চাপে শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য, সৃজনশীলতা এবং সামাজিক দক্ষতা প্রায়ই উপেক্ষিত হয়।
কিন্তু আশার জায়গাও আছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এখন পযরষফ–পবহঃবৎবফ বফঁপধঃরড়হ, ংড়পরধষ–বসড়ঃরড়হধষ ষবধৎহরহম, রহপষঁংরাব বফঁপধঃরড়হ, বীঢ়বৎরবহঃরধষ ষবধৎহরহম ইত্যাদি ধারণা গুরুত্ব পাচ্ছে। এসব পদ্ধতি বলছে– শিশুকে বিদ্যালয়ের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর বদলে বিদ্যালয়কেই শিশুর বৈচিত্র্যের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। কারণ শিক্ষা কেবল তথ্য স্থানান্তর নয়; এটি মানুষকে মানুষ হিসেবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া।
একটি সত্য এখানে গভীরভাবে মনে রাখা প্রয়োজন: সব শিশু একই ফুল নয়, তাই তাদের একই ঋতুতে ফোটারও কথা নয়। কেউ দ্রুত শেখে, কেউ ধীরে; কেউ শব্দে চিন্তা করে, কেউ ছবিতে; কেউ নিঃশব্দ, কেউ প্রবল কৌতূহলী। বিদ্যালয় যদি এই বৈচিত্র্যকে সমস্যা হিসেবে দেখে, তবে শিশু হারিয়ে যায়। কিন্তু যদি বিদ্যালয় এই বৈচিত্র্যকে মানবিক সম্ভাবনা হিসেবে দেখতে শেখে, তবে শিক্ষা সত্যিই মুক্তির পথ হয়ে উঠতে পারে।
অতএব, বিদ্যালয়গুলোর শিশুদের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হিমশিম খাওয়ার কারণ কেবল শিক্ষকদের সীমাবদ্ধতা নয়; বরং একটি পুরোনো কাঠামো, মানকীকরণের সংস্কৃতি, পরীক্ষাকেন্দ্রিকতা, সামাজিক চাপ এবং শিশুমনের জটিলতাকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়ার সম্মিলিত ফল। শিক্ষা তখনই মানবিক হবে, যখন বিদ্যালয় শিশুকে ‘গড়তে’ নয়, বরং ‘বুঝতে’ শিখবে।
লেখক: প্রফেসর, বনবিদ্যা ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।












