‘স্যার ওয়ান ডক্টর আস্কিং ফর টু ইকোনমি ক্লাস টিকিট অফ ইজিপ্ট এয়ারলাইন্স টু লন্ডন ফর হিম অ্যান্ড হিস ওয়াইফ, ইন্সটিড অফ ওয়ান বিজনেস ক্লাস টিকিট অফ এমিরেটস টু। প্লিজ অ্যাপ্রুভ।’
ইটস এ বিগ বিগ নো, অফকোর্স!
‘মোর দেন টেন সেইম রিক্যুয়েস্ট কেইম ফ্রম সেলস পিপল। নাউ ডক্টর কলড ডাইরেক্টলি! আই এম ইন বিগ প্রব্লেম স্যার।’ হু এভার আস্কস, ডাজ নট ম্যাটার। রুলস ইস রুলস। আই উইল স্যুট এ মেইল নাউ, এবাউট দিস টু এভ্রিওয়ান।
‘থ্যাংকু স্যার! ইট উইল বি গ্রেট হেল্প।’
মাসজুড়ে এতোই বেশী বিমান টিকিট লাগে আমাদের যে, ট্রাভেল এজেন্সির এক কর্মীকে আমাদের অফিসেরই এক জায়গায় বসিয়ে দিয়েছে একটা কম্পিউটারসহ তারা। তাতে আমাদের সুবিধা হলেও, সেই এজেন্সির ভারতীয় এই কর্মীটি আছে মহা ঝামেলায়! হাতের কাছে তাকে পাওয়া যায় বলে, প্রায়শই যে সে হাবুডুবু খায় নানানজনের অদ্ভুত সব আবদারের তোড়ে, পেয়েছি টের আগেই। এখন তো সেটি সেখছি প্রলম্বিত হয়েছে অফিসের বাইরেও! তাও এমন আব্দার, যা কি না নিয়ম বিরোধী। ফোন রেখে মেইল লিখতে লিখতে ভাবছি, শেষ পর্যন্ত প্রোডাক্ট ম্যানেজার সাদেক খাপাগার কথাই ঠিক হলো। সেলস ম্যানেজার খলিলের আহ্বানে সেদিন তার টিম মীটিঙয়ে গিয়ে, তাদের জোরালো দাবীর মুখে লন্ডন সেমিনারগামী ডাক্তারদের জন্য, এমিরেটস টিকিট বরাদ্দ করার কথা দিয়ে, অফিসে ফিরেই ডেকেছিলাম সাদেককে।
আমার কথা শুনে স্বভাবগতভাবে কিছুক্ষণ থ মেরে থেকে, হাত কচলাতে কচলাতে খাপাগা মিন মিন করে চিবিয়ে চিবিয়ে বলেছিল যা, তা হল– ‘ড. সেলিম সেলসের ওরা যাই বলুক না কেন, আমার অভিজ্ঞতা বলে, সবাই কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইজিপ্ট এয়ারেই যাবে। এতে এই সুযোগে মুফতে নিজের বাড়িতে ঢু মারতে পারে মিশরি ডাক্তাররা। অমিশরিরা পায় পিরামিড দেখার সুযোগ। এখন যদি আমি আগের এপ্রুভাল বদলে এমিরেটসের টিকিট করাই বেহুদা ডাবল খাটবো!’
সাদেকের অভিজ্ঞতার বয়ানতো উপেক্ষা করা যায় না। আছে যুক্তিও এতে। রথ দেখতে গিয়ে কলা বেচার চান্স যে খুঁজে সবদেশের সবমানুষই, বুঝতে পারছি তাও। কিন্তু বিষয়টা তো হল অফিস পলিটিক্সের। পলিটিক্স, তা দেশেরই কিম্বা হোক অফিসেরই, শেষ কথা বলে তো তাতে নাকি কিছু নাই। বলেছিলাম তাই, শোন মানছি এবং বুঝেছিও কথা তোমার। তারপরও যা বলছি করো। দেখা যাক না, কী হয়? বেহুদাই কেঁচেগণ্ডূষ করার ঝামেলা এড়ানোর জন্য, মরিয়া সাদেক ফেলেছিল টেবিলে তখন, কষ্ট কন্ট্রোলের ট্রাম্পকার্ড। নিকট অতীতের এখানকারই এক অভিজ্ঞতার আলোকেই বলেছিলাম, করবে ওটা তুমি লাস্ট মিনিট নো শো রদ করে।
উদাহরণসহ বলেছিলাম কিছুদিন আগে বার্সেলোনা সেমিনারে যে ৪০ জন ডাক্তারের যাওয়ার কথা ছিল, তার মধ্যে তো ১৭ নাকি ১৮ জন ডাক্তার এয়ারপোর্টেই আসেননি শেষ মুহূর্তে। এরকম আচানক অভিজ্ঞতাও তো হয়েছে এখানেই প্রথম, আমার! তুমুল অনিচ্ছাসত্ত্বেও অবশেষে তাই যা বলেছি সে মোতাবেক দাপ্তরিক কর্মাদি সম্পন্ন করতে হয়েছিল সাদেককে। এখন আমার এই চিঠি পাওয়ার পরপরই, নিশ্চিত ছুটে আসবে সে। চোখে আঙুল দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করবে কত বেকুব এ অধম! সাথে অবশ্যই করবে সেলসের লোকজনদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার!
নাহ, মোটেও ভাবিত নই ঐসব নিয়ে। চিন্তার বিষয় অন্য। তা হল, এক বিজনেস ক্লাসের টিকিটের বদলে ইকনোমির দুই টিকিট নেয়ার ধান্দাটি। এতে কষ্ট বা খরচ মোটেও বিষয় নয়। গুরুতর সমস্যা হল কমপ্লায়েন্সের।
ইনভেটিভ কোম্পানি হিসেবে নতুন বৈজ্ঞানিক ধারনা প্রতিষ্ঠিত করার উপরেই তুমুলভাবে নির্ভরশীল আমাদের বিপণনের সফলতা। ফলে ডাক্তারদের জন্য প্রায়শই কোম্পানি আয়োজন করে থাকে নানান মাপের, ধাঁচের বৈজ্ঞানিক সেমিনার, সিম্পোজিয়া। কিন্তু ওসবে পদাধিকারবলে ডাক্তারদের স্ত্রীদের কোন প্রবেশাধিকার নেই, যদি না তাঁরা নিজেরাও একই বিষয়ের বিশেষজ্ঞ না হন! এই প্রথম চোখে পড়লো এখানকার এই রোগ। কাগজেকলমে অনুমতি নেয়া হচ্ছে শুধুই ডাক্তারের। টিকিট ইস্যু হয়ে যাওয়ার পর, চুপেচাপে বিজনেস ক্লাসের এক টিকিট বদলে পাওয়া দুই ইকোনমি টিকিটের বরাতে ডাক্তার সাহেব যদি স্ত্রী বা বান্ধবী নিয়ে যান, তবে তো বিরাট সমস্যা! যখনই তা ধরা পড়বে, ঐ ডাক্তার সাহেবের তো কিছু হবে না। দাপ্তরিক আইন তো তাদের জন্য না।
সে আইনের শাস্তির খাড়া, কোম্পানির ভেতরে নানান দিকে ঘুরতে ঘুরতে শেষ পর্যন্ত পড়বে গিয়ে যে কার ঘাড়ে, নাই তার ঠিক ঠিকানা! অপছন্দের কাউকে নির্ঝঞ্ঝাটে নিকেশ করার জন্য এইসব বহুজাতিক কোম্পানির কমপ্লায়ন্সে খাড়া, অত্যন্ত কার্যকর। তদপুরি আইনের রাজনীতি বড়ই উপাদেয়। আবার আইনতো নাকি অন্ধও!
হায়রে এই পবিত্রভূমিতে এরকম আরো কত যে জ্ঞান বৃদ্ধির অবকাশ রয়ে গেছে, তা তো এখনো ঠাহর করতে পারছি না। ছোট ব্যবসার দেশ, বাংলাদেশ। ওখানে তো কাউকে বিজনেস ক্লাসে পাঠানোর মতো জমিদারি করার অবকাশ ছিল না। অতএব ঘুণাক্ষরেও ভাবিনি, হতে পারে এমন কিছু।
ফারাওদের পতনের সাথে সাথেই ভেবেছিলাম নিভে গিয়েছিল বুঝি মিশরের উদ্ভাবনিক্ষমতা। সেই দেশের ডাক্তাররা এখন ভাঙ্গলো আমার সেই ভুল। বিজনেস ক্লাস ইকোনমি ক্লাসের এই ভেল্কিতে কি চমৎকার, একের ভিতরে পয়দা করছে তারা দুই! দাপ্তরিক নিয়মে যার একটি হালাল হলেও অন্যটি অবশ্যই হারাম! অর্থাৎ দৃশ্যমান হালাল প্যাকেটে হচ্ছে পাচার হারাম মাল! নাহ, এ উদ্ভাবনের একক কৃতিত্ব শুধু ডাক্তারদের নয়। অবশ্যই এটি জয়েন্ট ভেঞ্চার। ভেতরের সহযোগিতা না পেলে, বাইরের কারো পক্ষে তো এরকম কিছু করা সম্ভব না। সন্দেহের তির ছুটল সেলস টিমের দিকে তাই। তবে অচিরেই মনে হল, না, আমার টিমও ধোয়া তুলসি পাতা না। যতোই খাপাগা টিকিট বদলানোর ব্যাপারে আপত্তি করুক না কেন, আদতে সে কিন্তু কাশেনি ঝেড়ে।
সামান্য কথা ঠোঁটে এনে বেশীর ভাগ পেটে রেখে চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলা লোকদের নিয়ে থাকি আমি তুমুল অস্বস্তিতে। তাদের কথার অর্থের কূল কিনারা করতে গিয়ে ভাবি, মহামতি সিগ্মুন্ড ফ্রয়েড সাহেবও নিশ্চিত খাবি খেতেন এদের হাটুজল মার্কা কথার কুয়ায়। জোর সন্দেহ আরো, এ নিশ্চয় কোন আকস্মিক ব্যাপার নয়। অনেকদিন ধরেই চলছে এটি ঢাক ঢাক গুড় গুড় করে এখানে। ইংরেজির ওপেন সিক্রেট আর কী!
প্রচলিত যে কোন বিশ্বাস বা প্র্যাকটিসের বিপরীতে নতুন কিছু করতে গেলে, হোক তা যতই ভাল, মওকা পেয়ে আস্তিন গোটায় তখন নিউটন সাহেবের তৃতীয় সূত্র। অতএব শুরুতেই যে ছোট্ট মেইলটি লিখেছিলাম, এরই মধ্যে বারকয়েক সেটির নানান শব্দ বদলে, বাক্যের গঠন পাল্টে, মোটামুটি নিরীহ গোছের মনে হতেই ডিজিটাল কবুতরের পায়ে বেঁধে দিয়েছি সেটিকে উড়িয়ে।
তারপর থেকেই কেমন যেন চাপ চাপ অনুভূতি হচ্ছে মাথায়। কোনদিক থেকে, কখন, কোনরূপে, কী ধরনের বিপরীত প্রতিক্রিয়া যে হয় আগামী দিনগুলোতে, বুঝতে পারছি না। দেশের ধানমণ্ডি লেকপাড়ের অফিসে এমন অবস্থায় পড়লে, সাথে সাথেই যেতাম চলে লেকপাড়ের ইউনুসের দোকানে। তারপর একসলা সিগারেট ধরিয়ে ইউনুসের ভালমন্দ খোঁজ নিতে নিতে, এলাকার হাল হকিকত থেকে শুরু করে দেশ বিদেশের নানান জটিল রাজনৈতিক বিষয়ে করতাম মত বিনিময়। সেই সুযোগতো নাই এ মরুতে। তবে সিগারেট তো আছেই।
আহ, প্যাকেটতো দেখছি ফাঁকা! দেশের মতো এখানে তো হাত বাড়ালেই পাওয়া যায় না সিগারেটের টং। ঝকঝকে ধারালো তলোয়ারের মতো মধ্যযামের রোদ থেকে গা বাঁচিয়ে যেতে হবে এখন হেঁটে তিনব্লক দূরে। এ এলাকায় কাছাকাছি বলতে ওখানকার ছোট্ট ঐ ডিপার্টমেন্টাল স্টোরেই মেলে সিগারেট।
সমস্যা হচ্ছে ওখানে গেলেই যে আমার কাঙ্ক্ষিত বেন্সন এন্ড হেজেস পাবো এমন নিশ্চয়তা নাই। অন্য সবকিছুর মতো সিগারেটের ধোঁয়াতে সৌদিরা আম্রিকা ভক্তই। জয়জয়কার ফিলিপ মরিসের এখানে। দেশে থাকতে যে আমি নিজঘরেই নিজ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নিমিত্তে বাইরে গিয়ে এক সলা সিগারেট কিনে খেতাম, সেই আমিই ইদানীং কিনছি, কার্টন ধরে সিগারেট!
শুরুতে এখানকার নানানজনের কার্টনে কার্টনে সিগারেট কেনা দেখে ভেবেছিলাম, এ কোন আচানক ব্যাপার! এরা কী সবাই সকালে ঘুম থেকে উঠে একবারই মুখাগ্নি করে নাকি? তারপর দিনের বাকী সময় ঐ আগুনেই একের পর এক সিগারেট জ্বালায় নাকি? এমনই চেইন স্মোকার নাকি সব এরা।
অচিরেই ভেঙ্গেছে সে ভুল। দেখলাম তুমুল জনপ্রিয় মার্লবোরোও মেলে না সবসময় হাতের কাছের দোকানে। আর চামড়া ফালা ফালা করা রোদে ঘুরে নানান দোকান খোঁজার ঝুঁকি নেবার তো মানে নাই। অতএব যখন মেলেই কাঙ্ক্ষিত ব্র্যান্ড কিনে ফেলে এরা তা খুচরাদরে পাইকারি লটে। হালে এই বাংগালেরও হয়েছে সেই ঘোড়ারোগ!
নাহ নিরাশ হতে হয়নি। এক কার্টুন সিগারেট কিনে দোকান থেকে বেরুতে বেরুতে মনে হল অনেকদিন হল আমার মেন্টর অ্যালেক্সের সাথে যোগাযোগ নাই। অফিসে ঢুকেই করবো মেইল তাকে। একটা টেলি কনফারেন্স করতে হবে। বেশ কিছু ব্যাপারে তার মতামত শোনা দরকার। কমবে চাপ তাতে।উপরি পাওয়া যাবে কোম্পানির হেডকোয়ার্টার সহ এশিয়া পাসিফিক অঞ্চলের নানান খোঁজ খবরও।
তাইওয়ানের এক অবসরপ্রাপ্ত জেনারেলের পুত্র অ্যালেক্স চ্যাং হলেন আমাদের কোম্পানির তাইওয়ানের কান্ট্রি হেড। বছর তিনেক আগে, এক বছরের জন্য তাঁকে আমার মেন্টর হিসেবে নির্বাচিত করেছিল কোম্পানি। সেই বছর প্রতিমাসে এক ঘণ্টার টেলি কনফারেন্সে নানান বিষয়ে কথা বলে তাঁর উপদেশ পরামর্শ নিতাম। খুব জমে ছিল আমাদের সেই মেন্টরিং সেশন । তফলে অফিসিয়ালি আমাদের সেই সম্পর্ক শেষ হয়ে যাওয়ার পরও, দুজনেই তা চালিয়ে যাবার ব্যাপারে একমত হয়েছিলাম। সে মোতাবেক গত বছর যখন সিঙ্গাপুরে ছিলাম, তখনও চালু ছিল সেই মেন্টরিং সেশন।
আমারই সুবিধা হয়েছিল তাতে। সিঙ্গাপুর অফিসে সাংষ্কৃতিক কারনে চায়নিজ সহকর্মীদের যা কিছুই অবোধ্য মনে হতো, সে ব্যাপারে অ্যালেক্সের কাছে পেতাম দিশা। সৌদি এই এসাইনমেন্টে আসার আগে এ ব্যাপারেও কথা হয়েছিল তাঁর সাথে সেই ফেব্রুয়ারিতে। তুমুল উৎসাহ দিয়েছিলেন এই এসাইনমেন্টের ব্যাপারে। কথা হয়নি তারপর আর।
এখানে বস ফিলে রাশের সাথে চমৎকার বোঝাপড়া থাকলেও, সবকিছুতো সব সময় বলা যায় না বসকে। আবার বসও অবশ্যই অনেক সময় আমার কোন সিদ্ধান্ত পছন্দ না হলেও, সম্পর্কের খাতিরে হয়তো চুপচাপ হজম করেন। এমতাবস্থায় অ্যালেক্সের মতো তৃতীয় একজন, আছেন যিনি বসের চেয়ারে কিন্তু সরাসরি তিনি আমার বস না তার মতামত পেলে, চাপ কমে। তৃতীয় নয়ন যা দেখতে পায়, তা তো সবার দুই নয়নের দর্শন সীমার বাইরেই থাকে।
‘সালামালাইকুম ড. সেলিম। হাউ আর ইউ? এভ্রথিং ফাইন?’
ওয়া আলাইকুম আসসালাম আনাস ! হাও আর ইউ? এভ্রথিং ফাইন? হোয়াট ক্যান আই ডু ফর ইউ? বলতে বলতে বাড়িয়ে দিলাম হাত শেক হ্যান্ড করতে করতে ‘শুকরান জাজিলান; থ্যাংকু। অল ওকে। ইউ টোল্ড ইউ ওয়ান্ট টু ওয়ার্ক উইথ মি ওয়ান ডে, হোয়েন? আই নিড টু গো নাও। মা আস সালামা’ বলেই দৌড়াল আনাস তার তেজী আরবি ঘোড়ার মতো ছোটার প্রস্তুতি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লাল জিপটির দিকে
সারাক্ষণ হাসি মুখের অত্যন্ত সুপুরষ ও সপ্রতিভ জর্ডানি তরুণ আনাস, রিয়াদের হৃদরোগ বিষয়ক সেলস টিমের সদস্য। মাসকয়েক আগের এক দুপুরে, এখনকার মতোই টানছিলাম যখন সিগারেট অফিসের শেইডের নীচে, আগ বাড়িয়ে এসে পরিচিত হয়েছিল। সেই থেকে যখনই পাই দেখা অফিসের বাইরে, কথা বলি ডেকে।
লেখক : ভ্রমণ সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক।












