দূরের টানে বাহির পানে

হাসান আকবর | বুধবার , ১৪ অক্টোবর, ২০২৬ at ৮:২৯ পূর্বাহ্ণ

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

স্টার ফেরিতে চড়ে আমরা কূলে ফিরে আসলাম। পেছনে ভিক্টোরিয়া হারবার, ওপারে অপার সৌন্দর্য। সবকিছু পেছনে ফেলে আমি টিপু ভাই এবং ইয়াসের সাথে সেন্ট্রাল স্টেশনের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। কী দারুণ একটি দিন কাটালাম! মনের ভিতরটি কেমন ফুরফুর করছিলো। আসলেই আগেও স্টার ফেরিতে চড়েছিলাম, আমার বন্ধু স্বপন নিয়ে গিয়েছিল। তবে আগেরবারের চেয়ে এবার যেনো বেশি সুন্দর লেগেছে, সবকিছু।

মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমরা স্টেশনে পৌঁছে গেলাম। আমরা একই ট্রেনে উঠলেও মাঝে ভাগ হয়ে যাবো, টিপু ভাই মাঝপথে নেমে নিজের বাসায় চলে যাবেন, আমি বন্ধুপুত্র ইয়াসকে নিয়ে বন্ধুর বাসায় ফিরবো।

টিপু ভাই বললেন, দুই মিনিটের মধ্যেই ট্রেন আসবে। আমার বুকের ভিতরটা আবারো চিনচিন করে উঠলো। তারা সময় ধরে সব বলে দিতে পারে। বলে দিতে পারে যে, কখন ট্রেন আসবে, আর কতক্ষণে গন্তব্যে পৌঁছাবে। অথচ আমাদের..।

যাক, দুই মিনিটের মধ্যেই ট্রেন এসে স্টেশনে দাঁড়ালো। প্রচুর লোকজন, প্রচুর যাত্রী। অনেকেই নেমে পড়লেন, অনেকেই নতুন করে উঠলেন। আমরাও একটি বগিতে উঠে পড়লাম। সিট ফাঁকা নেই, দাঁড়িয়ে যেতে হবে। টিপু ভাই বললেন, সামনের দুই–তিন স্টেশনের পর বসতে পারবেন।

বসা নিয়ে আমার কোন মাথাব্যাথা ছিল না। এতো সন্দুর এবং পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ট্রেনে হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়িয়ে দুলতে দুলতে যাত্রা করার আলাদা মজা আছে। আমরা তিনজন প্রায় একইসাথে গা লাগালাগি করে দাঁড়ালাম। ট্রেন ছেড়ে দিল। আগেও খেয়াল করেছি, এখনো খেয়াল করলাম যে, ট্রেনের যাত্রীরা অসম্ভব নীরব। বগিতে কোন আওয়াজ নেই বললেই চলে। যে যার মতো বসে বা দাঁড়িয়ে আছেন। বসা যাত্রীদের অধিকাংশই বই পড়ছেন। হংকংয়ে এখনো পড়ার অভ্যাস রয়ে গেছে দেখে ভালো লাগলো।

তৃতীয় স্টেশনে টিপু ভাই নেমে গেলেন, নেমে গেলেন আরো অনেক যাত্রী। আমি এবং ইয়াস জানালার পাশেই সিট পেয়ে গেলাম। টিপু ভাই নামার আগে আমার থেকে আগামীকালের প্রোগ্রাম জানতে চাইলেন। নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারলাম না। কারণ আমার বন্ধু খাইরুল ইসলাম নিজামী স্বপন আজ দিনভর অসংখ্যবার ফোন দিয়েছে। সে আমাকে নিয়ে কোথায় কোথায় নাকি ঘুরবে! কী কী নাকি খাওয়াবে!

কালকের দিনটি তার জন্য রেখে দেবো বলে মনস্থির করেছি। তাছাড়া আমার ফেরারও সময় হয়ে যাচ্ছে। দেশে ফিরতে হবে। হংকং থেকে যেতে পারলে মন্দ হতো না, কিন্তু বিদেশে গিয়ে থেকে যাওয়া আমার দ্বারা কোনদিন হয়নি, হবেও না।

আমাদের গন্তব্য শহর থেকে বের দূরে, অন্তত ১৪/১৫ স্টেশন পরে। তাই কখনো ট্রেনের বাইরের দৃশ্য দেখে আবার কখনো নিচু স্বরে ইয়াসের সাথে গল্প করতে করতে সময় কাটাতে লাগলাম। ট্রেনের বাইরে ঝকমকে হংকং, সুউচ্চ ভবন, আলোর বন্যা, কিংবা পাহাড়। আবার ইয়াসের গল্পের বেশিরভাগই তার মৃত বাবাকে নিয়ে। তার অস্ট্রেলিয়ায় লেখাপড়া এবং হংকংয়ের জীবনযাত্রা নিয়ে। খেলাধুলার দারুণ অনুরক্ত ইয়াসের সাথে খেলা নিয়ে আমার গল্প খুব বেশিদূর এগুলো না। বারবার প্রসঙ্গ পাল্টে আমাদের গল্প এপথে ওপথে হাঁটছিলো। অবশেষে আমাদের স্টেশনে পৌঁছে গেলাম।

সেই চেনা স্টেশন, সেই চেনা বাসস্টপেজ। ইয়াস বললো, ৭ মিনিট পর বাস আসবে, আবাসিক এলাকার মিনিবাস। বাসে চড়ে আমরা ঘরে ফিরে এলাম। ভাবী রাতের খাবার নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। আমি ফ্রেশ হয়ে ডিনার শেষ করলাম।

ভাবী এবং ছেলেমেয়েদের সাথে কিছুক্ষণ গল্প করে ঘুমাতে চলে গেলাম। বিছানায় পড়ার পর কখন ঘুমিয়ে গেছিলাম টের পাইনি। আসলে দিনে এতো দৌঁড়ঝাপ হয়েছে যে অনভ্যস্ত শরীর অনেককিছুই নিতে পারে না। কাহিল করে ফেলে। কিন্তু নতুন কিছু দেখার নেশায় ছুটতে থাকি, রাতে টের পাই।

সকালে বেশ বেলা করে আমার ঘুম ভাঙ্গলো। তাও ভাঙ্গতো না, যদি স্বপন ফোন না করতো। কিন্তু ঘুম থেকে জেগে টের পেলাম যে, শরীর চলছে না, মাথাও ঝিমঝিম করছে। স্বপনকে পরে ফোন দিচ্ছি বলে ফ্রেশ হয়ে নিচে নামলাম। কাঠের সিঁড়িতে ইচ্ছেকৃত ধুপধাপ শব্দ করে নেমে আসলাম। নিচে নেমে দেখি ভাবী বসে আছেন, মেয়েরাও। ইয়াস নাকি কি একটা কাজে বাইরে গেছে, একটু পরেই ফিরে আসবে।

ভাবী আমাকে দেশীয় পরটা, সবজি, ডিম এবং কয়েক রকমের মাংস দিয়ে নাস্তা দিলেন। কিছু খেতে ইচ্ছে করছিল না। শুধু এক মগ কফি ছাড়া। ভাবী এবং বাচ্চাদের জোরাজুরিতে কিছু খেলাম। ভাবী নিজের হাতে কফি বানিয়ে এনে দিলেন। আমি সোফায় হেলান দিয়ে কফিটি শেষ করলাম।

ভাবী বললেন, আমি মেয়েকে নিয়ে একটু অফিসে যাবো। আপনি ইয়াসকে নিয়ে বেরুতে পারেন, টিপু ভাইকে বলে দেয়া আছে। সমস্যা হবে না। ভাবীর কাছ থেকে নাপা জাতীয় কোন ওষুধ আছে কিনা জানতে চাইলাম। তিনি এগিয়ে দিলেন। বললাম, আপনারা যান, আমি এখন আর কোথাও যাবো না, একটু রেস্ট নেবো। বিকেলে স্বপনের সাথে বের হবো। টিপু ভাইকে আজ আর কষ্ট দেবো না। আমার শরীর খারাপে ভাবী এবং বাচ্চারা উদ্বিগ্ন হলেন। আমি বললাম, তেমন কিছু নয়, ঠিক হয়ে যাবো।

ভাবী বললেন, উনি ঘন্টা খানেকের মধ্যেই ফিরে আসবেন। ভাবীকে টেনশন করতে না করে কাজ সেরে আসতে বললাম।

নাপা নয়, প্যানাডল নামের একটি ট্যাবলেট খেলাম। ভাবীকে চিন্তা করতে না করলেও আমার বেশ দুশ্চিন্তা হচ্ছিলো। বিদেশে অসুস্থ হওয়া মানে অন্যদেরও বিপদে ফেলে দেয়া, নিজেও বিপদে পড়া। আমি উপরে গিয়ে শুয়ে পড়লাম। জ্বর জ্বর লাগছিলো। তাই এসি বন্ধ করে শুধু ফ্যান চালিয়ে দিয়েছিলাম।

যখন ঘুম ভাঙ্গলো, তখন শরীর যেনো ঘামে ভিজে গেছে। তাড়াতাড়ি এসি চালিয়ে দিলাম। ওয়াশরুমে ঢুকে শাওয়ার নিলাম। শরীরটা একেবারে ঝরঝরে হয়ে গেলো। সকালে অসুস্থতাবোধ কোথায় চলে গেছে কে জানে! এক প্যানাডলের এতো যাদু! স্বপন বারবার ফোন করে খবর নিচ্ছিলো। বললাম, বিকেলে দেখা হবে। দুপুরে স্বাভাবিকভাবে খাওয়া দাওয়া করলাম। ভাবীর আয়োজন একেবারে আমাদের গ্রামের বাড়ির পাশের ভাবীর হোটেলের মতো। কত কি যে রান্না করেছেন, করিয়েছেন! ভাত খাওয়ার পর ভাবী আমাকে চা করে দিলেন। চা খেতে খেতে বললাম, স্বপনকে নিয়ে একটু ঘুরতে বেরুবো, রাতে ফিরে আসবো। তবে রাতে বাসায় খাবো না, স্বপন দাওয়াত দিয়েছে।

ভাবী বললেন, এসেছেন বন্ধুর বাসায়, অথচ খাবেন বাইরে। এটা সুন্দর দেখাচ্ছে না। স্বপন ভাইয়ের সাথে ঘুরে টুরে ওনাকে নিয়ে বাসায় চলে আসুন, আমি রান্না করবো। ভাবীকে বললাম, দরকার নেই ভাবী, স্বপন কি খাওয়ায় দেখি। সে নাকি মজার কি কি সব খাওয়াবে। ভাবী সাথে সাথে বললেন, তাহলে কি আমাদের খাবার আপনার মজা লাগে না? আমি জিভ কেটে বললাম, ছি ছি ভাবী, এই কি কথা! কত কিছুইতো আপনি করছেন। আমার বন্ধু নেই, তবুও যে এতো কিছু করছেন বিদেশ বিভুঁইয়ে এটার কী তুলনা হয়! ভাবী হাসলেন, আমিও। কথা হলো যে, রাতে ফিরবো, তবে স্বপনের সাথে খেয়ে দেয়ে।

বিকেল চারটা করে ঘর ছাড়লাম। স্বপন কাজ শেষ করে আমাকে আমার স্টেশনে নিতে আসতে চেয়েছিল। বলেছিলো, আজকের পথটি একটু ঘুরপথ, পথে ট্রেন পাল্টাতে হবে। তুই না চিনলে হারিয়ে যাবি। আমি না করে দিয়ে বলেছি, ব্যাটা ফোন আছে। হারিয়ে গেলে তুই খুঁজে নিবি। তুই যেখানে থাকবি সেই স্টেশনের নাম লিখে দে। বাকিটা আমি সামলে নেবো।

স্বপন একটি স্টেশনের নাম লিখে দিয়েছে। আমার কাম সেয়ুং স্টেশন থেকে কিভাবে কোন ট্রেনে চড়তে হবে কত স্টেশন পর নামতে হবে তাও বলে দিয়েছে। অতএব আর হারিয়ে যাওয়ার ভয় নেই। আমি ভাবীর দেয়া আবাসিক এলাকার মিনিবাসের টিকেট নিয়ে ঘর ছাড়লাম, পকেটে এক সপ্তাহের অক্টোপাস কার্ডও রয়েছে। অতএব পথ কিংবা পাথেয় কোনটিই নিয়েই চিন্তা নেই। আবাসিক এলাকার বাস চলছিলো। সেই চেনা পথ, পাহাড়ি জনপদ, দূরে আকাশ হেলান দিয়ে ঘুমানো পাহাড়। কী অনন্য সুন্দর একটি এলাকা। বাস থেকে নেমে আমি হেঁটে স্টেশনের প্লাটফরমে পৌঁছালাম। দেখলাম, তিন মিনিট পরে আমার ট্রেনটি আসবে। ব্যস, কফি নিয়ে চুকচুক করতে করতে তিন মিনিট কাটিয়ে দিলাম। (চলবে)

লেখক: চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধযুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন: ট্রাম্পের নীতি ঠেকাতে সাধারণ ভোটাররা একজোট
পরবর্তী নিবন্ধগ্রামীণ জনপদের মাটির ঘর-প্রজন্মের শেকড়ের নীরব স্মারক