ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি

| সোমবার , ৬ জুলাই, ২০২৬ at ৫:১৩ পূর্বাহ্ণ

বিশ্বজুড়ে গত কয়েক দশকে ডেঙ্গুর সংক্রমণ উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালে রোগটি ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। সংস্থাটির তথ্যমতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ডেঙ্গু এখন আর শুধু গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই। ইউরোপ ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের মতো নতুন এলাকাতেও রোগটির বিস্তার ঘটছে। ২০২৪ সালে প্রথমবারের মতো ফ্রান্স, ইতালি ও স্পেনে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়। ডব্লিউএইচও’র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে এক কোটি ৪৬ লাখের বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয় এবং অন্তত ১২ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। আর ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বিশ্বের ৯৭টি দেশ থেকে ৪০ লাখের বেশি আক্রান্ত এবং তিন হাজারের বেশি মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ডেঙ্গুর উপসর্গ মৃদু থাকে এবং আক্রান্ত ব্যক্তি এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে রোগের শুরুতেই সতর্ক থাকা প্রয়োজন। ডেঙ্গুর সাধারণ লক্ষণের মধ্যে রয়েছেউচ্চমাত্রার জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, মাংসপেশি ও অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, বমি বমি ভাব এবং শরীরে লালচে র‌্যাশ। তবে কিছু ক্ষেত্রে রোগটি মারাত্মক রূপ নিতে পারে। তীব্র পেটব্যথা, অনবরত বমি, দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাস, নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্তপাত, রক্তবমি, পায়খানার সঙ্গে রক্ত যাওয়া, অতিরিক্ত তৃষ্ণা, তীব্র দুর্বলতা কিংবা ত্বক ঠান্ডা ও ফ্যাকাশে হয়ে গেলে দ্রুত রোগীকে হাসপাতালে নিতে হবে।

ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, ডেঙ্গুর জন্য এখনো নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। আক্রান্ত ব্যক্তিকে পর্যাপ্ত বিশ্রামে রাখতে হবে এবং বেশি করে পানি, ওরস্যালাইন ও অন্যান্য তরল খাবার খাওয়াতে হবে। জ্বর বা ব্যথার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কেবল প্যারাসিটামল দেওয়া যেতে পারে। তবে আইবুপ্রোফেন, অ্যাসপিরিনসহ নন স্টেরয়েডাল অ্যান্টি ইনফ্ল্যামেটরি ওষুধ ব্যবহার করা যাবে না। কারণ এগুলো রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

ডব্লিউএইচও আরও জানায়, ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা মূলত দিনের বেলায় কামড়ায়। তাই পুরো শরীর ঢেকে রাখে এমন পোশাক পরা, দিনের বেলাতেও মশারি ব্যবহার, জানালায় নেট লাগানো, মশা প্রতিরোধে স্প্রে বা কয়েল ব্যবহার এবং বাসা, ছাদ ও আশপাশে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। এছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাটি।

বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া হাম পরিস্থিতির উন্নতি হতে না হতেই হাসপাতালগুলোতে বাড়তে শুরু করেছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। সরকারি হিসেবে, এ জ্বরে আক্রান্তের সংখ্যা ইতোমধ্যেই ছয় হাজার ছাড়িয়ে গেছে, যাদের মধ্যে অর্ধেকই সংক্রমিত হয়েছে গত এক মাসে। ওই সময়ের মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যাও আগের কয়েক মাসের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেড়েছে। সামনের কয়েক মাসে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও নিহতের সংখ্যা বেড়ে পরিস্থিতি মারাত্মক রূপনিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। ডেঙ্গু পরিস্থিতি সামনে যে ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে, সরকার নিজেও সেটি স্বীকার করছে। সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। দেশের বিভিন্ন জেলায় যে এডিস মশার বংশবিস্তার যে ক্রমেই বাড়ছে, সেটার পেছনে মূলত দুটি কারণ কাজ করছে বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এর একটি হচ্ছে এডিস মশার জন্য অনুকূল আবহাওয়া, উচ্চ তাপমাত্রা এবং ঘন ঘন বৃষ্টিপাত এডিসের বংশবিস্তারের জন্য আদর্শ পরিবেশ সৃষ্টি করে। ঘন ঘন বৃষ্টির ফলে বিভিন্ন জায়গায় পানি জমে থাকে। তখন এডিস মশা গিয়ে সেখানে ডিম পাড়ে এবং সহজে বংশবিস্তার করে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মশার বংশবিস্তারের এই প্রক্রিয়া নিয়ে ততক্ষণ পর্যন্ত চিন্তার কিছু থাকে না, যতক্ষণ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে লার্ভাগুলো ধ্বংস করা যায়। কিন্তু যখন সেগুলো নষ্ট করা যায় না, তখনই আসলে বিপদ দেখা দেয়। আমাদের এখানে সেটাই বেশি হচ্ছে। এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে গবেষকরা বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর সারাদেশে স্থানীয় সরকার ভেঙে পড়েছে। গত প্রায় দুই বছর ধরে সিটি কর্পোরেশন বা উপজেলায় জনপ্রতিনিধিরা নেই। ফলে মশা নিধনের কাজ সেভাবে হয়নি। সেজন্যই মশা বেড়ে গেছে। বর্তমানে সারাদেশে এডিস মশার যেসব লার্ভা রয়েছে, সেগুলো ধ্বংস করা সম্ভব না হলে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়বে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন তাঁরা।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে অনেকে সিটি করপোরেশনের একার দায়িত্ব মনে করে থাকেন। আসলে শুধু সিটি করপোরেশনের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়, এর প্রতিরোধে প্রয়োজন সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা। সরকারি ও বেসরকারি সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগই পারে নগরবাসীকে ডেঙ্গু থেকে সুরক্ষা দিতে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে