জুম’আর খুতবা

আল কুরআন সংকলন ও সংরক্ষণের ইতিহাস

অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভি | শুক্রবার , ৯ অক্টোবর, ২০২৬ at ৫:২৩ পূর্বাহ্ণ

প্রিয় ইসলামী ভাইয়েরা! আল্লাহ তা’আলাকে ভয় করুন! জেনে রাখুন! আল কুরআন সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য অবতীর্ণ সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানি কিতাব। মহান রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে নাযিলকৃত মহাগ্রন্থ আল কুরআন সর্বপ্রকার ভুলত্রুটি থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। আল্লাহ তা’আলা এ কিতাবের সূচনাতেই ঘোষণা করেন, “সেই কিতাব যাতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই”। এ কিতাব তার শ্রেষ্ঠতের চ্যালেঞ্জ নিয়ে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে। বিগত পনেরশত বৎসর ধরে এ চ্যালেঞ্জ আজো অক্ষুন্ন রয়েছে, কুরআন আজো অবিকৃত রয়েছে, থাকবে অনন্তকাল। আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, “এতদ সম্পর্কে যদি তোমাদের কোন সন্দেহ থাকে যা আমি আমার বান্দার উপর অবতীর্ণ করেছি, তাহলে এর মত একটি সূরা রচনা করে নিয়ে এসো। (সূরা: বাকারা, আয়াত: ২৩)

আল্লাহ তা’আলা আরো এরশাদ করেছেন, “আমি এ কুরআনকে অবতীর্ণ করেছি আর তা সংরক্ষণের দায়িত্ব আমারই। (সূরা: ইবরাহীম: ০৯)

তেইশ বছর ধরে কুরআন অবতরণ:

পবিত্র কুরআন কিতাবুল্লাহ ও কালামুল্লাহ। সৃষ্টির সূচনা থেকেই লাওহে মাহফুজে সংরক্ষিত ছিল। আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, “বরং তা (সেই) কুরআন যা লাওহে মাহফুজে সুরক্ষিত রয়েছে। (সূরা: বুরুজ, ২১–২২)

লাওহে মাহফুজ থেকে দু’পর্যায়ে কুরআন নাযিল হয়েছে, প্রথম পর্যায়ে সম্পূর্ণ কুরআন একই সঙ্গে দুনিয়ার নিকটবর্তী আসমান বায়তুল ইযযত (বায়তুল মামুরে) নাযিল হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে সুদীর্ঘ তেইশ বছর ধরে সময়ের প্রয়োজনে ধীরে ধীরে অল্প অল্প এক বা একাধিক সূরা প্রধান ফেরেশতা হযরত জিবরীল (আ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট নিয়ে আসতেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবারেই হৃদয়ে ধারণ করে নিতেন। অতঃপর সাহাবীদের কাছে তা শুনাতেন। শুরুতে গ্রন্থরূপে সংরক্ষণ করা সম্ভব ছিলনা। শুরুতেই কুরআন সংরক্ষনের ক্ষেত্রে মুখস্থ করার উপর সবচাইতে বেশি গুরুত্ব ছিল। তবে সাথে সাথে সুনির্দিষ্ট কয়েকজন সাহাবীকেও পবিত্র কুরআন লিখে রাখার দায়িত্বও দেওয়া হয়েছিল।

হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এর খেলাফতকালে কুরআন সংকলন:

পবিত্র কুরআন সংকলন ও সংরক্ষণে খলিফাতুর রাসূল হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এর ভূমিকা ও অবদান ছিল ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর খেলাফতকালে মুসায়লামাতুল কাজ্জাব নামে এক মিথ্যুক ভন্ড, নবুওয়তের দাবী করে। তাঁর সাথে ইয়ামামা নামক স্থানে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়। এতে ১২০০ মুসলমান শহীদ হন, তন্মধ্যে ৭০০জন ছিল হাফেজে কুরআন। এ বিপুল সংখ্যক হাফেজে কুরআনের শাহাদাত বরণে হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়েন। তিনি এ ব্যাপারে খলিফাতুল মুসলেমীন হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এর দৃষ্টি আকর্ষন করেন। এ প্রসঙ্গে সহীহ বুখারী শরীফে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত যায়েদ ইবনু সাবিত রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “ইয়ামামার যুদ্ধের সময় লোকদের ব্যাপকভাবে নিহত হওয়ার সংবাদ পাওয়ার পর হযরত আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু আমাকে ডেকে পাঠালেন তখন তাঁর কাছে হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু উপস্থিত ছিলেন। আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু বললেন, উমর আমার কাছে এসে বলেছেন, ইয়ামামার যুদ্ধে বহু কুরআন পাঠকারী (হাফিজ) শহীদ হয়েছেন, আমি আশঙ্কা করছি বিভিন্ন যুদ্ধে এভাবে কুরআন পাঠকারী (হাফিজ) শহীদ হতে থাকলে কুরআনের অনেকাংশে হারিয়ে যেতে পারে। তাই আমি মনে করি, আপনি কুরআন সংকলনের নির্দেশ দিন। আমি উমরকে বললাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে কাজ করেননি আমরা কীভাবে সে কাজ করব? উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, আল্লাহর কসম এটি কল্যাণকর কাজ। অতঃপর উমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু বারবার এ বিষয়ে বুঝাতে থাকলেন অবশেষে আল্লাহ আমার অন্তরও এ কাজের জন্য প্রশস্ত করে দিলেন এবং আমি উমরের মতামত সঠিক বলে গ্রহণ করলাম। আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু বললেন, তুমি একজন যুবক ও বুদ্ধিমান ব্যক্তি। আমরা তোমাকে অবিশ্বস্ত মনে করিনা। তুমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্য ওহী লিখতে। অতএব তুমি কুরআনের লিখিত অংশগুলো অনুসন্ধান করে তা একত্রিত করো। (সহীহ বুখারী, ৪৯৮৬)

কুরআন সংকলনে হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত এর ভূমিকা:

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে ওহী লিখকের দায়িত্বে নিয়োজিত সাহাবীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)। হযরত আবু বকর সিদ্দিক এ গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য হযরত যায়েদ ইবনে সাবিতকে নির্বাচন করেছেন, তিনি ছিলেন একুশ বছরের যুবক, চৌকস, মেধা, প্রজ্ঞা ও অনন্য প্রতিভার অধিকারী, সকলের বিশ্বস্ত আস্থাভাজন, এ কাজের জন্য যথার্থ ও উপযুক্ত। হযরত কাতাদাহ (রা.) বর্ণনা করেন, তিনি হযরত আনাস (রা.) কে জিজ্ঞেস করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশীয় কে কুরআন একত্র করে ছিলেন, হযরত আনাস (রা.) জবাব দেন, চারজন আনসার সাহাবী এ কাজ করেছিলেন তাঁরা হলেন, হযরত ওবাই ইবনে কাব, মু’আয ইবনে জাবাল, যায়েদ ইবনে সাবিত এবং আবু যায়েদ রাদ্বিয়্যল্লাহু আনহুম। (সিয়ারু আলামিন নুবালা, ইমাম সামশুদ্দিন আয–যাহবী, ২/৪৩১)

রাসূলুল্লাহর যুগে নাযিলকৃত আয়াত সমূহ যদিও চামড়া, হাড়, পাথর ইত্যাদিতে লিপিবদ্ধ ছিল তথাপি এক জায়গায় সংরক্ষিত ছিলনা। হযরত আবু বকর (রা.) এর যুগে হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) এর তত্ত্বাবধানে কুরআনের প্রতিটি আয়াত কাগজে লিপিবদ্ধ করা হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় সাহাবীরা যে ক্রমধারায় আয়াতগুলো মুখস্থ করেছিলেন সেভাবে বিন্যাস করা হয়।

আল কুরআন সংরক্ষনে হযরত উসমান (রা.) এর ভূমিকা:

হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এর যুগে সংকলিত কুরআনের কপিটি তাঁর ইন্তিকালের পর এ কপিটি হযরত ওমর (রা.) এর তত্ত্বাবধানে ছিল। ওমর (রা.) এর ইন্তিকালের পর তাঁর কন্যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহধর্মিণী হযরত হাফসা (রা.) এর কাছে সংরক্ষিত ছিল। এর পর হযরত উসমান (রা.)-এর শাসনামলে কুরআন তিলাওয়াতে মতবিরোধ দেখা দেয়, এ প্রসঙ্গে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে তিনি বলেন, হযরত হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান (রা.) একদা হযরত উসমান (রা.) এর নিকট এলেন এ সময় তিনি আরমেনিয়া ও আযারবাইজান অভিযানে ইরাকী যোদ্ধাদের সঙ্গে মিলে সিরীয়দের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন, কুরআন পাঠে তাদের মতবিরোধ হুযায়ফাকে ভীষণ চিন্তিত করল তিনি হযরত উসমান (রা.) এর নিকট এসে বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন! কিতাব সম্পর্কে ইহুদী নাসারাদের মতো মত পার্থক্যে লিপ্ত হওয়ার পূর্বে আপনি মুসলমানদেরকে রক্ষা করুন। অত:পর তিনি হযরত হাফসার নিকট রক্ষিত কুরআনের কপিটি সংগ্রহ করার জন্য একব্যক্তিকে পাঠিয়ে সংরক্ষিত কপিটির জন্য আবেদন করেন, হযরত হাফসা (রা.) কপিটি হযরত উসমান (রা.)এর কাছে পাঠিয়ে দিলেন। এরপর উসমান (রা.) যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) আবদুল্লাহ ইবনে যোবায়ের (রা.), সাঈদ ইবনুল আস (রা.) আবদুর রহমান ইবনে হারিস ইবনে হিশাম (রা.) কে একটি মাসহাফে তা লিপিবদ্ধ করার নির্দেশ দিলেন, কুরআনের কোনো বিষয়ে মতভেদ দেখা দিলে তোমরা তা কুরায়শদের ভাষায় লিপিবদ্ধ করবে কেননা কুরআন তাদের ভাষায় নাযিল হয়েছে। তাঁরা তা করলেন মূল কপিটি হাফসা (রা.) কাছে ফিরিয়ে দিলেন। কুরআনের একটি মাত্র মাসহাফ সংকলন শেষ করে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রান্তে কপি প্রেরণের ব্যবস্থা করেন, এ কপির সঙ্গে অমিল সব কুরআনের কপি জালিয়ে দিতে নির্দেশ জারী করলেন। হযরত উসমান (রা.) কর্তৃক বিভিন্ন প্রদেশ ও শহরে, প্রেরিত কপির সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন মত পাওয়া যায়। অধিকাংশের মতে চারটি মুসহাফ প্রস্তুত করেছিলেন একটি মদীনায় রেখে অন্যগুলো সিরিয়া, কুফা ও বসরায় প্রেরণ করেন। কারো কারো মতে মুসহাফের কপি ৮টি, পূর্বোক্ত চারটি ছাড়াও একটি মক্কায় একটি বাহরাইনে সপ্তম কপিটি ইয়ামেনে, অষ্টম মুসহাফটি হযরত উসমান (রা.) নিজের কাছে রেখেছিলেন শাহাদাতের সময় তিনি সেটি তিলাওয়াত করেছিলেন। (আদ ওয়াউল বায়ান ফী তারীখিল, কুরআন ৭৭)

আল কুরআন আল্লাহর প্রতিশ্রুতিতে সংরক্ষিত চিরন্তন হিদায়াতের আলো যা কিয়ামত পর্যন্ত মানবজাতিকে সত্য ও কল্যাণের পথে পথ দেখাবে। সাহাবায়ে কেরামের অসামান্য সতর্কতা, ত্যাগ ও আমানতদারিতা কুরআনের বিশুদ্ধতা রক্ষায় কুরআন সংরক্ষণের ইতিহাসে অনন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আল কুরআনের প্রতিটি অক্ষর আজো একইভাবে সুরক্ষিত ও অবিকৃত। এটি আল্লাহর চিরন্তন ঘোষণার জীবন্ত বাস্তব প্রমাণ। মহান আল্লাহ আমাদেরকে আল কুরআনের আলোকে হিদায়ত নসীব করুন, আমীন।

লেখক : অধ্যক্ষ, মাদরাসা–এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রী), বন্দর, চট্টগ্রাম, খতীব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।

[ইসলাম সম্পর্কিত পাঠকের প্রশ্নাবলি ও নানা জিজ্ঞাসার জবাব দিচ্ছেন বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভি। আগ্রহীদের বিভাগের নাম উল্লেখ করে নিচের ইমেলে প্রশ্ন পাঠাতে অনুরোধ জানানো হচ্ছে।

Email : azadieditorial@gmail.com]

মোসাদ্দেক আলী

বুড়িশ্চর, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম।

প্রশ্ন: কোনো ব্যক্তি ফজর ও জোহরের নামায আদায় করার পর কোনো কারণে আসরের নামায পড়তে না পারলে আসরের কাযা আদায় করার আগে কি তিনি মাগরিবের নামাজের ইমামতি করতে পারবেন? এ বিষয়ে শরয়ী মাসআলা জানতে চাই।

উত্তর: পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ এবং বিতরের মধ্যে–তা আদা হোক বা কাযা তারতীব রক্ষা করা জরুরি। কাযা নামাজ থাকা অবস্থায় পরবর্তী নামাজ আগে পড়া জায়েজ নয়। তবে সময় সংকীর্ণ হয়ে গেলে তারতীবের বাধ্যবাধকতা শিথিল হয়। (রদ্দুল মুহতার, খন্ড:২, পৃ: ৬৫–৬৭)

ফতোয়া আলমগীরিতে আছে, কাযা নামাজ ও বর্তমান ওয়াক্তের নামাযের মধ্যে এবং একাধিক কাযা নামাজের মধ্যেও তারতীব রক্ষা করা জরুরি। সুতরাং মাগরিবের সময় আসরের কাযা বাদ দিয়ে মাগরিব শুরু করলে মাগরিব সহিহ হবেনা। (আলমগীরি, কিতাবুস সালাত, খন্ড:১, পৃ: ১২১)

যদি তার ছয় বা তার বেশি ওয়াক্তের নামায কাযা থাকে তাহলে তারতিবের বাধ্যবাধকতা থাকে না। তখন আসরের কাযা আগে না পড়েও মাগরিবের ইমামতি করতে পারবেন।

বাহারে শরীয়তে রয়েছে, পূর্বের কাযা নামাজের কথা স্মরণ থাকা সত্বেও পরবর্তী নামাজ পড়লে তা জায়েজ নয়। (বাহারে শরীয়ত, খন্ড:১, অংশ ৪, পৃ: ৩৭০, ফতোওয়ায়ে রযভিয়্যা, খন্ড:৮, পৃ: ১৪৪)

পূর্ববর্তী নিবন্ধজৈব সার : মাটির প্রাণ ফেরানোর পথ, তবে বিজ্ঞানের হাত ধরেই
পরবর্তী নিবন্ধচান্দগাঁও ৪নং ওয়ার্ডে জামায়াতের পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধন অভিযান