জুম’আর খুতবা

আল্লাহর নবী হযরত ইয়াহইয়া (আ.) এর দ্বীনি দাওয়াত

অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভি | শুক্রবার , ৩১ জুলাই, ২০২৬ at ১০:৫০ পূর্বাহ্ণ

প্রিয় ইসলামী ভাইয়েরা!

আল্লাহ তা’আলাকে ভয় করুন, আল্লাহর মনোনীত সম্মানিত নবী রাসূল আলাইহিমুস সালাম এর জীবন কর্ম সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করুন। আল্লাহর মনোনীত নবী রাসূলগন পূত:পবিত্র নিষ্পাপ সত্তা। তাঁদের জীবনাদর্শের চর্চা করা, তাঁদেরকে উত্তমভাবে স্মরণ করা আদর্শ জীবন গঠনে নবীদের জীবনাদর্শের অনুসরণ করা সংকট মুক্তির পাথেয়।

হযরত ইয়াহইয়া (.) এর পরিচয়: হযরত ইয়াহইয়া (.) ছিলেন আল্লাহর মনোনীত নবী, হযরত যাকারিয়া (.) এর সুযোগ্য সন্তান। পবিত্র আল কুরআনের সূরা আল ইমরান, সূরা আনআম, সূরা মারইয়াম ও সূরা আম্বিয়াসহ চারটি সূরায় তাঁর বরকতময় নাম উল্লেখ হয়েছে। ইয়াহহিয়া (.) এর পরবর্তী নবী ছিলেন হযরত ঈসা (.)। তিনি বয়সে ঈসা (.) এর চেয়ে ছয় মাসের বড় ছিলেন। হযরত যাকারিয়া (.) ও ইয়াহইয়া (.) পিতাপুত্র দুইজনই নবী ছিলেন। বায়তুল মুকাদ্দাসের অধিবাসী ছিলেন। পিতাপুত্র দুই জনই বনী ইসরাঈল বংশের নবী ছিলেন।

হযরত ইয়াহইয়া (.) এর অলৌকিক জন্ম: মহান রাব্বুল আলামীন সৃষ্টিকর্তা সর্বশক্তিমান। মহান আল্লাহ ইচ্ছে করলে তাঁর বান্দাকে বৃদ্ধ বয়সেও সন্তান দান করতে পারেন। হযরত যাকারিয়া (.) বৃদ্ধ বয়সে আল্লাহর নিকট সন্তান কামনা করলে আল্লাহ তাঁর দুআ কবুল করেন। আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেছেন, “হে যাকারিয়া আমি তোমাকে এমন এক পুত্রের সুসংবাদ দিচ্ছি যার নাম হবে ইয়াহইয়া। এর আগে এ নামে আমি কাউকে নামকরণ করিনি। (সূরা: মারইয়াম, ১৯:)- বর্ণিত আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহ তা’আলা নিজেই যাকারিয়া (.) এর প্রার্থনা কবুল করলেন এবং একজন নেক সন্তানের সুসংবাদ দিলেন। একই সাথে আল্লাহ নিজেই নাম রাখলেন।

হযরত ইয়াহইয়া (.) ছিলেন অসংখ্য গুণাবলীর অধিকারী: আল্লাহ তা’আলা তাঁর মনোনীত নবী হযরত ইয়াহইয়া (.) কে অসংখ্য গুণাবলীর ধারক বাহক করে তাঁর জীবনাদর্শকে বিশ্ববাসীর জন্য অনুসরণীয় আদর্শ করেছেন। মহান আল্লাহ তাঁকে প্রজ্ঞা, খোদাভীতি অন্তরের পবিত্রতা, পিতা মাতার প্রতি সদাচারী ও সত্যের উপর অবিচলতা ও সত্য প্রতিষ্ঠার এক সমুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে তাঁকে প্রেরণ করেছেন। মহান আল্লাহ হযরত ইয়াহইয়া (.) সম্পর্কে এরশাদ করেছেন, হে ইয়াহইয়া! দৃঢ়তার সাথে এ কিতাব (তাওরাত) ধারণ কর, আর আমি তাকে শৈশবেই জ্ঞান দান করেছিলাম এবং আমার নিকট থেকে তাঁকে হৃদয়ের কোমলতা ও পবিত্রতা প্রদান করেছিলাম এবং সে ছিল মুত্তাকী। সে ছিল পিতা মাতার অনুগত এবং সে উদ্ধত ও অবাধ্য ছিল না। (সূরা: মারইয়াম, আয়াত: ১২১৫)

হযরত ইয়াহইয়া (.) দ্বীনি আদর্শ ও শিক্ষার প্রচার প্রসারে গোটা জীবন কাজ করেছেন। মানুষকে তাওহিদ একত্ববাদ আল্লাহর আনুগত্য, ইবাদত বন্দেগী, সুবিচার ও ন্যায় পরায়ণতার দিকে আহবান জানাতেন। পার্থিব জীবনের লোভলালসা, বিলাসিতা অহংকার বিন্দুমাত্র তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। দুনিয়ার ভোগবিলাস থেকে নিজকে বিরত রাখতেন। অন্যায় পাপাচার শরীয়ত বিরোধী সকল প্রকার কার্যকলাপ থেকে নিজকে সম্পূর্ণরূপে বিরত রাখতেন। আল্লাহ তা’আলা সূরা আলে ইমরানে তাঁর পবিত্র চরিত্রের প্রশংসা করেছেন, এরশাদ হয়েছে, তিনি হবেন সম্মানিত সরদার, অত্যন্ত সংযমী এবং সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত একজন নবী। (সূরা: আলে ইমরান, :৩৯)

হযরত ইয়াহইয়া (.) এর দ্বীনি দাওয়াত: মানুষকে তাওহীদের প্রতি আহবান শিরক থেকে সতর্ক করা, আল্লাহর দেওয়া বিধান অনুযায়ী জীবনকর্ম পরিচালনা করা, জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধির নীতি অবলম্বন করা, তাওবা এস্তেগফার, সালাত, সাওম, সাদকা, যিকির ও দ্বীনি খিদমতের প্রতি জনগণের মননে চিন্তা চেতনায় আগ্রহ অনুভূতি প্রেরণা উৎসাহ উদ্দীপনা জাগ্রত করা। অন্যায় অপরাধ ও শরীয়ত বিরোধী কার্যকলাপের প্রতি মানুষের অন্তরে ঘৃণা সৃষ্টি করা ছিল তাঁর তাবলীগে দ্বীন তথা ইসলামী দাওয়াত প্রচারের মূলনীতি।

আল্লাহর পক্ষ থেকে হযরত ইয়াহইয়া (.) কে পাঁচ বিষয়ের নির্দেশনা: হাদীসের আলোকে তাঁর দ্বীনি দাওয়াতের মূল বিষয়সমূহ: আল্লাহর নবী হযরত ইয়াহইয়া (.)-এর দ্বীনি দাওয়াতের বৈশিষ্ট্য বর্তমান যুগে ওলামা মাশায়েখ, দাঈ, ইমাম, খতিব ও ইসলাম প্রচারকদের জন্য এক অনুকরণীয় আদর্শ। তাঁর দ্বীনি দাওয়াতের বিষয়গুলো আজকের যুগেও সমান গুরুত্ববহ। জামাতবদ্ধ জীবন যাপন করা, জামায়াত হতে বিচ্যুৎ না হওয়া, মুসলিম শাসকদের কথা শ্রবণ করা, বৈধ বিষয়ে আনুগত্য করা, আল্লাহর পথে হিজরত করা, (পরিস্থিতির আলোকে যেখানে প্রযোজ্য) আল্লাহর পথে জিহাদ করা।

হযরত আবদুল্লাহ ইবন আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা ইয়াহইয়া বিন যাকারিয়া (.) কে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিয়েছিলেন। যাতে তিনি নিজে সেগুলোর উপর আমল করেন এবং বনী ইসরাইলকেও সেগুলোর উপর আমল করার নির্দেশ দেন। (দীর্ঘ হাদীস) এরপর হযরত ইয়াহইয়া (.) বায়তুল মাকদিসে বনী ইসরাইলকে একত্রিত করে পাঁচটি বিষয়ে শিক্ষা দেন পাঁচটি বিষয়ের মূল বক্তব্য হলো। ১. তাওহীদের নিদের্শ, আল্লাহ আমাকে আদেশ করেছেন যে, আমি তোমাদের নির্দেশ দিই, তোমরা একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তার সঙ্গে কোনো কিছুকে অংশীদার স্থাপন করবেনা। ২. সালাত প্রতিষ্ঠার নির্দেশ, “আমি তোমাদের নামাযের নির্দেশ দিচ্ছি, কেননা বান্দা যতক্ষণ সালাতে এদিক সেদিক মনোযোগ না দেয় ততক্ষণ আল্লাহ তার প্রতি বিশেষ অনুগ্রহের দৃষ্টি রাখেন। ৩. সাওমের নির্দেশ, আমি তোমাদের রোজা পালনের নির্দেশ দিচ্ছি, এর দৃষ্টান্ত সেই ব্যক্তির মতো, যার কাছে একটি থলিতে কস্তুরী (মিশক) রয়েছে, তাঁর সুঘ্রাণে সবাই আনন্দিত হয়। ৪. সাদকার নির্দেশ, আমি তোমাদের সাদকা করার নির্দেশ দিচ্ছি, এর দৃষ্টান্ত সেই ব্যক্তির মতো যাকে শত্রুরা বন্দী করেছে এবং হত্যা করতে উদ্যত হয়েছে, তখন সে নিজের সম্পদ দিয়ে মুক্তিপন দিয়ে নিজকে রক্ষা করল, তেমনি সাদকা আল্লাহর শাস্তি থেকে বান্দার মুক্তির একটি বড় মাধ্যম। ৫. যিকিরের নির্দেশ, আমি তোমাদের অধিক পরিমাণ আল্লাহর যিকিরের নির্দেশ দিচ্ছি, এর দৃষ্টান্ত সেই ব্যক্তির মতো যার কিছু শত্রুরা দ্রুত ধাওয়া করছে। অতঃপর সে একটি সুদৃঢ় দুর্গে প্রবেশ করে নিজেকে শত্রুদের হাত থেকে নিরাপদ করল। তেমনি আল্লাহর যিকর ছাড়া বান্দা শয়তানের আক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারেনা। (জামি তিরমিযী, মুসনাদ আহমদ, তাফসীর ইবন কাসীর তাফসীর কুরতুবী)

ঐতিহাসিকদের মতে আনুমানিক ২৮৩০ খ্রিস্টাব্দে এক জালিম শাষকের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। ঐতিহাসিক মত অনুযায়ী বায়তুল মাকদিস অঞ্চলে তাঁকে দাফন করা হয়। আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে হযরত ইয়াহইয়া (.) এর আদর্শ অনুসরণ করার তাওফীক দান করুন। আমীন।

লেখক : অধ্যক্ষ, মাদরাসাএ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রি), বন্দর, চট্টগ্রাম; খতীব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবৃদ্ধাশ্রমের বিকল্প ভাবনা প্রসঙ্গে
পরবর্তী নিবন্ধমেঘলিপি