কয়েকবছর আগেও অগাস্ট থেকে নভেম্বর–এই সময়ে দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজের স্টক শেষ হয়ে যাওয়ায় হাজার হাজার টন পেঁয়াজ আমদানি করা হতো। তখন পেঁয়াজের দাম হু হু করে বেড়ে মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যেতো। তবে এ বছর দেশীয় পেঁয়াজের স্টক এখনো থাকায় পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়নি এবং নভেম্বর ডিসেম্বর পর্যন্ত আমদানি করতে হবে না। শুধু এ বছর নয় গতবছরও পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়নি। কিন্তু কীভাবে এটা সম্ভব হলো? দেশের কৃষকেরা এখন পেঁয়াজ সংরক্ষণের নানান পদ্ধতি অবলম্বন করায় এই সাফল্য এসেছে। যার কৃতিত্ব কৃষি মন্ত্রণালয়ের। তারা কৃষককে পেঁয়াজ সংরক্ষণের সঠিক পদ্ধতি অবলম্বন করতে উৎসাহিত করেছে এবং কৃষকও ঐ পদ্ধতি অবলম্বন করে লাভবান হয়েছে। পেঁয়াজ একটি পচনশীল পণ্য। তাই খুচরা বা পাইকারি পর্যায়ে দীর্ঘদিন পেঁয়াজ ভালো রাখতে হলে আলো–বাতাস চলাচল করে এমন শুষ্ক ও ঠাণ্ডা স্থানে ঝুড়ি, কুলা বা মাচায় সংরক্ষণ করা–সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি। পর্যাপ্ত আলো বাতাস পাওয়ায় এই পদ্ধতিতে পেঁয়াজ পঁচে না। তবে সংরক্ষণের আগে পেঁয়াজের চারা বা গাছ ভালোভাবে শুকিয়ে ও মাটি পরিষ্কার করে নিতে হবে এবং পঁচা, কাটা বা রোগাক্রান্ত পেঁয়াজ ভালো পেঁয়াজ থেকে আলাদা করতে হবে।
বাংলাদেশে প্রধানত দুই মৌসুমে পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়। রবি মৌসুম (শীতকাল) এবং খরিফ মৌসুম (গ্রীষ্ম ও বর্ষাকাল)। রবি মৌসুমের (মূল মৌসুম) বীজ বপনের সময় হলো কার্তিক থেকে অগ্রহায়ণ মাস (অক্টোবর থেকে নভেম্বর)। চারা রোপণের সময় হলো অগ্রহায়ণ থেকে পৌষ মাস (মধ্য নভেম্বর থেকে ডিসেম্বর)। চারা রোপণের ৯০ থেকে ১১০ দিন পর অর্থাৎ ফাল্গুন থেকে চৈত্র মাসে (ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ) পেঁয়াজ সংগ্রহ করা হয়। এটি দেশের মূল পেঁয়াজ উৎপাদন মৌসুম। খরিফ মৌসুম (গ্রীষ্মকালীন চাষ) বীজ বপনের সময় হলো আষাঢ় থেকে শ্রাবণ মাস (জুলাই থেকে আগস্ট)। চারা রোপণের সময় হলো শ্রাবণ থেকে ভাদ্র মাস (আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর) এবং রোপণের ২ থেকে আড়াই মাসের মধ্যে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ উৎপাদনের উপযোগী হয়। অর্থাৎ অক্টোবর নভেম্বরে এই পেঁয়াজ বাজারে চলে আসে।
হঠাৎ পেঁয়াজের বিষয়টি আলোচনার কারণ হলো–দেশে উৎপাদিত পচনশীল সব্জি ও মসল্লা জাতীয় পণ্য সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা গেলে দেশে এগুলোর ক্রাইসিস হবে না এবং বৈদেশিক মূদ্রা ব্যয় করে আমদানিও করতে হবে না। এরচেয়েও ভালো খবর হলো, বিগত অন্তর্বর্তী সরকার দেশে উৎপাদিত পচনশীল সব্জি ফলমূল ও মসল্লা জাতীয় পণ্য সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন স্থানে ১৮০ টি মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপনের একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছিলো। যার মধ্যে ১৫০টি মিনি কোল্ড স্টোরেজ ইতিমধ্যে স্থাপিত হয়েছে। বাকিগুলো আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে স্থাপিত হবে। এটি খুব ভালো একটি উদ্যোগ। কারণ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে উৎপাদিত ফসল সুলভে ও সহজে সেই অঞ্চলে সংরক্ষণ করা গেলে সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে। এইসব (১০ টন ধারণক্ষমতা) সাধারণ রুম বেইজ ছোট কোল্ড স্টোরেজ তৈরি করতে খরচ হয় ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা। আর সোলার চালিত কনটেইনার মডেলের মিনি কোল্ড স্টোরেজ তৈরিতে খরচ হয় প্রায় ১৫ লাখ টাকা। যদিও মাঝারি বা বাণিজ্যিক কোল্ড স্টোরেজ (১,০০০ টন থেকে ৩,০০০ টন) ধারণক্ষমতার বড় কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণে প্রায় ১৫ কোটি টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। এই মিনি কোল্ড স্টোরেজের মাধ্যমে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পচনশীল শাকসবজি ও ফলমূল কম খরচে সংরক্ষণ করে সতেজ রাখতে পারছেন। এসব কোল্ড স্টোরেজে ৫ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় শাকসবজি ও ফলমূল ১৫ থেকে ২১ দিন পর্যন্ত সতেজ ও তাজা রাখা যায়। এতে উৎপাদিত ফসল দ্রুত পচে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পায়। কম দামে তাৎক্ষণিকভাবে ফসল বিক্রি করার বাধ্যবাধকতা না থাকায় কৃষকরা ভালো দাম পায়। জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থায়নে এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে এই ছোট হিমাগারগুলো কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এর সফলতায় সরকার আরো দুই হাজার মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে এবং এগুলো পার্বত্য অঞ্চলসহ দেশের প্রত্যন্ত ও প্রান্তিক এলাকায় স্থাপন করা হবে। অন্যদিকে সোলারের মাধ্যমে এই কোল্ড স্টোরেজ চলার অপশন থাকায়, বিদ্যুতের উপর চাপ পড়বে না এবং এতে পরিচালন খরচও কম পড়বে। ইতিমধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয় এই মিনি কোল্ড স্টোরেজে বিভিন্ন প্রকার খাদ্য সংরক্ষণের উপর গবেষণা করছে। যাতে কোন নির্দিষ্ট পণ্য কীভাবে সংরক্ষণ করলে ও কতদিন পর্যন্ত রাখলে তার গুণগত মান অক্ষুণ্ন থাকে। আর এটি সফলভাবে করা গেলে দেশে কৃষিজাত পণ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বিপ্লব সাধিত হবে।
জানা যায়, বাংলাদেশে প্রতি বছর উৎপাদিত শাকসবজি ও ফলমূলের প্রায় ৪০ থেকে ৪৪ শতাংশ নষ্ট বা পচে যায়। বিভিন্ন গবেষণা ও সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ফসল সংগ্রহ থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছানোর বিভিন্ন ধাপে এই বিপুল পরিমাণ অপচয় ঘটে। সার্ক এগ্রিকালচার সেন্টারের তথ্যমতে, কেবল ফল ও শাকসবজির ক্ষেত্রেই এই অপচয়ের হার প্রায় ৪০.২%। এতে আর্থিক ক্ষতি হয় বছরে প্রায় ২৪০ কোটি মার্কিন ডলার বা ৩০ হাজার কোটি টাকার। জানা যায়, শুধু সঠিক সংরক্ষণের অভাবে দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজ ৩০%,গাজর ২৭%,আলু ২২%,টমেটো ৩০%,ধান/চাল ২৩%,গম ১৭%,মসুর ডাল ২৭%,কলা ২০%,আম ২৯% নষ্ট হয়।
তবে দেশে আলু সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত হিমাগার (কোল্ড স্টোরেজ) থাকলেও অন্যান্য কাঁচা সবজি বা শাক সংরক্ষণের জন্য আধুনিক ব্যবস্থা খুবই সীমিত। অন্যদিকে কৃষিজাত পণ্য পঁচার আরেকটি প্রধান কারণ ত্রুটিপূর্ণ পরিবহন ও প্যাকিং। সাধারণ ট্রাকে গাদাগাদি করে সবজি পরিবহনের সময় প্রচণ্ড গরম এবং বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা না থাকায় দ্রুত সবজি পচে যায় বা মান নষ্ট হয়। আবার মাঠ থেকে ফসল কাটার পর সঠিক উপায়ে প্যাকেজিং বা গ্রেডিং না করার কারণে বিপণন পর্যায়েই ২৫–৩০ ভাগ সবজি নষ্ট হয়।
এদিকে পার্বত্য তিন জেলায় (রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান) প্রতি বছর উৎপাদিত ফলের প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ পঁচে বা নষ্ট হয়ে যায়। যার আর্থিক বাজারমূল্য বছরে হাজার কোটি টাকারও বেশি। কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, পার্বত্য চট্টগ্রামে বছরে প্রায় ১৯ লাখ মেট্রিক টন ফল উৎপাদিত হয়, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ২ হাজার কোটি টাকারও বেশি। পার্বত্য অঞ্চলে উৎপাদিত ফলফলাদি পচে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণগুলো হলো–পার্বত্য জেলায় হিমাগারে সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় কাঁঠাল, আনারস ও আমের মতো পচনশীল মৌসুমি ফল বাগানেই নষ্ট হয়ে যায়। ফসলের দাম পড়ে যাওয়ায় অনেক সময় কৃষক উৎপাদিত ফসল বাজারে আনতে অনুৎসাহিত বোধ করে। আবার অনেক ফলের বাগান অত্যন্ত দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় সড়ক বা নৌপথে সময়মতো ফলগুলো মূল বাজারে বা সমতলে পরিবহণ করা সম্ভব হয় না–এটিও মৌসুমি ফল নষ্টের একটি বড় কারণ। অন্যদিকে পাহাড়ে উৎপাদিত ফল দিয়ে জুস, জ্যাম বা চিপসের মতো প্রক্রিয়াজাত কারখানা না থাকায় উদ্বৃত্ত ফল নষ্ট হয়ে যায়। ফলে পচে যাওয়ার ভয়ে অনেক সময় চাষিরা পানির দরে ফল বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন অথবা বিক্রি করতে না পেরে তা পাহাড়েই ফেলে দেন।
আসলে আমাদের দেশের কৃষকেরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যে পরিমাণ কৃষিজাত পণ্য উৎপাদন করে তা সময়মত সংরক্ষণ ও সঠিক বিপণন করা গেলে দেশে চাল ডাল ফলমূলসহ কৃষিজাত কোন পণ্য বিদেশ থেকে আমদানি করতে হবে না। আর এক্ষেত্রে আশার আলো হিসাবে এসেছে ‘মিনি কোল্ড স্টোরেজ’। যদি এটি দেশের কৃষিপ্রধান প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্থাপন করা যায়, তবে সবচেয়ে লাভবান হবে প্রান্তিক কৃষকসহ সারা দেশের কৃষক সমাজ। যার ফলাফল হবে সুদুরপ্রসারী, ইতিবাচক ও উৎসাহজনক।
লেখক: কলামিস্ট।









