প্রকৃতির সতর্কবার্তা : নেপাল ট্র্যাজেডি, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন ও আমাদের করণীয়

দিলীপ বড়ুয়া | সোমবার , ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৭:০৭ পূর্বাহ্ণ

প্রকৃতি কখনো প্রতিশোধ নেয় না; প্রতিক্রিয়া দেখায়। সেই প্রতিক্রিয়ার পেছনে থাকে প্রকৃতির নিজস্ব নিয়ম, আর সেই নিয়মকে অগ্রাহ্য করার দায় শেষ পর্যন্ত মানুষের ওপরই বর্তায়। প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হলে তার অভিঘাত মানুষকে বহন করতেই হয়।

পৃথিবীর ছাদ বলে খ্যাত হিমালয় পর্বতমালা কেবল রূপকথার গল্প বা পর্বতপ্রিয় মানুষের স্বপ্নরাজ্য নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় দুইশ কোটি মানুষের জীবনধারণের প্রধান উৎস। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও অনাকাঙিক্ষত আবহাওয়া পরিবর্তনের নির্মম শিকার আজ এই পর্বতমালা। সম্প্রতি নেপালে সংঘটিত ভয়াবহ হিমবাহধস ও আকস্মিক বন্যা এই সংকটকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। হিমালয়ের বুক থেকে নেমে আসা বরফ, শিলা, কাদা ও পানির প্রবল স্রোত মুহূর্তের মধ্যে জনপদ, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং মানুষের জীবনজীবিকাকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। দেড় হাজারের ওপরে মানুষের মৃত্যু, পাঁচ হাজারের ওপরে নিখোঁজ ও বাস্তুচ্যুতির এই বিপর্যয় শুধু নেপালের জাতীয় দুর্যোগ নয়; প্রাণহানি, নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা এবং অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ শুধু নেপালের জাতীয় দুর্যোগের সীমায় আবদ্ধ নয়; এটি সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা। বিশেষ করে হিমালয়ের তীব্র খরস্রোতা নদীগুলোর ওপর নির্মিত একাধিক জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নেপালের জাতীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার প্রায় ১০ শতাংশ স্তব্ধ হয়ে গেছে। এর পরোক্ষ প্রভাব পড়েছে প্রতিবেশী দেশগুলোতেও, কারণ নেপাল থেকে আঞ্চলিক গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। কারণ এই বিপর্যয়ের পেছনে কেবল একটি প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, বরং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও সক্রিয় রয়েছে। প্রকৃতির ওপর অব্যাহত হস্তক্ষেপের পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে তারই প্রমাণ নেপালের মৃত্যু প্লাবন। নেপাল ট্র্যাজেডি সেই কঠিন বাস্তবতারই এক ভয়াবহ স্মারক। এটিকে স্রেফ একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগবলে চালিয়ে দেওয়ার সুযোগ আর নেই।

নেপালের এই জলবায়ু বিপর্যয় আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রকৃতির ক্ষোভের সামনে মানুষের প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি কতটা অসহায়। হিমালয় যদি এভাবে একের পর এক বিপদের মুখোমুখি হতে থাকে, তবে ভবিষ্যতে কেবল নেপাল নয়সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া হুমকির মুখে পড়বে। এখনই যদি বৈশ্বিক পর্যায়ে কার্বন নিঃসরণ কমানো না হয় এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে সঠিক প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে প্রকৃতি আমাদের আরও বড় মাশুল গুনতে বাধ্য করবে।

তবে প্রশ্ন জাগে এই বিপর্যয় কি শুধু প্রকৃতির এক আকস্মিক রোষ“? বিজ্ঞান কিন্তু অত সরল ব্যাখ্যার সমর্থন দেয় না। কোনো একক দুর্যোগকে সঙ্গে সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে চিহ্নিত করতে বৈজ্ঞানিক ‘অ্যাট্রিবিউশন স্টাডি’র প্রয়োজন হয়। তবে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আন্তঃসরকার প্যানেল আইপিসিসি’র ষষ্ঠ মূল্যায়ন প্রতিবেদন এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পর্বতবিজ্ঞানীদের ধারাবাহিক গবেষণা স্পষ্ট বলছেবৈশ্বিক উষ্ণায়ন উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলের হিমবাহ, তুষারস্তর এবং পারমাফ্রস্টকে দ্রুত অস্থিতিশীল করে তুলছে। ফলে হিমবাহ সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন হিমবাহহ্রদ সৃষ্টি হচ্ছে , উপরন্তু হিমবাহধস, ভূমিধস, আকস্মিক বন্যা এবং হিমবাহহ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যার মতো বিপজ্জনক ঘটনার হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক জলবায়ু গবেষণার মূল সংস্থাগুলোর তথ্যও পরিস্থিতি কতটা আশঙ্কাজনক তা প্রমাণ করে। এদিকে বৈশ্বিক জলবায়ুর চিত্রও আশাব্যঞ্জক নয়।

বিজ্ঞানীদের মতে, সাম্প্রতিক এই প্লাবনের নেপথ্যে প্রধানত কাজ করেছে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে পার্বত্য অঞ্চলের দ্রুত পরিবর্তনশীল আবহাওয়া। হঠাৎ করেই পাহাড়ের চূড়ায় একটি বিশাল আকারের হিমবাহ ধস ঘটে। হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ গলন এবং পারমাফ্রস্ট (জমাট বাঁধা মাটি ও পাথর) দুর্বল হয়ে পড়ার হার গত কয়েক দশকে অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গলিত বরফ, কাদা এবং পাথরের স্তূপ একযোগে নিচে নেমে এসে ত্রিসুলী ও ভোটে কোশী নদীর মতো পার্বত্য নদীগুলোর গতিপথ অবরুদ্ধ করে ফেলে এবং নিমেষেই তা বিশাল জলস্ফীতি তৈরি করে। জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন, হিমবাহ ধস এবং পানির উচ্চতা বৃদ্ধির মধ্যবর্তী সময়টি ছিল অত্যন্ত কমমাত্র ৩০ থেকে ৪০ মিনিটের মধ্যে নদীর পানি স্তর প্রায় ৯ মিটার (প্রায় ২৭৩০ ফুট) পর্যন্ত বেড়ে যায়। ফলে নদীর তীরবর্তী জনপদ, বাজার এবং অবকাঠামো কোনো পূর্বাভাস বা নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সুযোগ পাওয়ার আগেই পানির তোড়ে ভেসে যায়।

আন্তর্জাতিক পর্বত গবেষণা সংস্থার দীর্ঘদিনের গবেষণা বলছে, বিশ্বজুড়ে গড়ে যে হারে তাপমাত্রা বাড়ছে, হিমালয় অঞ্চলে তার গতি দ্বিগুণ বা তার চেয়েও বেশি। একে বলা হয় ‘অ্যাম্‌প্িলফাইড ওয়ার্মিং’। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে হিমালয়ের হিমবাহগুলো দ্রুত গলে গিয়ে তৈরি করছে হাজার হাজার অস্থিতিশীল হিমবাহ হ্রদ। একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড’। যখন কোনো প্রাকৃতিক বাঁধ বরফ গলে ভেঙে যায়, তখন পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসা বিপুল পানি ও পাথরের মিশ্রণ নিচের সব ধ্বংস করে দেয়। নেপালের এই সাম্প্রতিক বন্যা প্রমাণ করে যে, জলবায়ু পরিবর্তন আর কোনো ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়তা বর্তমানের বাস্তবতা। তাই বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন আজ কেবল কোনো বৈজ্ঞানিক সেমিনারের আলোচনার বিষয় নয়; এটি আমাদের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়ানো এক অস্তিত্বের সংকট।

জলবায়ু বিপর্যয়ের এই ঘটনাটি আবার এক বৈশ্বিক বৈষম্যের চিত্র সামনে নিয়ে এসেছে। কার্বন নির্গমনের ক্ষেত্রে নেপালের অবদান বিশ্বজুড়ে নগণ্যশতাংশের হিসেবে প্রায় শূন্যের কোঠায়। অথচ উন্নত ও দ্রুত শিল্পায়িত দেশগুলোর অনিয়ন্ত্রিত কার্বন নিঃসরণের মাশুল গুনতে হচ্ছে নেপালের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে।

এখনই সময় আমাদের ভাবনার জগৎ এবং উন্নয়ন কৌশলে আমূল পরিবর্তন আনার। প্রথমত, অবকাঠামো বা যেকোনো আঞ্চলিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নকে কঠোরভাবে প্রাধান্য দিতে হবে। প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে নয়, বরং প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে কীভাবে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা যায়, সে নীতি গ্রহণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলভিত্তিক জলবায়ু সহযোগিতা জোরদার করা জরুরি। সার্কবা অন্যান্য আঞ্চলিক ফোরামের মাধ্যমে জলবায়ু বিপর্যয় মোকাবিলা, রিয়েলটাইম পূর্বাভাস তথ্য বিনিময় এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কৌশল যৌথভাবে তৈরি করতে হবে।

হিমালয়ের এই প্লাবন থেকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর শিক্ষা নেওয়ার সময় এসেছে। কেবল দুর্যোগের পর ত্রান পাঠানো কোনো টেকসই সমাধান হতে পারে না। এরজন্য প্রয়োজন ১. আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা ২. আঞ্চলিক সহযোগিতা ৩. পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো ৪. আন্তর্জাতিক তহবিল আদায় সহ দ্রুত পুনর্বাসন ও অভিযোজন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা দরকার।

বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। একই সঙ্গে তারা দেখিয়েছে, দীর্ঘদিনের অভিযোজন ও দুর্যোগ প্রস্তুতির কারণে বাংলাদেশ ঘূর্ণিঝড়জনিত প্রাণহানি নাটকীয়ভাবে কমাতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু ভবিষ্যৎ ঝুঁকি ক্রমেই জটিল হচ্ছে; জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে ২০৫০ সালের মধ্যে দেশের প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণ জলবায়ুঅভিবাসীতে পরিণত হতে পারেএমন পূর্বাভাসও রয়েছে।

তাই নেপালের ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকিয়ে বাংলাদেশের আত্মতুষ্ট হওয়ার কোনো কারণ নেই। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতা আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। পাহাড় কাটা, বন উজাড়, পাহাড়ের পাদদেশে অপরিকল্পিত বসতি, জলাধার ও খাল দখল, অপরিকল্পিত সড়ক ও নগরায়ণএসব কাজ প্রাকৃতিক ঝুঁকিকে দুর্যোগে রূপান্তরিত করে।

প্রকৃতির রোষ থেকে বাঁচতে হলে প্রকৃতির বিরুদ্ধে নয়, প্রকৃতির পক্ষেই দাঁড়াতে হবে। আজকের পৃথিবীতে এটিই আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার।

লেখক : কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক

পূর্ববর্তী নিবন্ধআশা-হতাশার দোলাচলে দক্ষিণ রাউজানবাসী