জুম’আর খুতবা

অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভি | শুক্রবার , ২৪ জুলাই, ২০২৬ at ৮:৩৬ পূর্বাহ্ণ

হত্যা ও ব্যভিচারের বিরুদ্ধে ইসলামের নিষেধাজ্ঞা

প্রিয় ইসলামী ভাইয়েরা! আল্লাহ তা’আলাকে ভয় করুন, কুরআন ও সুন্নাহর আদেশ নিষেধ মেনে চলুন, আদর্শ ও সুন্দর জীবন গঠনে নৈতিক গুণাবলী অর্জন করুন। চরিত্র ধ্বংসকারী কুরআন সুন্নাহ কর্তৃক নিষিদ্ধ, নগ্নতা, অশ্লীলতা, যিনা ব্যভিচার হত্যা ও সকল প্রকার গর্হিত অপকর্ম থেকে বিরত থাকুন।

আল কুরআনের আলোকে হত্যা ও ব্যভিচারের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা: ইসলাম অন্যায়ভাবে মানব হত্যাকে নিষিদ্ধ করেছে। এরশাদ হয়েছে, আল্লাহ যে প্রাণকে সম্মানিত ও নিরাপদ করেছেন, তোমরা তাকে অন্যায়ভাবে হত্যা করোনা। তবে ন্যায়সঙ্গত কারণ থাকলে তাভিন্ন। (সূরা: আল ইসরা, ১৭:৩৩)

এ আয়াতে মানুষের জীবনের নিরাপত্তার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তিকে ব্যক্তিগত প্রতিশোধ হিংসা শত্রুতা বা অন্য কোনো অবৈধ কারণে হত্যা করা সম্পূর্ণ হারাম। অন্য আয়াতে আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, যে কেউ যদি হত্যার বদলা বা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করা ছাড়া অন্যায়ভাবে কোনো মানুষকে হত্যা করে তবে সে যেন সমগ্র মানজাতিকে হত্যা করল। আর যে কেউ যদি একজন মানুষের জীবন রক্ষা করে সে যেন সমগ্র মানবজাতির জীবন রক্ষা করল। (সূরা: আল মায়িদাহ, :৩২)

অন্যায় ভাবে প্রাণ হত্যা করা কবীরা গুনাহ এবং কঠিন শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

যিনা ব্যভিচার সম্পর্কে আল কুরআনের নিষেধাজ্ঞা পবিত্র কুরআনে ব্যভিচারকে নিকৃষ্ট ও ঘৃনিত কাজ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, “তোমরা যিনার নিকটেও যেয়োনা নিশ্চয় তা অশ্লীল কাজ এবং অত্যন্ত নিকৃষ্ট পথ। (সূরা: আল ইসরা, ১৭:৩২)

বর্ণিত আয়াতে ব্যভিচারের বিরুদ্ধে শুধু নিষেধাজ্ঞা আরোপিতা হয় নি বরং যিনার নিকটেও যেওনা বলে যিনা ব্যভিচারের দিকে নিয়ে যায় এমন সব কারণ উপায় পরিবেশ থেকেও দূরে থাকতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যেমন নারী পুরুষের অবাধ অবৈধ মেলামেশা, অশ্লীল দৃষ্টিপাত, পর্দাহীনতা, নগ্নতা উলঙ্গপনা, বেহেয়াপনা পরপুরুষ পরনারীসহ অবস্থান যা অপকর্ম পাপাচার ব্যভিচারের দিকে নিয়ে যায়। আয়াতে করীমা যিনাকে “ফাহিশাহ” চরম অশ্লীলতা বলা হয়েছে। কারণ এটি নীতি নৈতিকতা ব্যক্তি পরিবার ও সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে ধ্বংস করে। ব্যক্তি মর্যাদা, বংশ পরিচয়, পারিবারিক সুনাম ঐতিহ্য সুখ শান্তিকে সামাজিক শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে ধ্বংস করে। এটিকে নিকৃষ্ট পথ বলা হয়েছে। মু’মিন মুসলমানের কর্তব্য হলো, এ গর্হিত অপকর্ম, অভিশপ্ত, ঘৃণিত শাস্তিযোগ্য জগন্য অপরাধ থেকে বিরত থাকা ও ইসলামী আদর্শে কুরআন সুন্নাহর আলোকে পবিত্র জীবন যাপন করা।

হাদীস শরীফের আলোকে হত্যা ও ব্যভিচারের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারী: হযরত আবুল হাকাম আল বজলি রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন, আমি হযরত আবু সাঈদ খুদরী ও হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমাকে বলতে শুনেছি, তাঁরা বলেন, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যদি (অন্যায়ভাবে সংঘটিত) কোন একজন মুমিনের হত্যাকাণ্ডে আসমান ও যামীনের সকল অধিবাসী অংশগ্রহণ করে আল্লাহ্‌ তাআলা তাদের সকলকে উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। (তিরমিযী শরীফ, খন্ড, পৃ. ১৭)

হযরত আনাস ইবনু মালিক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, কিয়ামতের আলামতসমূহের মধ্য থেকে কয়েকটি আলামত হচ্ছে, ইলম উঠে যাবে, মূর্খতা প্রসার ঘটবে, যিনা ব্যভিচার ও মদ্যপানের বিস্তার ঘটবে। নারী বৃদ্ধি পাবে ও পুরুষ কমে যাবে। এমনকি পঞ্চাশজন নারীর পরিচালক হবে একজন পুরুষ। (তিরমিযী শরীফ, খণ্ড, পৃ. ৪৮১)

বর্ণিত হাদীস শরীফদ্বয়ে মানবজাতির নৈতিক অবক্ষয়ের একটি চিত্র উপস্থাপিত হয়েছে। প্রথম হাদীসে মানব হত্যার মত জঘন্যতম অপরাধের বিষয়ে পরকালীন ভয়াবহ কঠোর শাস্তির কথা বিঘোষিত হয়েছে। পৃথিবীর দেশে দেশে ব্যক্তি স্বার্থে, দলীয় স্বার্থে, রাজনৈতিক স্বার্থে নিজেদের কর্তৃত্ব ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠা ও বিস্তার করতে মানব হত্যার মাধ্যমে সর্বত্র অন্যায় নৈরাজ্য, অরাজকতা, বিশৃঙ্খলা ও অপরাধ কর্মের ব্যাপকতা লাভ করে। দ্বিতীয় হাদীসে সত্যিকারের জ্ঞানীদের মৃত্যুর মাধ্যমে জ্ঞানের দৈন্যতা ইলম উঠে যাওয়া, সর্বত্র মূর্খতার সয়লাব, যিনা ব্যভিচারের অবাধ বিস্তার, মদ্যপানের আধিক্য, নারীদের সংখ্যাধিক্য, পুরুষের স্বল্পতা ইত্যাদি অবস্থার উদ্ভব ও এহেন পরিবেশ পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়াকে কিয়ামতের আলামত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

একজন ব্যক্তিকে হত্যা করা গোটা জাতিকে হত্যা করার শামিল : ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য বিনা বিচারে অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা করা, হিংসাত্মক মনোবৃত্তি চরিতার্থ করা, মানুষের মাঝে ভয়ভীতির সঞ্চার করা, চাঁদাবাজি করা, চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, ছিনতাই, ধর্ষণ, অপহরণসহ সকল অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে গণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন করা জঘন্যতম অপরাধের শামিল। এরশাদ হয়েছে,

হযরত আব্দুল্লাহ্‌ ইবনু আমর রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, একজন মুসলমান নিহত হওয়ার তুলনায় সমগ্র পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়া আল্লাহ্‌ তাআলার নিকট অতি তুচ্ছ। (তিরমিযী শরীফ, খণ্ড, পৃ. ১৬)

বেঁচে থাকার অধিকার মানুষের মৌলিক অধিকার : ইসলাম মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তার গ্যারান্টি দিয়েছে। ইসলামের শাশ্বত বিধান ও অনুপম আদর্শ আজ সর্বত্র উপেক্ষিত। আজ সমাজে রাষ্ট্রে নারীশিশু, কিশোর যে কোন পর্যায়ে তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে ফিতনাফ্যাসাদ, রক্তপাত, খুনখারাবী, হত্যাযজ্ঞ সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। পৃথিবীর দেশে দেশে ইসলামের শত্রু কাফির, মুশরিক, ইয়াহুদী, খৃষ্টানরা মুসলমানদেরকে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করার সকল নীল নকশা ও পরিকল্পনা একে একে বাস্তবায়ন করে চলছে, ইসরাইলী আগ্রাসন ও বর্বরতায় আজ মুসলমানদের প্রথম কিবলা বায়তুল মুকাদ্দাসের স্মৃতি বিজড়িত পুণ্যভূমি ফিলিস্তিন আজ রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত, প্রতিনিয়ত হাজার হাজার অসহায় নারীপুরুষ, শিশুদের জীবন বিপন্ন, গোটা গাজা ধ্বংসস্তুপে পরিণত। মুসলমান হওয়াটাই যেন আজ অপরাধ। প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত, কাশ্মীর, মায়ানমার আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি কোথাও আজ কারো জীবনের নিরাপত্তা নেই। গ্রাম গঞ্জে শহরে বন্দরে, লোকালয়ে প্রতিটি জনপদে, স্বজাতি ও বিজাতীয় কোন তারতম্য নেই পার্থক্য নেই, যে যাকে টার্গেট করেছে তাকে জীবন থেকে সরিয়ে দিচ্ছে। হত্যাযজ্ঞ আজ উৎসবে পরিণত হয়েছে। এটি কিয়ামতের আলামত। এরশাদ হয়েছে, হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু তাআলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত কিয়ামত অনুষ্ঠিত হবেনা, যতক্ষণ হারাজব্যাপকতা লাভ না করবে। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করেন, ‘হারাজকি? হে আল্লাহর রসূল! উত্তরে নবীজি বললেন, ‘হত্যা, হত্যা।‘ (মুসলিম শরীফ, খণ্ড, পৃ. ১৭০)

কিয়ামতের পূর্বে আলেমদেরকেও হত্যা করা হবে: আলেম সমাজ দ্বীনের প্রচারক, কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে তাকওয়া ভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্রগঠনে আলেম সমাজের ভূমিকা অপরিসীম। ইয়াহুদীনাসারাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে দ্বীনের আওয়াজকে স্তব্ধ করার প্রত্যয়ে হক্কানী আলেম ওলামাদের জান, মালও নিরাপদ হবে না, হক্কানী আলেম ওলামাদের হত্যা করতে তারা দ্বিধা করবে না। এরশাদ হয়েছে, “ (কিয়ামতের পূর্বে) মানুষের জন্য এমন একটি সময় উপস্থিত হবে, যখন আলেমদেরকেও কুকুরের মত হত্যা করা হবে। আহ! তখন ওলামাগণ নিজেদের নির্বুদ্ধিতার ভান করবে।” (জামিউল আহাদীস, খণ্ড২৩, পৃ. ৪৬৪)

যিনা ব্যভিচারের কঠোর শাস্তি : সমাজে শান্তি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও অপরাধমুক্ত করতে একটি ইনসাফভিত্তিক আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অপরাধীর বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান প্রবর্তন করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছে, ইসলাম ব্যভিচারীর বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান আরোপ করেছে। এরশাদ হয়েছে, হযরত আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, আল্লাহ ছাড়া আর কোন মাবুদ নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল, এরূপ সাক্ষ্যদানকারী কোন মুসলমানকে কেবল তিন অবস্থায় হত্যা করা বৈধ। প্রথমতঃ বিয়ে করার পর ব্যভিচারকারী, এ ক্ষেত্রে তাকে পাথর মেরে হত্যা করা হবে। দ্বিতীয়ত: যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধে (অর্থাৎ ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অথবা ইসলামের বিরুদ্ধে) বিদ্রোহ করে তাকে হত্যা করা হবে, শূলে চড়ানো হবে অথবা দেশ থেকে বিতাড়ন করা হবে। তৃতীয়তঃ যে ব্যক্তি কোন মানুষকে হত্যা করে এরূপ ব্যক্তিকে হত্যা করা হবে। (আবু দাউদ ও নাসায়ী)

যৌন অপকর্মের পথে যে যতটুকু অগ্রসর হয় ইসলামি আইন তার বেলায় ততটুকু কঠোর হয়। কোনো লোক অবৈধ পথে যৌন তৃপ্তি উপভোগ করতে থাকলে ইসলাম এমন লোককে রাষ্ট্র ও সমাজে জীবিত ও নিরাপদ থাকার যোগ্য মনে করেনা।

আল্লাহ আমাদেরকে কুরআন সুন্নাহর বিধান অনুসরণ করার তাওফিক দিন। আমীন।

লেখক : অধ্যক্ষ, মাদরাসাএ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রী), বন্দর, চট্টগ্রাম; খতীব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধআমাদের বিদ্যালয়গুলো কেন বাচ্চাদের খাপ খাইয়ে নিতে হিমশিম খায়?
পরবর্তী নিবন্ধবন্যার্তদের পাশে বিভিন্ন সংগঠন