জুম’আর খুতবা

অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভি | শুক্রবার , ১ মে, ২০২৬ at ৯:৫৮ পূর্বাহ্ণ

প্রিয় মুসলিম ভাইয়েরা!

আল্লাহ তা’আলাকে ভয় করুন, আল্লাহ প্রদত্ত জীবন বিধান মেনে চলুন। কুফর, শির্ক ও কুরআন সুন্নাহ বিরোধী কার্যকলাপ পরিহার করুন। জেনে রাখুন, শির্ক অমার্জনীয় অপরাধ। আল্লাহ তা’আলা শির্ক কখনো ক্ষমা করেন না। আল্লাহর নবীরাসূলগণ জমীনে আল্লাহর একত্ববাদ প্রতিষ্ঠার মহান দাওয়াতের মাধ্যমে পৃথিবীতে ন্যায় বিচার ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করেছেন। অন্যায় অবিচার পাপাচার মিথ্যাচার ও অনৈতিক কার্যক্রম সমূলে মূলোৎপাটনের লক্ষ্যে সমাজ সংস্কারকের গুরুদায়িত্ব পালন করেছেন। শান্তির সুমহান বানী প্রচার করে পরিশুদ্ধ ও আদর্শ সমাজ বিনির্মানে আল্লাহ প্রদত্ত অর্পিত দায়িত্ব পালনে পরিপূর্ণভাবে সফলতার সাক্ষর রেখেছেন। হযরত ইলইয়াস আলাইহিস সালাম আল্লাহর প্রেরিত রাসূলগণের অন্যতম।

হযরত ইলইয়াস আলাইহিস সালাম’র পরিচিতি: তাঁর নাম ও বংশ পরিচয়: তিনি হযরত ইলইয়াস ইবনে ইয়াসীন ইবনে বশীর ইবনে ফাখাস ইবনে গায়রার ইবনে হারুন আলাইহিস সালাম। তিনি হযরত মুসা (.)’র বহুকাল পরে আবির্ভূত হন। এটাই তাফসীরকারদের বিশুদ্ধ মত। সিরিয়ার একটি প্রসিদ্ধ শহরের নাম “বা আলাবাক” মূলত: বা’আল ওই শহরের প্রসিদ্ধ বৌত বা প্রতীমার নাম প্রতীমার নামানুসারে ঔই শহরকে “বা আলাবাক” নামকরণ করা হয়েছে, প্রতিমাটি স্বর্ণের নির্মিত ছিলো, যার দৈর্ঘ্য ছিল বিশ গজ। সেটার চোখের মধ্যে ইয়াকুত মূল্যবান পদ্মরাগ খচিত ছিলো। ওই মন্দিরে একশ পুজারী অবস্থান করতো। (কানযুল ঈমান ও তাফসীর নূরুল ইরফান, সূরা: সোয়াফফাত এর আয়াত: ১২৩১২৫ সংশ্লিষ্ট ব্যাখ্যা)

পবিত্র কুরআনের আলোকে হযরত ইলইয়াস (.)’র মর্যাদা ও দ্বীনি দাওয়াত: পবিত্র কুরআনে বর্ণিত নবী রাসূল আলাইহিমুস সালামদের মধ্যে হযরত ইলইয়াস () অন্যতম। সূরা আনআমের ৮৫ নং আয়াত ও সূরা সাফফাতের ১২৩ থেকে ১৩২ নং আয়াত গুলোতে হযরত ইলইয়াস ()’র মর্যাদা ও দ্বীনি দাওয়াতের কথা বর্ণিত হয়েছে। মুসা () ও হারুন () এর পরে প্রথম ইল্‌ইয়াস নবীর নাম পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। শামবাসীদের পূজিত দেবমূর্তির নাম ছিল বা’ল শামবাসীরা বা’ল মূর্তিকে উপাস্য ও দেবতা মনে করে পুজা করত। হযরত ইল্‌ইয়াস () এ পথভ্রষ্ট জাতির হেদায়তের জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন। তিনি তাদেরকে কুফরি ও শির্ক বর্জন করে একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, আসমান ও জমীনের মালিক বিশ্বজাহানের প্রতিপালক, মহান রাব্বুল আলামীনের ইবাদত করার দাওয়াত দিলেন। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে হযরত ইলইয়াস () সম্পর্কে এরশাদ করেছেন, এবং নিশ্চয় ইলইয়াস রসূলদের অন্যতম। স্মরণ করো যখন সে তার জাতিকে বলেছিল তোমরা কি ভয় করছো না? তোমরা কি বা’আল এর পূজা করছো, আর বর্জন করছো শ্রেষ্ঠ ও সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহকে। যিনি রব তোমাদের ও তোমাদের পূর্ববর্তী পিতৃপূরুষদের? অত:পর তারা তাকে অস্বীকার করলো। সুতরাং তারা অবশ্যই গ্রেফতার হয়ে আসবে, কিন্তু আল্লাহর মনোনীত বান্দাগণ (তাদের থেকে স্বতন্ত্র) এবং আমি পরবতীদের মধ্যে তার প্রশংসা স্থায়ী রেখেছি। শান্তি বর্ষিত হোক ইলইয়াসের উপর। নিশ্চয় আমি এভাবেই পুরুস্কৃত করি সৎকর্ম পরায়ণদেরকে নিশ্চয় সে আমার উন্নত মর্যাদাশীল পূর্ণ ঈমানদার বান্দাদের অন্তর্ভূক্ত। (সূরা: সোয়াফফাত, আয়াত: ১২৩১৩২)

ইলইয়াস ()’র দাওয়াত প্রত্যাত্থ্যান ও নবীকে হত্যার ষড়যন্ত্র: আল্লামা ইবনে কাছীর আদদিমাশকী (.) প্রণীত “ক্বাসাসুল আম্বিয়া” কিতাবে উল্লেখ হয়েছে, বনী ইসরাঈলের এক শাষক তাঁর নাম আখিয়াব ও তার প্রজাবৃন্দ বা’আল নাম প্রতিমার পূজা করতো, হযরত ইলইয়াস (.) তাদেরকে মূর্তি পূজা করতে নিষেধ করলেন একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করার আহবান করলেন।

দু’একজন ছাড়া কেউ আল্লাহর নবীর হেদায়তের প্রতি কর্ণপাত করলনা। নানা প্রতিকূলতা বিরোধিতা ও চক্রান্ত সত্বেও তিনি দাওয়াতি কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন। অবশেষে রাজা ও রানি তাঁকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করলো। আল্লাহর নবী ইলইয়াস () মু’জিযা প্রদর্শন করার ইচ্ছা পোষন করলেন এ লক্ষ্যে আল্লাহর নিকট দুর্ভিক্ষ নাযিলের জন্য প্রার্থনা করলেন। নবীর দুআ কবুল হয়ে গেলো দেশব্যাপী দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি হলো। আল্লাহর হুকুমে আল্লাহর নবী হযরত ইলইয়াস (.) সরাসরি বনী ইসরাঈলের রাজা আখিয়াবের দরবারে উপস্থিত হয়ে বললেন। আল্লাহর অবাধ্যতা নাফরমানি ও মূর্তি পূজার কারণেই এ দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি হয়েছে সকলে শির্ক বর্জন করলে মূর্তি পূজা ত্যাগ করলে আল্লাহর আযাব দুর্ভিক্ষ দূর হতে পারে। তোমরা বলে থাক তোমাদের বা’আল দেবতার নামে কুরবানি দিলে দুর্ভিক্ষ দূর হয়ে যাবে। আর আমিও একই উদ্দেশ্যে আমার আল্লাহর নামে কুরবানি পেশ করব আসমান থেকে আগুন এসে যার কুরবানি ভস্ম করে দেবে তার ধর্ম সত্য বলে গণ্য হবে। হযরত ইলইয়াস ()’র এ প্রস্তাব সবাই মেনে নিল সিদ্ধান্ত অনুসারী “কোহে কওমার” নামক পাহাড়ি উপত্যাকায় সকলে সমবেত হলো বা’আল দেবতার নামে তারা কুরবানি দিয়ে প্রার্থনা করলো আসমান থেকে কোনো আগুন নাযিল হলো না। অত:পর ইলইয়াস (.) আল্লাহর নামে কুরবানি করলেন যথাসময়ে আসমান থেকে আগুন এসে তা ভস্ম করে দিল। হযরত ইলইয়াস (.)’র পক্ষে আসমান থেকে আগুন এসে কুরবানি কবুল হওয়ার এ অভাবনীয় অলৌকিক দৃশ্য অবলোকন করে অনেকে সাথে সাথে আল্লাহর দরবারে সিজদাবনত হলো এবং ইলইয়াস (.) দাওয়াত কবুল করে নিল। সকলের নিকট আল্লাহর নবীর দ্বীনের সত্যতা স্পষ্টরূপে প্রমাণিত হলো, সৌভাগ্যবানরা ঈমান গ্রহণ করে ধন্য হলো, অভিশপ্ত পথভ্রষ্ট কতিপয় বা’আল দেবতার পুজারীরা নিজেদের হটকারিতা ও জিদের উপর অটল অবিচল থেকে নবীর হেদায়ত ও দ্বীনি দাওয়াতকে প্রত্যাত্থ্যন করলো। পরিশেষে আল্লাহর নবীর ভবিষৎ বাণী অনুযায়ী ধ্বংস প্রাপ্ত হলো।

হে আল্লাহ! আমাদেরকে নবী রাসূলগণের দ্বীনি শিক্ষা ও আদর্শ অনুসরণ করার তাওফিক নসীব করুন। আমীন।

লেখক : অধ্যক্ষ, মাদ্রাসা এ তৈয়বিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাজিল (ডিগ্রি), বন্দর;

খতিব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধমে দিবস ২০২৬ : বাংলাদেশের শ্রমিক শ্রেণির বিদ্যমান অবস্থা
পরবর্তী নিবন্ধরাউজানে সাইফুদ্দিন কাদের চৌধুরীর স্মরণসভা