পৃথিবীতে লেখাপড়ার চেয়ে পরিশ্রমের কাজ আর দ্বিতীয়টি আছে বলে মনে হয় না আনিসের। সকালে স্কুল, বিকালে প্রাইভেট, রাতে হোমওয়ার্ক। সারাক্ষণ শুধু পড়া আর পড়া! একটু যে নিজের মতো করে কাটাবে, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেবে– তার কোনো স্বাধীনতা নেই। আনিসের মাঝে মাঝে মনে হয়, এর চেয়ে কোনো মুদি দোকানে কাজ করা কিংবা বাসে হেলপারি করা অনেক ভালো। অন্তত দিনশেষে পকেটে নগদ টাকা তো জুটবে! যখন মন চাইল কাজ করল, না চাইল তো ঘুরে বেড়াল। কত্তো মজা! কবে যে লেখাপড়ার এই একঘেয়ে যন্ত্রণা থেকে মুক্তি মিলবে, তা শুধু আল্লাহই জানেন।
আর কয়েক মাস পরেই আনিসের এসএসসি পরীক্ষা। কিন্তু সদ্য শেষ হওয়া টেস্ট পরীক্ষার ফল খুব একটা আহামরি নয়। কোনোমতে টেনেটুনে পাশ করেছে সে। এই রেজাল্ট দেখে বাবা–মা ভীষণ রেগে আছেন।
পুকুর পাড়ের নির্জন জামতলায় বসে ভাবছে– পড়াশোনা কি তাকে দিয়ে আদৌ হবে? এমন সময় হঠাৎ আনিসের চোখ আটকে গেল মাটিতে। একটা ছোট্ট কালো পিঁপড়া তার নিজের শরীরের চেয়ে অন্তত পাঁচ গুণ ওজনের একটি মাছের কাঁটা পিঠে করে বয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। মাটির এবড়োথেবড়ো পথে একটু পর পর কাঁটাটি পিঠ থেকে পড়ে যাচ্ছে, কিন্তু পিঁপড়াটি দমে যাচ্ছে না। প্রতিবারই সে দ্বিগুণ উৎসাহে কাঁটাটি আবার তোলার চেষ্টা করছে।
বেশ কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকার পর আনিস আপন মনেই বলে উঠল, “কিরে ছোট্ট বন্ধু, এত কষ্ট করছিস কেন? এইটুকু শরীরে এত বড় বোঝা টানার কী দরকার? একটু জিরিয়ে নে না!”
অবাক কাণ্ড! আনিসের কথার জবাবে পিঁপড়াটি যেন থমকে দাঁড়াল। তারপর বেশ স্পষ্ট ভাষাতেই বলে উঠল, “আমাদের কি জিরানোর সময় আছে ভাইয়া? সামনে বর্ষাকাল। এখনই যদি আমরা দিনরাত পরিশ্রম করে খাবার জমিয়ে না রাখি, তবে বৃষ্টির দিনে পুরো পরিবারকে না খেয়েই মরতে হবে।”
আনিস চমকে গেলেও কৌতূহল সামলাতে পারল না। বলল, “তা বলে নিজের চেয়ে পাঁচ গুণ ওজনের বোঝা টানতে হবে? পারছিস না, তাও বারবার চেষ্টা করছিস! আমার তো তোদের মতো খাটুনি নেই, শুধু সারাদিন টেবিলে বসে পড়তে হয়, তাতেই আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। ভাবছি এসব ছেড়েছুড়ে কোনো কাজে লেগে যাব, স্বাধীনভাবে বাঁচব।”
পিঁপড়াটি তার ছোট্ট মাথাটি নাড়ল। তারপর বেশ শান্ত গলায় বলল, “তুমি যাকে স্বাধীনতা আর মজা ভাবছ, তা আসলে সাময়িক। তুমি যে বাস হেলপারি বা মুদি দোকানে কাজের কথা বলছ, সেখানে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে হাড়ভাঙা শারীরিক পরিশ্রম করতে হয়। দিনশেষে যে সামান্য টাকা মেলে, তা দিয়ে ভবিষ্যতের কোনো নিশ্চয়তা থাকে না। অথচ তোমার বাবা–মা তোমার সব দায়িত্ব নিচ্ছেন, শুধু তোমার একটি সুন্দর ও নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য।”
আনিস চুপ করে শুনল। পিঁপড়াটি আবার বলতে লাগল, “আমাদের দিকে তাকিয়ে দেখো। আমরা বেঁচে থাকার জন্য প্রতিদিন প্রকৃতির সাথে সংগ্রাম করি। আমাদের কোনো কাজই সহজ নয়। কিন্তু আমরা কখনো হাল ছাড়ি না। অসাধ্য সাধন করার পেছনে আমাদের মূল শক্তি হলো– কঠোর পরিশ্রম, একতা এবং শৃঙ্খলা। আমরা একা বাঁচি না, সবাই মিলে নিয়ম মেনে একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করি। একবার পড়ে গেলে দশবার উঠে দাঁড়াই। কোনো কাজকেই আমরা ভয় পাই না।”
পিঁপড়ার এই কয়েকটি কথা আনিসের মনের ভেতরে যেন বিদ্যুতের মতো খেলে গেল। সে গভীরভাবে উপলব্ধি করল, এই সামান্য একটা ছোট্ট কীট যদি নিজের ও পরিবারের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য এত কষ্ট সহ্য করতে পারে, শতবার ব্যর্থ হয়েও হাল না ছাড়ে, তবে সৃষ্টির সেরা জীব হয়ে সে কেন সামান্য পড়াশোনার ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে? পড়াশোনা তো কোনো শাস্তি নয়, এটি তার নিজের জীবনকে গড়ে তোলার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
আনিস দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার চোখ থেকে ভয়ের মেঘ কেটে গেল। সে পিঁপড়াটিকে মনে মনে ধন্যবাদ জানিয়ে সোজা বাড়ির দিকে রওনা হলো। প্রতিজ্ঞা করল, আর কখনো ফাঁকিবাজি করবে না। সেই দিন থেকেই আনিসের রুটিন বদলে গেল। গভীর মনোযোগে দিনরাত এক করে পড়তে শুরু করল। কোনো পড়া কঠিন মনে হলে হাল না ছেড়ে বারবার চেষ্টা করতে লাগল। দেখতে দেখতে কয়েক মাস কেটে গেল। অনুষ্ঠিত হলো আনিসের এসএসসি পরীক্ষা।
যেদিন পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হলো, সেদিন আনিসদের বাড়িতে খুশির বন্যা বয়ে গেল। সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়ে আনিস জিপিএ–৫ পেয়েছে! যে ছেলে টেস্ট পরীক্ষায় টেনেটুনে পাশ করেছিল, তার এই অবিশ্বাস্য সাফল্যে পরিবার, শিক্ষক এবং স্বজনরা আনন্দে আত্মহারা।
সবাই যখন আনিসের প্রশংসায় পঞ্চমুখ, আনিস তখন জানালার বাইরে তাকিয়ে হাসল। তার মনে পড়ে গেল পুকুর পাড়ের সেই ছোট্ট পরিশ্রমী পিঁপড়াটির কথা, যার জীবনসংগ্রাম তাকে শিখিয়েছিল– পরিশ্রম আর আত্মবিশ্বাস থাকলে পৃথিবীতে কোনো কিছুই অসাধ্য নয়।







