চট্টগ্রাম দেশের প্রধান বাণিজ্যিক ও শিল্পাঞ্চল হলেও কৃষি এখনো এ অঞ্চলের খাদ্য ও জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। চট্টগ্রামের কৃষি বেশ বৈচিত্র্যময়। এ অঞ্চলের বর্ধিঞ্চু জনসংখ্যার খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষিখাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কৃষি জমি কমলেও খাদ্য উৎপাদন বাড়ছে। প্রযুক্তির সুবাধে মানুষ সারাবছর হরেকরকম ফলমুল ও শাকসব্জী পাচ্ছে। সামগ্রিকভাবে কৃষির অগ্রগতি বেশ দৃশ্যমান। ২০২১ সালে দৈনিক আজাদীতে লেখকের প্রকাশিত “চট্টগ্রাম অঞ্চলের কৃষি : বর্তমান ও ভবিষ্যৎ” এবং ৩ অক্টোবর ২০২৬–এর দৈনিক পূর্বকোণের প্রতিবেদনে স্পষ্ট হয় যে, ধান উৎপাদনে প্রযুক্তি, আবাদ সমপ্রসারণ ও ফলনে অগ্রগতি হয়েছে, কিন্তু নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও জনসংখ্যার চাপের কারণে কৃষিজমি কমেছে এবং চট্টগ্রাম জেলা ক্রমেই খাদ্যঘাটতি নির্ভর রয়েছে।
সূত্রমতে, ১৯৯৭ সালের কৃষি জরিপে চট্টগ্রামে ফসলি জমির পরিমাণ ছিল প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর; এর মধ্যে চাষাবাদের আওতায় ছিল প্রায় ২ লাখ ২৪ হাজার হেক্টর। ২০১০ সালে ফসলি জমি কমে ২ লাখ ১১ হাজার ২০৫ হেক্টরে এবং ২০২০ সালে ২ লাখ ৭ হাজার ৬৭২ হেক্টরে দাঁড়ায়। অর্থাৎ ১৯৯৭ থেকে ২০২০ পর্যন্ত ফসলি জমি কমেছে প্রায় ৭২ হাজার ৩২৮ হেক্টর, আর ২০১০ থেকে ২০২০ পর্যন্ত কমেছে ৩ হাজার ৫৩৩ হেক্টর। দৈনিক পূর্বকোণের ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে চলতি আমন মৌসুমে আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৮৬ হাজার ১৯০ হেক্টর; ২০২০–২১ মৌসুমের ১ লাখ ৮৫ হাজার ৩৪০ হেক্টরের তুলনায় এটি ৮৫০ হেক্টর বেশি। তবে এটি আমন আবাদ, মোট ফসলি জমি নয়।
ধান উৎপাদনে অগ্রগতির দৃষ্টান্ত আরও স্পষ্ট। ২০২১ সালের লেখায় ২০২০–২১ মৌসুমে চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চলে বোরো আবাদ ২ লাখ ৬৯ হাজার ৩ হেক্টর, রোপা আউশ ১ লাখ ২৩ হাজার ৮৭৮ হেক্টর এবং আমন ৫ লাখ ৭৪ হাজার ৪৭৩ হেক্টরের তথ্য দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বোরো উৎপাদন দ্রুত বেড়েছে। কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে ২০২৫ সালের বণিক বার্তা জানায়, ২০২৪–২৫ মৌসুমে পাঁচ জেলার বোরো আবাদ ২ লাখ ৯৮ হাজার ৬৫৮ হেক্টর এবং চাল উৎপাদন ১২ লাখ ৯৭ হাজার ৫৫৬ টন। ২০২০–২১–এর ১০ লাখ ৮০ হাজার ২৮৫ টনের তুলনায় উৎপাদন বেড়েছে ২ লাখ ১৭ হাজার ২৭১ টন, অর্থাৎ প্রায় ২০ শতাংশ। ২০১২–১৩ সালের ৮ লাখ ৮৪ হাজার ৫৬৯ টনের তুলনায় ২০২৪–২৫–এ বৃদ্ধি প্রায় ৪ লাখ ১২ হাজার ৯৮৭ টন। আধুনিক জাত, হাইব্রিড ধান, অনাবাদি জমি চাষের আওতায় আনা, কৃষক প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি ব্যবহারের সুফল এখানে দৃশ্যমান।
তবে উৎপাদন বৃদ্ধির অর্থ খাদ্য উদ্বৃত্ত হওয়া নয়। ২০২১ সালের লেখায় বলা হয়েছিল, চট্টগ্রাম জেলা ছাড়া অন্য চার জেলা কক্সবাজার, ফেনী, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর খাদ্য উদ্বৃত্ত থাকলেও নগরকেন্দ্রিক অতিরিক্ত চাহিদার কারণে চট্টগ্রাম জেলা খাদ্যঘাটতিতে থাকে। বর্তমান চিত্র আরও স্পষ্ট। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে চট্টগ্রাম জেলায় খাদ্যের বার্ষিক চাহিদা ছিল ১৬ লাখ ২০ হাজার ৬৩৩ টন, বিপরীতে স্থানীয় উৎপাদন ৮ লাখ ৭৮ হাজার ৯৩৫ টন; ঘাটতি ৭ লাখ ৪১ হাজার ৬৯৮ টন। অর্থাৎ চাহিদার মাত্র ৪৮ শতাংশ স্থানীয় উৎপাদনে পূরণ হয়েছে এবং ৫২ শতাংশ অন্য জেলা থেকে আনতে হয়েছে। কৃষি জমি কমার পাশাপাশি দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, আবাসন, শিল্পকারখানা, সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো খাদ্যঘাটতি বাড়ানোর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে।
৩ অক্টোবর ২০২৬–এর প্রতিবেদনে কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত চট্টগ্রামে সরকারি–বেসরকারিভাবে ১ হাজার ২৬৮ দশমিক ৪৯ টন চাল এবং ৭৩৩৩ দশমিক ৫৯ টন গম আমদানি হয়েছে। একই সময়ে স্থানীয় উৎপাদনের সীমাবদ্ধতা পূরণে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকেও চাল সংগ্রহ করে চট্টগ্রামে সরবরাহ করতে হয়েছে। ফলে চট্টগ্রামের বর্তমান খাদ্য পরিস্থিতিকে উদ্বৃত্ত নয়, বরং উল্লেখযোগ্য খাদ্যঘাটতিপ্রবণ বলা যায়। তবে পাঁচ জেলার সমগ্র চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চল এবং শুধু চট্টগ্রাম জেলা–এই দুই ভৌগোলিক একক আলাদা; তাই জেলার ঘাটতিকে পুরো অঞ্চলের ঘাটতি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
২০২১ সালের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ ছিল, বোরো, আউশ ও আমনের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি ফসল সংগ্রহ ও সংরক্ষণে অপচয় কমানো জরুরি। সেখানে ধান উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে ১৮–২০ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতির কথা বলা হয়েছিল। বর্তমান বাস্তবতায় এ বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জমি কমে গেলে শুধু নতুন জমি খুঁজে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব নয়; একই জমি থেকে বেশি উৎপাদন এবং উৎপাদিত খাদ্যের সর্বনিম্ন অপচয় নিশ্চিত করাই কার্যকর পথ। তাই প্রযুক্তি সমপ্রসারণের পাশাপাশি ধান শুকানো, আধুনিক গুদাম, বায়ুরোধী সংরক্ষণ, যান্ত্রিক মাড়াই ও সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে কৃষি–ভিত্তিক শিল্প ও মূল্য সংযোজন তথা ভ্যালু চেইন গড়ে তুললে কৃষকের আয় বাড়বে এবং কৃষিজমি অন্য কাজে চলে যাওয়ার প্রবণতাও কিছুটা কমানো সম্ভব। বিশেষ করে নগরীর নিকটবর্তী কৃষিজমিতে উচ্চমূল্যের নিরাপদ সবজি, ফল ও মসলা উৎপাদন, সংরক্ষণ এবং দ্রুত পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুললে একই জমিতে বেশি অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি হবে। দীর্ঘমেয়াদে এবং কৃষকের বাজারঝুঁকি কমবে।
ধানের পাশাপাশি সবজি, ডাল, তেলবীজ, ভুট্টা, ফল ও মসলা উৎপাদনে তুলনামূলক সুবিধা কাজে লাগানো দরকার। নোয়াখালী–লক্ষ্মীপুরে সয়াবিন ও তেলবীজ, চট্টগ্রামে সবজি ও ফল, উপকূলে লবণসহিষ্ণু ফসল এবং পাহাড়ি এলাকায় ফল ও মসলা–এভাবে কৃষি অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনা করা যেতে পারে। উৎপাদনের সঙ্গে বাজার, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও নিরাপদ খাদ্যমানের সংযোগ বাড়াতে হবে। কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে চুক্তিভিত্তিক চাষ, কৃষক সংগঠন শক্তিশালীকরণ, সংগ্রহকেন্দ্র ও সরাসরি বাজার সংযোগ শক্তিশালী করা খুব জরুরি।
এ অবস্থায় প্রথম করণীয় হলো কৃষিজমি সুরক্ষা। পরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও অবকাঠামো নির্মাণে কৃষিজমি ব্যবহারের কঠোর নিয়ন্ত্রণ, জলাবদ্ধ জমির পানি নিষ্কাশন এবং পতিত জমি পুনরায় চাষের আওতায় আনা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে অঞ্চলভিত্তিক তিন ফসলি ও বহুমুখী ফসল বিন্যাস সমপ্রসারণ করতে হবে। লাভজনক শস্য পর্যায় চিহ্নিত করে তা দ্রূত বিস্তার ঘটাতে হবে, তৃতীয়ত, সেচ, যান্ত্রিকীকরণ, উন্নত বীজ, জলবায়ুসহিষ্ণু জাত এবং কৃষি প্রযুক্তি দ্রুত মাঠে পৌঁছাতে হবে। বিশেষ করে লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা, খরা ও পাহাড়ি ঢলের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় স্থানভিত্তিক প্রযুক্তি অপরিহার্য। তবে সামগ্রিক উৎপাদন বাড়াতে কৃষক পর্যায়ে সঠিক সময়ে সঠিক পরিমান সার সঠিক দামে প্রাপ্তি নিশ্চিত করা জরুরি।
সবশেষে গবেষণা, সমপ্রসারণ ও কৃষকের মধ্যে কার্যকর সংযোগই হবে টেকসই অগ্রগতির ভিত্তি। চট্টগ্রামের কৃষি জমি সীমিত হলেও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সুযোগ যথেষ্ট। তাই জমি রক্ষা, পতিত জমির ব্যবহার, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, ফসল বহুমুখীকরণ, দক্ষ বাজারব্যবস্থা এবং খাদ্য সংরক্ষণ– এই সমন্বিত কৌশল বাস্তবায়ন করা গেলে একদিকে খাদ্যঘাটতি কমবে, অন্যদিকে চট্টগ্রামের কৃষি আরও লাভজনক, প্রতিযোগিতামূলক ও জলবায়ুসহিষ্ণু হয়ে উঠবে।
লেখক: প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বারি। সাবেক ন্যাশনাল কনসালটেন্ট, এফএও, জাতিসংঘ।












