অভিযানেও চট্টগ্রামে বন্ধ হচ্ছে না খাদ্যে ভেজাল ও অসাধু কারবার। হোটেল–রেস্টুরেন্ট থেকে শুরু করে ফাস্টফুড এবং খাবার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান গুলোতে দেদারসে বিক্রি করা হচ্ছে ক্ষতিকর রঙ ও রাসায়নিক মেশানো খাবার। এমনকি মেজবান থেকে শুরু করে প্রাত্যহিক খাবারের পাতে যে মাছ, মাংস আর শুঁটকি উঠছে, তার একটি বড় অংশই অনিরাপদ। বাদ যাচ্ছে না ডাল, মরিচ–মসলা ও হলুদের গুঁড়োও। এই সময়ের শিশু–কিশোরদের জনপ্রিয় ফাস্ট ফুড আইটেম বার্গার ও স্যান্ডউইচ, পিৎজা, রোল ও শর্মা, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই ও ফ্রাইড চিকেন, মুচমুচে ও ভাজাপোড়া খাবার। এসব খাবারে ব্যবহার করা হচ্ছে ক্ষতিকর রঙ ও কেমিক্যাল। সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম মহানগরীতে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও জাতীয় ভোক্তা অধিদপ্তরের নিয়মিত অভিযানে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলছে।
গত শনিবার চাক্তাইয়ের জসিম মশলা মিলে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের অভিযানে কাঠের গুঁড়ো মিশ্রণপূর্বক মশলা প্রস্তুত, মশলা প্রস্তুতে অননুমোদিত রঙয়ের ব্যবহার, নোংরা–পচা মরিচের গুঁড়ো বাজারে বিক্রির বিষয়টি হাতে নাতে ধরা পড়েছে। এসময় সংশ্লিষ্ট মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দায়ের এবং একজন আসামি গ্রেফতার হয় বলে জানান বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের মেট্রোপলিটন নিরাপদ খাদ্য অফিসার মোহাম্মদ ফারহান ইসলাম।
এদিকে নগরীতে ভোক্তা অধিকারের নিয়মিত অভিযানে ধরা পড়ছে মরিচের গুঁড়োর সাথে মেশানো হচ্ছে ক্ষতিকর ট্রেঙটাইলের রঙ। খাবার হোটেলে পচা–বাসি খাবারের পাশাপাশি ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য মিশিয়ে বিক্রির বিষয়টি। খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান গুলোতে অভিযানে দেখা যাচ্ছে পোড়া–বাসি তেল, ক্ষতিকর রঙ এবং কেমিক্যাল দিয়ে তৈরি হচ্ছে প্রায় খাবার।
জাতীয় ভোক্তা–অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপপরিচালক মোহাম্মদ ফয়েজ উল্যাহ বলেন, খাবারের ভেজাল রোধে নিয়মিত অভিযান চলছে। তারপরও ভেজাল রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। এক–দুইবার অভিযানের পর অনেক প্রতিষ্ঠান সংশোধন করে নিচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে আমরা বারবার অভিযান করছি। যাতে তারা খাবারের মান ভালো করে। মানুষের খাবারের যদি ঠিক থাকে–তাহলে স্বাস্থ্য অনেক ভালো থাকবে। নগরীর বৃহৎ পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ, চাক্তাই এবং রেয়াজুদ্দিন বাজারে সমপ্রতি এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী চাল, ডাল, মসলা থেকে শুরু করে শুঁটকি ও মাছে অবাধে মেশাচ্ছেন বিষাক্ত টেঙটাইল রঙ, ইউরিয়া এবং ক্যান্সার সৃষ্টিকারী প্রিজারভেটিভ।
মসলায় কাপড়ের রঙ, মাছে ফরমালিন : চাক্তাই ও খাতুনগঞ্জের কয়েকটি মসলা ভাঙানোর মিলে (রাইস মিল) গিয়ে দেখা যায়, মরিচ ও হলুদের গুঁড়োকে আকর্ষণীয় ও গাঢ় লাল–হলুদ করতে কাপড়ে ব্যবহৃত বিষাক্ত রঙ মেশানো হচ্ছে। সাধারণ চোখ দিয়ে এই ভেজাল ধরা প্রায় অসম্ভব। অন্যদিকে, রেয়াজুদ্দিন বাজারে দূর–দূরান্ত থেকে আসা মাছ তাজা দেখাতে এবং শুঁটকিকে পোকার হাত থেকে বাঁচাতে ব্যবহার করা হচ্ছে এক ধরনের বিষাক্ত তরল কেমিক্যাল ও অতিরিক্ত ইউরিয়া।
কেন এই ভেজাল : নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খাতুনগঞ্জের রাউজানের এক আড়তদার জানান, বেশি লাভের আশায় এবং পণ্য দীর্ঘদিন পচনমুক্ত রাখতে কিছু ব্যবসায়ী এই কাজ করছেন। বিশেষ করে শুঁটকিতে রাসায়নিক না দিলে বর্ষা বা স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় পোকা ধরে যায়। আর মসলায় রঙ না দিলে ক্রেতারা ফ্যাকাশে মসলা কিনতে চান না।
স্বাস্থ্যঝুঁকি : ঘরে ঘরে বাড়ছে ক্যান্সার ও লিভারের রোগ : খাবারে এই ভেজালের সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের শরীরে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের চিকিৎসকদের মতে, গত কয়েক বছরে চট্টগ্রাম লিভার সিরোসিস, কিডনি বিকল এবং পাকস্থলীর ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। চিকিৎসকেরা বলছেন, খাদ্যে ব্যবহৃত এই টেঙটাইল প্রেড রঙ ও প্রিজারভেটিভ মানুষের পরিপাকতন্ত্রকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করে দিচ্ছে।
ভোক্তাদের ক্ষোভ ও অসহায়ত্ব : নগরীর জামালখানে একটি খাবারের দোকানে স্কুলের শিশুর জন্য টিফিন নিতে আসা গৃহিণী নার্গিস আক্তার ও শেফু বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বাজার থেকে ভালো জিনিস কেনার কোনো উপায় নেই। বেশি দাম দিয়েও আমরা পরিবারকে বিষ খাওয়াচ্ছি। প্রশাসন মাঝেমধ্যে জরিমানা করে, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।
ফলের বাজারে চিত্র ভয়াবহ : চাকচিক্য ফলের বাজারে দেরদারসে বিক্রি হচ্ছে বিষাক্ত কলা থেকে শুরু করে লোভনীয় সব ফল। শিশু–কিশোর থেকে শুরু করে সব বয়েসী মানুষের প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় কলা অন্যতম। এসব কলায় মেশানো হচ্ছে ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য। একই অবস্থা সব ফলের বাজারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ : চট্টগ্রামের সচেতন মহল মনে করেন, শুধু উৎসব–পার্বনে বা মাঝেমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে এই নীরব ঘাতক রোধ করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন নিয়মিত ও কঠোর তদারকি। খাতুনগঞ্জ ও চাক্তাইয়ের মতো বড় পাইকারি পয়েন্টগুলোতে স্থায়ী ‘ফুড টেস্টিং ল্যাব’ স্থাপন করা জরুরি। একই সাথে ভেজালকারী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কেবল জরিমানা নয়, সর্বোচ্চ শাস্তিমূলক আইন প্রয়োগের মাধ্যমে চট্টগ্রামে কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান সাধারণ ভোক্তারা।













