কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। এই করোনা মহামারিতেও কৃষি প্রধান বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা বেশ ভালোভাবেই সচল ছিল। আর কৃষির বহুমুখীকরণের মাধ্যমেই অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখা সম্ভব হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। তাঁরা বলেন, প্রচলিত কৃষি কাজের বাইরে অর্থাৎ ধান–পাট এসব চাষের বাইরে কৃষির বিভিন্ন উপখাত যেমন, মৎস্য চাষ, হাঁস–মুরগীর খামার, পশু পালন, দুগ্ধ খামার, বছরব্যাপী সবজি ও ফলের চাষে ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। এতে যেমন বহু বেকারের কর্ম সংস্থান হয়েছে তেমনি গ্রামীণ অর্থনীতিও বেশ চাঙ্গা হয়েছে। ঈদকে সামনে রেখে চাঙা হয়ে উঠেছে গ্রামীণ অর্থনীতি। এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে ১৯ মে দৈনিক আজাদীতে। এতে বলা হয়েছে, পবিত্র জিলহজ্ব মাসের চাঁদ দেখা গেছে। দুয়ারে কড়া নাড়ছে ঈদ। কোরবানির পশুর বাজারের পাশাপাশি মসলাপাতিসহ বিভিন্ন বিকিকিনিকে কেন্দ্র করে বাজারে টাকার প্রবাহ বেড়েছে। মফস্বল থেকে থানা সদর পর্যন্ত সর্বত্রই গরু বাজারের পাশাপাশি নানা পণ্যের জমজমাট ব্যবসা চলছে। বেশ কিছুদিন ধরে অনেকটা থমকে থাকা গ্রামীণ অর্থনীতিতে চাঙাভাব পরিলক্ষিত হতে শুরু করেছে। থানা সদর এবং গ্রামের বাজারগুলোতে লোকজনের উপস্থিতি এবং দোকানে দোকানে বেচাবিক্রি বেড়েছে। গরু বাজারের পাশাপাশি অন্যান্য দোকানপাটও বেশ সরগরম থাকছে।
স্থানীয় সূত্রগুলো বলেছে, প্রচুর ক্রেতা বাজারে আসা যাওয়ায় ব্যবহার করছেন নানা পরিবহন। যা পরিবহন খাতে গতিশীলতা তৈরি করেছে। গরু ছাগল কেনাবেচা ও পরিবহন বেড়েছে। সবকিছু মিলে বাজারে টাকার যোগান বেড়েছে, প্রচুর টাকা হাতবদল হচ্ছে। যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে আলাদা একটি মাত্রা দিতে শুরু করেছে। চট্টগ্রাম বিভাগের গ্রামীণ অর্থনীতি অনেকটা কৃষি, চাকরি এবং রেমিটেন্স নির্ভর। আর উপরোক্ত প্রত্যেকটি খাতে কোরবানের সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে। যারা চাকরি করছেন তারা ঈদ বোনাস পাবেন, কৃষিতে শাক সবজির পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ফলমূলের ফলন ফলেছে। যা বিক্রি করে কৃষকের হাতে টাকা আসছে। যে টাকা হাত ঘুরে বাজারে খরচ হচ্ছে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বর্তমানে প্রায় ৫১ লাখ বাংলাদেশি নাগরিক বৈধভাবে বসবাস করেন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগের নাগরিকের সংখ্যা প্রায় ২১ লাখ বলে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সামপ্রতিক তথ্যে জানা গেছে। দেশের প্রবাসী পরিবারের অন্তত ৩৫ শতাংশের বসবাস চট্টগ্রাম বিভাগে। যাদের কাছে প্রবাসীরা নিয়মিত টাকা পয়সা পাঠিয়ে থাকেন। কোরবানকে সামনে রেখে টাকা পাঠানোর প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট এলাকার ব্যাংকগুলোর শাখা ব্যবস্থাপকেরা জানান। তাঁরা বলেন, প্রচুর টাকা পয়সা প্রবাসীরা পাঠাচ্ছেন। এখানে পরিবার পরিজন তা তুলে নিয়ে বাজার সদাইও করছেন। যা স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙা করে তুলছে বলেও সূত্রগুলো মন্তব্য করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রেমিট্যান্সের ব্যবহার নিয়ে অনেকে চিন্তিত হলেও তার কোনো কারণ নেই। কেননা যারা এ অর্থ হাতে পান, তারা জানেন কোথায় তা খরচ করতে হবে। অনেকেই রেমিট্যান্সের অর্থ দিয়ে পাকা বাড়ি নির্মাণ করছেন। বাড়ি সামাজিক ও অর্থনৈতিক মানদণ্ড বাড়ায়। পাকা পায়খানা তৈরি করছেন অনেকে। তারা তাদের ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠাচ্ছেন। চিকিৎসা খরচ মেটাচ্ছেন। এগুলো তারা করবেন। কোনোটিই অপ্রয়োজনীয় নয়। তারা অর্থনীতিতে চাহিদা সৃষ্টি করছেন। বিনোদনের চাহিদাও মেটাচ্ছেন। টিভি কিনছেন। এগুলো তারা করতেই পারেন। পণ্য ও সেবা উৎপাদন করা হয় ভোগের জন্যই। এতে অর্থনীতিই গতিশীল হয়। এক্ষেত্রে সরকারি প্রচেষ্টা হবে– কীভাবে বিদেশে আরো কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যায় এবং অদক্ষ শ্রমিকদের দক্ষ হিসেবে গড়ে তোলা যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিদেশ থেকে আসা বাংলাদেশিদের রেমিট্যান্স জাতীয় অর্থনীতি ও উন্নয়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পের পরেই এর অবস্থান। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের বার্ষিক রেমিট্যান্স এর পরিমাণ ২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি, যা দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের চাবিকাঠি। গ্রামীণ এলাকায় স্থানীয় অবকাঠামোগত উন্নয়নকে সক্ষম করার পাশাপাশি, দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স ক্ষুদ্র শিল্প এবং অন্যান্য আয়বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রম তৈরিতে সহায়তা করছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তাদের রেমিট্যান্স আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং টেকসই উন্নয়নের সুযোগসৃষ্টিতে সহায়তা করছে। তাই অর্থনীতির এই নড়বড়ে অবস্থা থেকে মুক্ত করতে গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালীকরণ ও দক্ষ জনশক্তির বিকল্প নেই।







