ক্যান্সার রোগ নিয়ন্ত্রণ : প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা করার গুরুত্ব অনেক বেশি

| বুধবার , ১ জুলাই, ২০২৬ at ৫:৫৪ পূর্বাহ্ণ

দেশে প্রতিবছর প্রায় ৯ হাজার নারী জরায়ুমুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন। সময়মতো রোগ শনাক্ত না হওয়া এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভাবে তাদের প্রায় অর্ধেকেরই মৃত্যু হচ্ছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস (এইচপিভি) প্রতিরোধে টিকাদান, স্ক্রিনিং, গবেষণা এবং জনসচেতনতা কার্যক্রম আরো সমপ্রসারণের আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে ১১ থেকে ২১ বছর বয়সী ছেলে ও মেয়ে উভয়কেই এইচপিভি টিকার আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। গত ২৯ জুন রাজধানীর শাহবাগে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে ইন্টারন্যাশনাল প্যাপিলোমাভাইরাস সোসাইটি (আইপিভিএস) বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে আইপিভিএস বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের লিড অধ্যাপক ডা. আশরাফুন্নেছা বলেন, এইচপিভি বিশ্বের সবচেয়ে সাধারণ যৌনবাহিত সংক্রমণগুলোর একটি। এই ভাইরাসটির ২০০টিরও বেশি ধরন রয়েছে, যার মধ্যে ১৪টি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এবং ক্যান্সার সৃষ্টিকারী। বিশেষ করে এইচপিভি১৬ ও এইচপিভি১৮ জরায়ুমুখের ক্যান্সারের প্রায় ৭১ শতাংশের জন্য দায়ী। এ ছাড়া এই ভাইরাস পায়ুপথ, মুখগহ্বর, যোনিপথ ও পুরুষাঙ্গের ক্যান্সারের সঙ্গেও জড়িত। তিনি দেশের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে জানান, বাংলাদেশে সাধারণ নারীদের মধ্যে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এইচপিভির প্রাদুর্ভাব ৪ দশমিক ২ শতাংশ। তবে উপকূলীয় এলাকায় এ হার ২ দশমিক ৫৬ শতাংশ এবং হাসপাতালভিত্তিক গবেষণায় শহর ও গ্রামের নারীদের মধ্যে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ সংক্রমণ পাওয়া গেছে। জরায়ুমুখের ক্যান্সার প্রতিরোধে সরকারের বর্তমান উদ্যোগের প্রশংসা করে ডা. আশরাফুন্নেছা বলেন, বর্তমানে স্কুলের পঞ্চম থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং কমিউনিটির ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী মেয়েদের এক ডোজ এইচপিভি টিকা দেওয়া হচ্ছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এই কর্মসূচির আওতায় ৮৮ দশমিক ৭ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রাভুক্ত কিশোরীকে আনা সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি দেশে বর্তমানে ৬০১টি ভিআইএ (ভিজ্যুয়াল ইনস্পেকশন উইথ অ্যাসিটিক অ্যাসিড) কেন্দ্র এবং ৫২টি কল্পোস্কোপি ক্লিনিকের মাধ্যমে স্ক্রিনিং সেবা দেওয়া হচ্ছে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সাকেরা আহমেদ বলেছেন, স্তন ক্যান্সারের বিভিন্ন রকম চিকিৎসা পদ্ধতি রয়েছে। যেমন সার্জারি, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, হরমোন থেরাপি, ইমিউনো থেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি এবং অন্যান্য। সার্জারি আবার বিভিন্ন রকম হতে পারে, পুরো ব্রেস্ট কেটে যেমন অপারেশন করা যায় তেমনি পুরো ব্রেস্ট না কেটে শুধুমাত্র গোটা বা চাকা কেটেও অপারেশন করা যায় এবং এই পদ্ধতিই এখন বেশি প্রচলিত। কেননা তাতে রোগীর শারীরিক ও মানসিক দুদিক থেকেই উপকার হয়। যদিও মনে হতে পারে পুরো ব্রেস্ট কেটে না ফেলাতে ক্যান্সার আবারও হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে, কিন্তুু গবেষণামতে দুই পদ্ধতিতেই পুনরায় হওয়ার সম্ভাবনায় উল্লেখ্যযোগ্য কোনো পার্থক্য হয় না। তবে ব্রেস্ট রেখে অপারেশন করলে রেডিও থেরাপি অবশ্যই দিতে হয়। অপারেশন পরবর্তী ব্রেস্টের সৌন্দর্য্য রক্ষার্থে প্লাস্টিক সার্জারিও করা যায়। তবে এরকম চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, স্তন ক্যান্সারের পরিপূর্ণ চিকিৎসা বাংলাদেশে হয়। সার্জারি, কেমোথেরাপি, রেডিয়েশন থেরাপি ও হরমোন থেরাপি মাধ্যমে মূলত স্তন ক্যান্সারের চিকিৎসা করা হয়। তবে একজন রোগীর সব সময় এসব ব্যবস্থার দরকার হয় না। যেমন রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলে কেবল অপারেশনের মাধ্যমেই নিরাময় করা যায় এবং ক্ষেত্রবিশেষে রেডিয়েশন ও কেমোথেরাপি এড়ানো যায়। যার কারণে চিকিৎসাজনিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও কম হয়। অতএব ক্যান্সার রোগ নিয়ন্ত্রণে প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা করার গুরুত্ব অনেক বেশি। অধিকন্তু স্তন ক্যান্সার অ্যাডভান্স পর্যায়ে শনাক্ত হলেও অনেক রোগী পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যায়। তবে এক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের সঙ্গে কেমোথেরাপি আর রেডিয়েশন থেরাপি বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। ফলে চিকিৎসার ব্যয় আর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও তুলনামূলকভাবে বেশি হয়।

স্তন ক্যান্সার শনাক্ত আর চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ধারণে অনেক পরীক্ষানিরীক্ষা করতে হয়, আর এসব দেশেই সম্ভব। চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি, একজন রোগীর সম্পূর্ণ চিকিৎসা শেষ হতে সময় লাগে প্রায় ছয় মাস। অধিকতর মূল চিকিৎসার পরে রোগীদের পরবর্তী ৫১০ বছরের জন্য নিয়মিত চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে থাকতে হয়। তাই এত দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা দেশের বাইরে থেকে নেয়া অনেকের পক্ষে সম্ভব নয়। স্তন ক্যান্সার প্রতিকারের জন্য টিকার মতো সুনির্দিষ্ট কোনো প্রতিষেধক নেই। তবে ঐচ্ছিক বিষয়গুলো সম্পর্ক সচেতন থেকে নারীরা তাদের জীবনের ঝুঁকি কমাতে পারেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে