চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের এবারের এসএসসির ফল চট্টগ্রাম অঞ্চলের মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরের কিছু সংকটকে সামনে নিয়ে এসেছে। পাসের হার কমেছে। এটি ফলাফলের দৃশ্যমান দিক। কিন্তু এর আড়ালে রয়েছে প্রায় ৫৩ হাজার শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়ার হতাশা, জিপিএ–৫ কমে যাওয়া, শতভাগ পাস করা বিদ্যালয়ের সংখ্যা হ্রাস, শূন্য পাস বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৮ গুণ বেড়ে যাওয়া। বিশেষ করে মানবিক বিভাগের বিপর্যয়কর ফল। ফলে এবারের ফলাফলকে কেবল ‘ফল খারাপ হয়েছে’ বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বরং কেন এই অবনতি, কোথায় ঘাটতি এবং এর প্রতিকার কী? এখন সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই সবচেয়ে জরুরি বলে একাধিক শিক্ষাবিদ মন্তব্য করেছেন।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে ২০২৫ সালে পাসের হার ছিল ৭২ দশমিক ০৭ শতাংশ। ২০২৬ সালে তা নেমে এসেছে ৫৯ দশমিক ৪৮ শতাংশে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ১২ দশমিক ৫৯ শতাংশ। একই সঙ্গে জিপিএ–৫ পাওয়ার সংখ্যাও ১১ হাজার ৮৪৩ থেকে কমে হয়েছে ৯ হাজার ৩৯৮। শুধু এই দুটি পরিসংখ্যানই ফলাফলের বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। চট্টগ্রাম বোর্ডে এ বছর সবচেয়ে কম পাস করেছে ইংরেজিতে। সব বিভাগের শিক্ষার্থীর জন্য বাধ্যতামূলক এ বিষয়টিতে পাসের হার ৭২ দশমিক ২৭ শতাংশ। এরপর রয়েছে সাধারণ গণিত, পাসের হার ৮০ দশমিক ০৫ শতাংশ। অন্য বিষয়ের মধ্যে বাংলায় ৯৬ দশমিক ৮৬, সাধারণ বিজ্ঞানে ৯২ দশমিক ৬৩, রসায়নে ৯৭ দশমিক ০৭, পদার্থবিদ্যায় ৯২ দশমিক ১৯, জীববিজ্ঞানে ৯৬ দশমিক ৯৩, উচ্চতর গণিতে ৯০ দশমিক ৮২, হিসাব বিজ্ঞানে ৯৩ দশমিক ৫৮, ফিন্যান্স ও ব্যাংকিংয়ে ৯৪ দশমিক ৪৮, ব্যবসায় উদ্যোগে ৯৭ দশমিক ১৪, ধর্মে ৯৯ শতাংশ এবং বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচিতি বিষয়ে ৯৯ দশমিক ০৬ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে।
বিদ্যালয়ভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণ করলে চিত্রটি আরো উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে বলে উল্লেখ করে চট্টগ্রাম শিক্ষা প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা বলেন, একটি–দুটি বিদ্যালয়ে ফল খারাপ হওয়া বিচ্ছিন্ন ঘটনা হতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে আটটি বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষার্থীও পাস না করা স্বাভাবিক ফলাফল হিসেবে বিবেচনার সুযোগ রাখে না। এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষকের উপস্থিতি ও পাঠদানের মান কেমন, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি কতটা, অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন কীভাবে হয়, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি ও প্রশাসনের ভূমিকা কতটা কার্যকর–এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেখা জরুরি। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানে বছরের পর বছর দুর্বল ফল হচ্ছে, সেগুলোকে সাধারণ ফলাফল বিশ্লেষণের বাইরে রেখে আলাদা নজরদারির আওতায় আনা প্রয়োজন।
একজন প্রধান শিক্ষক বলেন, এবারের ফলাফলে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের জায়গাগুলোর একটি মানবিক বিভাগ। এই বিভাগের পাসের হার ৪০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। এটিকে শুধু একটি বিভাগের ফল বিপর্যয় ধরে বিবেচনা করলে হবে না। এর সঙ্গে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ শিক্ষা ও কর্মজীবনের প্রশ্ন জড়িয়ে আছে। মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের তুলনামূলকভাবে দুর্বল ফলের কারণ কী? শিক্ষক সংকট, পাঠদানে অনীহা, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, আর্থসামাজিক বাস্তবতা নাকি বিষয়ভিত্তিক প্রস্তুতির ঘাটতি, তা আলাদাভাবে অনুসন্ধান করা দরকার।
পার্বত্য তিন জেলার ফলাফলও বিশেষ গুরুত্ব দাবি করে উল্লেখ করে শিক্ষা প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা বলেন, ভৌগোলিক দুর্গমতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, শিক্ষক সংকট, যোগাযোগ সমস্যা এবং আর্থসামাজিক বাস্তবতার কারণে এসব অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা অনেক ক্ষেত্রে নগর ও সমতলের শিক্ষার্থীদের তুলনায় পিছিয়ে থাকে। ফলে একই প্রশ্নপত্র ও একই মূল্যায়ন পদ্ধতির মধ্যে তাদের ফলাফল তুলনা করলেই সমস্যার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না। শিক্ষা–সুযোগের বৈষম্য দূর করার জন্য জেলা ও উপজেলাভিত্তিক পৃথক কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন।
এবারের জাতীয় ফলাফল বিশ্লেষণে করোনাকালীন শিক্ষাব্যবস্থার বিঘ্নের বিষয়টি সামনে এসেছে। ২০২৬ সালের পরীক্ষার্থীদের মাধ্যমিক শিক্ষাজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় বিদ্যালয় বন্ধের মধ্যে কেটেছে। শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হওয়া, শিখন ঘাটতি পূরণে সীমাবদ্ধতা এবং পরবর্তী সময়ে শিক্ষাক্রমের পরিবর্তন তাদের প্রস্তুতিতে প্রভাব ফেলেছে। এর সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ পাঠ্যসূচিতে পরীক্ষা, কয়েকটি বিষয়ে তুলনামূলক কঠিন প্রশ্ন এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নে কঠোরতার প্রভাবও ফলাফলে পড়তে পারে।
একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বলেন, ইংরেজি ও গণিতের ফলাফল সার্বিক পাসের হার কমার অন্যতম কারণ হয়ে থাকলে বিষয়টি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা দরকার। ইংরেজি ও গণিত বাধ্যতামূলক বিষয় হওয়ায় এ বিষয়ে দুর্বল ফল একজন শিক্ষার্থীর সামগ্রিক ফলাফলে সরাসরি প্রভাব ফেলে। চট্টগ্রাম বোর্ডের কোন জেলা বা উপজেলার শিক্ষার্থীরা ইংরেজি ও গণিতে বেশি পিছিয়ে, সরকারি–বেসরকারি কোন ধরনের বিদ্যালয়ে সমস্যা বেশি, শহর ও গ্রামাঞ্চলের মধ্যে ব্যবধান কতটা–এসব তথ্য বিশ্লেষণ করলে সমস্যার প্রকৃত উৎস চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।
এবারের ফলাফল থেকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বছরের পর বছর উচ্চ পাসের হার এবং বিপুলসংখ্যক জিপিএ–৫কে শিক্ষার মানের প্রধান সূচক হিসেবে দেখার প্রবণতা এক ধরনের আত্মতুষ্টি তৈরি করেছিল কি না, সেটিও ভেবে দেখা দরকার। তুলনামূলক কঠোর মূল্যায়নে যদি এবার প্রকৃত শিখন ঘাটতির কিছুটা প্রতিফলন ঘটে থাকে, তাহলে এটি শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বল জায়গাগুলো শনাক্ত করার একটি সুযোগ। একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় পাস করলেই যে সে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান কিংবা মৌলিক জীবনদক্ষতায় যথেষ্ট সক্ষমতা অর্জন করেছে, এমনটি ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। একইভাবে জিপিএ–৫–এর সংখ্যা বাড়লেই শিক্ষার মান বাড়ছে, এমন সরল সমীকরণও গ্রহণযোগ্য নয়। শিক্ষার প্রকৃত মান নির্ধারণে শিক্ষার্থীর জ্ঞান, বিশ্লেষণ ক্ষমতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, ভাষাগত সক্ষমতা এবং বাস্তব জীবনে অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগের সামর্থ্য বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
শিক্ষাবিদরা বলেন, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ‘কেন এত শিক্ষার্থী ফেল করল’ প্রশ্নটির বিদ্যালয়ভিত্তিক উত্তর খুঁজে বের করা। প্রতিটি জেলা, উপজেলা এবং বিদ্যালয়ের ফলাফল আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। যেসব বিদ্যালয়ে শূন্য পাস, ২০ শতাংশের নিচে বা ২০–৩০ শতাংশের মধ্যে পাসের হার, সেসব প্রতিষ্ঠানকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে বিশেষ তদারকির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
যেসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট রয়েছে, সেখানে দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ বা পদায়ন করতে হবে বলে উল্লেখ করে একজন শিক্ষক বলেন, অনিয়মিত পাঠদান, শিক্ষকের অনুপস্থিতি কিংবা বিদ্যালয় পরিচালনায় গাফিলতির অভিযোগ থাকলে প্রশাসনিক তদন্ত করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়াতে অভিভাবক ও স্থানীয় প্রশাসনকে সম্পৃক্ত করতে হবে। গণিত ও ইংরেজিতে দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত ক্লাস, বিষয়ভিত্তিক সহায়তা এবং পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়ক কর্মসূচি নেওয়া যেতে পারে।
এক্ষেত্রে শিক্ষা প্রশাসনের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, শিক্ষক, অভিভাবক এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও দায়িত্ব রয়েছে উল্লেখ করে তারা বলেন, কোনো একটি পক্ষকে দায়ী করে সমস্যার সমাধান হবে না। বরং বিদ্যালয়ভিত্তিক তথ্যের ওপর নির্ভর করে কোথায় শিক্ষক দুর্বল, কোথায় শিক্ষার্থী অনিয়মিত, কোথায় অবকাঠামো অপর্যাপ্ত এবং কোথায় ব্যবস্থাপনায় সমস্যা–এসব আলাদা করে চিহ্নিত করতে হবে।
চট্টগ্রাম মহানগরের তুলনায় গ্রামাঞ্চল এবং বিশেষ করে পার্বত্য এলাকার ফলাফলের ব্যবধানও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিদ্যালয়ে মানসম্মত শিক্ষক, ডিজিটাল শিক্ষা–সুবিধা, বিজ্ঞান ও গণিত শিক্ষার উপকরণ এবং নিয়মিত একাডেমিক তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষকেরা বলেন, এবারের ফলাফলকে ‘খারাপ ফল’ হিসেবে ভুলে গেলে চলবে না। আবার পাসের হার বাড়ানোর জন্য কোনো ধরনের কৃত্রিম উদ্যোগও কাম্য নয়। প্রকৃত শিখন নিশ্চিত করেই ফল ভালো করতে হবে। কারণ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে আপস করে ভালো ফলাফলের পরিসংখ্যান তৈরি করা কোনোভাবেই শিক্ষার সাফল্য নয়।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের এবারের এসএসসি ফলাফল তাই একদিকে প্রায় ৫৩ হাজার শিক্ষার্থীর হতাশার প্রতিচ্ছবি, অন্যদিকে শিক্ষা প্রশাসনের জন্য সতর্কবার্তা। আটটি বিদ্যালয়ে শূন্য পাস, মানবিক বিভাগের ভয়াবহ ফল, পার্বত্য তিন জেলার পিছিয়ে থাকা এবং সামগ্রিক পাসের হারে বড় পতন, প্রতিটি সূচকই আলাদা মনোযোগ দাবি করে। এই ফলাফলকে যদি একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে গ্রহণ করে বিদ্যালয়ভিত্তিক অনুসন্ধান, বিষয়ভিত্তিক দুর্বলতা নির্ণয় এবং অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্য দূর করার উদ্যোগ নেওয়া যায়, তাহলে এবারের ব্যর্থতা আগামী দিনের সাফল্যের ভিত্তি হতে পারে বলে তারা মন্তব্য করেন।
তারা বলেন, এবারের এসএসসি ফলাফলকে তাই ব্যর্থতার শেষ অধ্যায় হিসেবে নয়, বরং সংশোধনের শুরু হিসেবে দেখা দরকার। ফলাফলে যে দুর্বলতা স্পষ্ট হয়েছে, তা আড়াল না করে স্বীকার করে সমাধানের পথে এগোতে পারলে চট্টগ্রামের মাধ্যমিক শিক্ষা আবারও কাঙ্ক্ষিত মানে ফিরতে পারে। যদি শুধু আগামী বছর পাসের হার বাড়ানোর লক্ষ্যে এবারের সংকেতগুলো উপেক্ষা করা হয়, তাহলে সংখ্যার উন্নতি হলেও শিক্ষার প্রকৃত মানের উন্নতি হবে না।












