বন্ধুদের মুখে অনেক শুনেছি এ বাড়ির আতিথেয়তার কথা, অন্দরমহলে মেয়েদের বাঁধাধরা নিয়মের শেকলে বাঁধা জীবনের অনেক হাহাকারের কথা। সেই থেকেই এ জমিদার বাড়িটি দেখার একটা সুপ্ত ইচ্ছা ছিল।
রাত সোয়া এগারোটায় আমাদের ফেরার ট্রেন–কিশোরগঞ্জ থেকে চট্টগ্রাম। নিকলী হাওর থেকে ফেরার পর হাতে খুব বেশি সময় ছিল না। ক্লান্তি দূর করতে বন্ধু গৃহে এক কাপ চিনি ছাড়া ঘন দুধের কড়া গরম চা গলায় ঢেলে, চটপট স্নান সেরে, একটু ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে পড়লাম। সন্ধ্যার একটু আগেই পৌঁছে গেলাম গাংগাটিয়া জমিদার বাড়িতে।
স্থানীয়ভাবে ‘মানব বাবুর বাড়ি’ নামে পরিচিত গাংগাটিয়া জমিদার বাড়ি কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার গোবিন্দপুর ইউনিয়নের গাংগাটিয়া গ্রামে অবস্থিত। কিশোরগঞ্জের অন্যতম আকর্ষণীয় পুরোনো জমিদারবাড়ি এটি। জমিদার পরিবারের উত্তরসূরির বসবাসের কারণে ঐতিহাসিক এই বাড়িটিতে এখনো প্রাণের ছোঁয়া আছে।
পুরোনো হলেও লোকজনের বসবাস আছে বলে বাড়িটি এখনো ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়নি। দালানগুলো বেশ পুরোনো, কিন্তু চারপাশ বেশ পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন। টলটলে জলের বিশাল ঘাটবাঁধানো পুকুর, অনেক রকম সাজানো গাছগাছালিতে ঘেরা শান্ত এক পরিবেশ–লম্বা লম্বা নারকেল গাছগুলো যেন কালের সাক্ষী হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। সব মিলিয়ে জায়গাটার মধ্যে একটা অন্যরকম মায়া আছে।
একপাশে রয়েছে বড় একটি পূজামণ্ডপ। শুনেছি, সেখানে এখনো বেশ বড় করে দুর্গাপূজা হয়। আলো থাকতে থাকতে আমরা কয়েকটা ছবি তুলে নিলাম। ছাদের সাদা সাদা ছোট থাম দিয়ে করা রেলিংগুলো যেন আমাকে ডাকছিল–তাদের হাত ধরে আশপাশটা একটু ঘুরে দেখার জন্য। কিন্তু সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসায় বোধহয় আর অনুমতি পাওয়া গেল না।
ওই দালানের নীচতলার বৈঠকখানায় আমরা দেখতে পেলাম বয়স্ক একজন ভদ্রলোক একটি চেয়ারে বসে আছেন। একটু দূরে সামনেই মেঝেতে পাটি বিছিয়ে তবলা নিয়ে বসেছে এক অল্পবয়সী ছেলে। পাশে হারমোনিয়াম, একটি ট্যাম্বুরিন, একজোড়া কাঁসর। তিনদিকে দেয়াল ঘেঁষে কিছু চেয়ার পাতা। হাতে গোনা তিন–চারজন মানুষ তাতে বসে আছেন।
জানতে পারলাম, ইনিই মানব বাবু। বয়স ৯০ এর কোঠায়।
শুনেছি, ভদ্রলোক নিঃসন্তান, বিপত্নীক। প্রতিদিন সন্ধ্যায় এখানে এসে বসেন। এ সময় দু–চারজন মানুষও আসেন–শুধু মানব বাবুকে একটু সময় দিতে, তাঁর সঙ্গে কিছুক্ষণ থাকতে।
বড় ঘরটিতে হাতে গোনা পাঁচ–ছয়জন মানুষ সঙ্গ দিচ্ছিলেন মানব বাবুকে। তবলা যে ছেলেটি বাজাচ্ছিল, তার নাম সৈকত। কলেজে পড়ে। ওকে জিজ্ঞেস করে জানলাম, প্রতিদিন সন্ধ্যায় নিঃসঙ্গ মানব বাবুকে একটু সঙ্গ দিতে ওরা এখানে আসে। সংকোচ কাটিয়ে আমরা মানব বাবুকে অনুরোধ করলাম, আমাদের একটা গান শোনাবেন? ভদ্রলোক সায় দিলেন। তবে বললেন, আমাদের মধ্য থেকে কাউকে আগে শুরু করতে। আরও বললেন, বয়স হয়ে গেছে, এখন আর তেমন গাইতে পারেন না, গাইতে কষ্টও হয়।
আমাদের দুজন বন্ধু গান শুরু করল। মুহূর্তেই পরিবেশটা শান্ত, মুগ্ধতায় ভরে গেল। অন্যেরা যখন গান গাইছিল, মানব বাবু তখন টেবিলে আঙুল ঠুকে তাল দিচ্ছিলেন। আঙুলের আংটি টেবিলের কাঠে লেগে ‘ঠকাস, ঠকাস’ শব্দ তুলছিল। আসর ততক্ষণে পুরোপুরি জমে গেছে।
মানব বাবুর আতিথেয়তা, তাঁর কথা বলার ধরন, পুরোনো দিনের গল্প–সব মিলিয়ে বাড়িটিকে শুধু ‘জমিদার বাড়ি’ বলে দেখলে যেন কিছু একটা বাদ পড়ে যায়। এই বাড়ির দেয়ালে যেমন ইতিহাস আছে, তেমনি আছে একজন মানুষের একাকিত্ব, স্মৃতি, হারিয়ে যাওয়া সময় আর নিজের শিকড়কে আঁকড়ে থাকার গল্প।
সেইদিন সন্ধ্যার ওই পরিবেশ আমাকে নিয়ে গিয়েছিল আমাদের ছোটবেলার ছুটির দিনগুলোতে।
বাবার হাতে তবলা, কখনো বা ঠোঁটে বাঁশি। ছোট কাকুর–হাতে সেতার কিংবা ইলেকট্রিক গিটার। ছোট মামা হারমোনিয়ামে সুর তুলে গেয়ে চলেছে একটার পর একটা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গান। আলতাফ কাকু, জলিল কাকু, মোমিন কাকু–মাউথ অর্গানে তুলতেন গানের সুর। গান, হাসি, গল্পে জমজমাট আসর। একটু পরপর মা আর মাসি পরিবেশন করছে চা। আমরা সব ভাইবোন পাশের ঘরে, সবাই মিলে বসে চুপচাপ গান শুনছি, টুকটাক দুষ্টুমি করছি। অতটুকুন বুঝতাম শব্দ করে কিছু করা যাবেনা।
মানব বাবুর গানের আসরের সেই পরিবেশে আমাদের কারেও মুখ থেকে যেন কথা সরছিল না। আমি মোবাইলটা মাঝে মাঝে উঁচিয়ে ধরে চুপচাপ ভিডিও করছিলাম আর উপভোগ করছিলাম গান আর কথোপকথন।
এবার মানব বাবু কী গাইবেন, একটু ভেবে নিয়ে ধরলেন– “ভুল সবই ভুল, ভুল সবই ভুল,/ এই জীবনের পাতায় পাতায়
যা লেখা, সে ভুল।” এরপর-“যারে উড়ে যারে পাখি, ফুরালো প্রাণের মেলা,/ শেষ হয়ে এলো বেলা, আর কেন মিছে তোরে বেঁধে রাখি।” তারপর– “আমি যে জলসাঘরে বেলোয়ারি ঝাড়, নিশি ফুরালে কেহ চায় না, আমায় জানি গো আর।”
কী গান গাইবেন, সে ব্যাপারে সৈকত তার ‘বাবু’–অর্থাৎ মানব বাবুকে সাহায্য করছিল। কথা ভুলে গেলে দু–এক জায়গায় একটু টানও দিয়ে দিচ্ছিল। সেই দুটো টানই আমার নজর ওর দিকে টেনে নিল। তবলায় যে ছেলেটি ছিল, সেই –সৈকত।
এত সহজ–সরল ছেলেটা! মানব বাবুর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা আর শ্রদ্ধাবোধ তার প্রতিটি আচরণে, প্রতিটি কথায় প্রকাশ পাচ্ছিল। ওর জন্য আশীর্বাদের পুষ্প যেন আপনাআপনিই বর্ষিত হচ্ছিল।
বয়স হয়েছে, এখনকার কথা খানিক পরই ভুলে যাই। কিন্তু আমার মনে হয় না, এই দিনটার কথা আমি কোনোদিন ভুলতে পারব।এর সঠিক কারণ হয়তো আমি নিজেও বলতে পারব না। শুধু জানি, একসময় আবেগে আমার গলা দিয়ে আর শব্দ বের হচ্ছিল না। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছিল। এই ছেলেটাকে দেখে আমার মাতৃহৃদয় ভিজে একাকার। এই যুগেও এত সহজ, এত নিঃস্বার্থ, এত মমতাময় একজন কলেজপড়ুয়া ছেলে থাকতে পারে–ভাবতেই অবাক লাগছিল। সৈকত তখন হয়তো খুব স্বাভাবিকভাবেই তার কাজটা করছিল। কিন্তু আমার মনে হয়েছিল একজন নিঃসঙ্গ বৃদ্ধ মানুষের পাশে সঙ্গী হয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা এক মানবিক তরুণ। গলা, বুক সব কেমন যেন ভার হয়ে ছিল,গানের আসর শেষ হওয়ার পর বুকের ভেতর জমে থাকা সেই চাপা কান্নাটা আর ধরে রাখতে পারিনি। নিজেই নিজেকে পুরোপুরি ভেঙে পড়তে দেখলাম।
হয়তো জমিদার বাড়িটা দেখতে গিয়েছিলাম, কিন্তু সেদিন সেখান থেকে ফিরে এলাম একজন মানুষের একাকিত্ব, কিছু পুরোনো গান আর সৈকত নামের এক তরুণের অকৃত্রিম ভালোবাসা সঙ্গে নিয়ে। আর মনে হলো–ইতিহাস শুধু পুরোনো দালানের দেয়ালে লেখা থাকে না। কখনো কখনো ইতিহাস বেঁচে থাকে মানুষের আচরণে, গানের সুরে, ভালোবাসায় আর কারও নিঃসঙ্গ সন্ধ্যার পাশে নীরবে বসে থাকা এক তরুণের মধ্যে।
লেখক : প্রাবন্ধিক, গল্পকার










