কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে পার্থক্য অনেক। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণার মাধ্যমে জ্ঞান উৎপাদন করে এবং তা শিক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়। যদিও পরবর্তীতে তা কলেজেও পড়ানো হয়। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ হলো গবেষণা করে জ্ঞান উৎপাদন করা। এজন্য সরকার বাজেটে ইউজিসি‘র মাধ্যমে গবেষণা খাতে শত শত কোটি টাকা বরাদ্দ করে। তবে গবেষণালব্ধ এই জ্ঞান বিশ্বের বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশ করতে হয়, যাতে এইটি বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিশ্বের বিভিন্ন গবেষকেরা এটি রেফারেন্স হিসাবে ব্যবহার করতে পারে। এতে সামগ্রিকভাবে মানব জাতি উপকৃত হয়। যদিও কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় দুটোতেই শিক্ষার্থীরা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করে।
এই গবেষণার আরেকটি দিক হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকেরা গবেষণার মাধ্যমে অর্জিত ডিগ্রি ছাড়া প্রমোশন পায় না। অর্থাৎ সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক হতে হলে গবেষণার মাধ্যমে ডিগ্রি অর্জন করতে হয়। তবে দুঃখজনক ও লজ্জার বিষয় হলো বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশের গবেষকদের শত শত গবেষণাপত্র আন্তজার্তিক জার্নালে প্রত্যাহৃত হয়েছে। অর্থাৎ এইসব গবেষণাপত্র ভুয়া, যা দেশের জন্য চরম লজ্জার। জার্নালগুলো বলছে, ভুয়া বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন যোগ করা, তথ্যের অসংগতি, একজনের গবেষণা বা অংশবিশেষ চুরি করে আরেকজনের নামে চালিয়ে দেওয়া, চৌর্যবৃত্তিসহ নানা অনিয়মের অভিযোগে গবেষণাপত্রগুলো প্রত্যাহার করা হয়েছে। ২০১৯ থেকে ২০২৬ সালের জুন–এই সময়ে প্রত্যাহার হওয়া অন্তত ৩২৫ টি গবেষণাপত্রের খোঁজ পাওয়া গেছে, যেগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন গবেষকের সংযুক্তি রয়েছে।
বিশ্বের যেকোনো দেশের গবেষকদের ক্ষেত্রে গবেষণাপত্র জার্নাল বা সাময়িকীতে প্রকাশ করা বৈজ্ঞানিক ও একাডেমিক জগতের গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ। জার্নালে প্রকাশের মাধ্যমে গবেষক আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর কাজের মেধাস্বত্ব ও একাডেমিক স্বীকৃতি লাভ করেন। বিশ্বখ্যাত জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশ পেলে তা গবেষকদের মর্যাদা বাড়ায় এবং শিক্ষকতার ক্ষেত্রে পদোন্নতিতেও ভূমিকা রাখে।গবেষকেরা বলছেন, কোনো দেশের একের পর এক গবেষকের গবেষণা প্রত্যাহার হলে তা ওই দেশের গবেষকদের ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে ফেলে। এতে নতুন গবেষণা সুপরিচিত জার্নালে প্রকাশ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশ্বজুড়ে একজন গবেষকের গবেষণার মান ও প্রভাব মূল্যায়ন করা হয় মূলত তাঁর কাজকে অন্য গবেষকেরা কতবার উদ্ধৃত (সাইটেশন) করেছেন, সেটার ভিত্তিতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব (জিওলজি) বিভাগের স্বনামধন্য অধ্যাপক কাজী মতিন উদ্দিন আহমেদের ৪৫০টি গবেষণা প্রায় ২০ হাজার বার উদ্ধৃত করেছেন বিশ্বের বিভিন্ন গবেষকেরা। আসলে একেকটি গবেষণা প্রত্যাহারের ঘটনা ফুটবল মাঠের একেকটি লাল কার্ডের মতো। তবে বাংলাদেশিদের গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের সংখ্যা এখন উদ্বেগজনক।
গবেষণাপত্রের বিষয়ে অভিযোগ উঠলে সাধারণত বিশ্বের বেশির ভাগ প্রকাশনা সংস্থা কমিটি–অন পাবলিকেশন এথিকসের (কোপ) নীতিমালা অনুসরণ করে সেটা সমাধান করে। কোপ একটি অলাভজনক সংস্থা, যা মূলত গবেষণাপত্রের নীতিগত মান এবং সততা বজায় রাখতে কাজ করে। প্রথমে প্রকাশনা সংস্থার সম্পাদক অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা যাচাই করেন। প্রাথমিক প্রমাণ পেলে গবেষকের কাছে মূল তথ্য ও ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। ব্যাখ্যা সন্তোষজনক না হলে সাময়িকী বা প্রকাশক কর্তৃপক্ষ স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে বিষয়টি খতিয়ে দেখে। জালিয়াতি গুরুতর হলে গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের (রিট্রাকশন) ঘোষণা দেওয়া হয়। এসব ঘোষণার খোঁজ রেখে তালিকা প্রকাশ করে রিট্রাকশন ওয়াচ নামের একটি ওয়েবসাইট। প্রত্যাহারকৃত বাংলাদেশি গবেষণার তথ্য সংগ্রহে রিট্রাকশন ওয়াচের সহায়তা নেওয়া হয়েছে এবং এতে ৩২৫টি গবেষণা পাওয়া গেছে। যদিও এটা চূড়ান্ত সংখ্যা নয়। আরো গবেষণা প্রত্যাহার হয়ে থাকতে পারে।
এলসেভিয়ার, স্প্রিঞ্জার নেচার, উইলি, হিন্দাউই, আইইইইর মতো জার্নাল থেকেই বেশি গবেষণা পত্র প্রত্যাহার করা হয়েছে।
দেখা যায়, গবেষণাপত্রগুলো প্রত্যাহার করে দেওয়া বিজ্ঞপ্তিতে সবচেয়ে বেশি এসেছে পিয়ার রিভিউ (বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন) প্রক্রিয়ায় কারচুপি, তথ্য ও ফলাফলের অসংগতি, প্লেজিয়ারিজম (চৌর্যবৃত্তি), একই তথ্য পুনর্ব্যবহার এবং অপ্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতি দিয়ে সাইটেশন (উদ্ধৃতি–সংখ্যা) বাড়ানোর অভিযোগ। কিছু গবেষণায় অর্থের বিনিময়ে লেখকস্বত্ব বেচাকেনার বাণিজ্যিক চক্র জড়িত (পেপার মিলের) থাকার কথাও চিহ্নিত করেছেন প্রকাশকেরা। দেখা যায়, ৩২৫টি গবেষণার মধ্যে ৪৪টিতে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ৪২টিতে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ৩২টিতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ২১টিতে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভাসিটি (ইউআইইউ) এবং ২০টিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের নাম রয়েছে। অন্যদিকে ১১টি করে গবেষণায় নাম আছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের। ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ (১০), নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (১০), বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি (১০), বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি (৭), গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (৬) গবেষকেরাও রয়েছেন এই তালিকায়। প্রত্যাহার হওয়া প্রতিটি গবেষণাপত্রেই সৌদি আরবের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা সহলেখক হিসেবে ছিলেন।
একাধিক গবেষকের অভিমত, বৈশ্বিক র্যাংকিংয়ে নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উন্নতির জন্য সৌদি আরব গবেষকদের আর্থিক সুবিধা দিত। এতে বিভিন্ন দেশের গবেষকেরা সৌদি আরবের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে গবেষণা প্রকাশ শুরু করেন। যদিও গবেষণার মান বজায় রাখা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ফলে ২০২০ সালের পর থেকে সৌদি আরবের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে যায়।
বিশ্বের অন্যতম বড় গবেষণা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান স্প্রিঞ্জার ও এলসেভিয়ার তাদের তদন্তে উল্লেখ করেছে, গবেষণাগুলোয় নানা অনিয়ম খুঁজে পাওয়ায় সম্পাদকীয় বোর্ড গবেষণাগুলোর বৈজ্ঞানিক ফলাফলের ওপর আস্থা হারিয়েছে। তারা বলেন, সম্পাদকীয় বোর্ড গভীর তদন্তের পর এই গবেষণাপত্রগুলো বাতিল ঘোষণা করেছে। সংস্থাগুলো প্রত্যাহার নোটে যেসব জালিয়াতির কথা বলেছে, তার মধ্যে ছিল ভুয়া পিয়ার–রিভিউ।
গবেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশে গবেষকেরা সাধারণত দেশীয় বিভিন্ন জার্নালে গবেষণা প্রকাশ করে নিজেদের পদোন্নতি ও প্রাতিষ্ঠানিক অন্যান্য সুবিধা নেন। বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশের সংখ্যাও কম। তাতেও অনিয়ম, চৌর্যবৃত্তি ও চুরি ইত্যাদি ধরা পড়ছে। তবে গবেষণা প্রত্যাহার হলেও দেশে জবাবদিহির ব্যবস্থা নেই।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন ইউনিভার্সিটি গবেষকদের বিভিন্ন ধরনের আর্থিক সুবিধা দিয়ে থাকে। গবেষণার মানের ভিত্তিতে একজন গবেষক ২০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত প্রণোদনা পান। এ ছাড়া বিশেষ অবদানের জন্য অতিরিক্ত সুবিধা এবং প্রতিবছর অনুষদ ও বিভাগভিত্তিক ‘বেস্ট রিসার্চার অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়া হয়।
আসলে দেশের গবেষকেরা প্রায় সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরা শিক্ষক। তারা এই সমাজে বসবাস করলেও তাদেরকে সবাই দেখে সম্মানের চোখে। শিক্ষার্থীদের চোখে তারা এক একজন আইডল। সমাজ রাষ্ট্র ও দেশ গঠনের তাদের রয়েছে অপরিসীম ও জোরালো ভূমিকা। তাদের বিরুদ্ধে যখন চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ উঠে, সেটা সমাজ ও রাষ্ট্রকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই এই বিষয়টি খুবই গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এই বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) অভিমত হলো ‘কোনো শিক্ষক বা গবেষকের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ উঠলে তা তদন্ত করা এবং ব্যবস্থা নেওয়া প্রথমত সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ। বিশ্ববিদ্যালয় যদি অভিযোগ উপেক্ষা করে বা ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়, তখন ইউজিসি নিজে তদন্ত করবে এবং সরাসরি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে।’ এখন দেখার বিষয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও ইউজিসি তাদের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ নেয়?
লেখক: কলামিস্ট।











