কক্সবাজারে পানি শোধনাগার প্লান্ট রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেবে কে?

শাহেদ মিজান, কক্সবাজার | সোমবার , ৬ জুলাই, ২০২৬ at ৪:৫৪ পূর্বাহ্ণ

কক্সবাজার পৌর এলাকায় সুপেয় পানি সংকট নিরসনে শহরতলীর ঝিলংজার চাঁন্দের পাড়ায় দেড়শ’ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে পানি শোধনাগার প্লান্ট। যদিও প্লান্টটি গত বছরের জুনে চালু করার কথা। সঞ্চালন লাইন স্থাপনে ধীরগতির কারণে তা হয়নি। সঞ্চালন লাইনের কাজ শেষের পথে। কিন্তু নতুন করে আরেক জটিলতায় পড়েছে প্লান্টটি। এটি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিতে অনীহা জানিয়েছে পৌরসভা। ফলে কবে নাগাদ; কিভাবে প্লান্টটি চালু হবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তবে পৌরসভা দায়িত্ব না নিলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দিয়ে প্লান্টটি চালুর চিন্তা করছে সরকার। আগামী তিন মাসের মধ্যে এটি চালুর কথা জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক গোলাম মোক্তাদির। তিনি জানান, নিয়ম মতে এটি রক্ষণাবেক্ষণের স্থায়ী দায়িত্বে থাকবে পৌরসভা। কিন্তু আর্থিক সংকট, পৌর পরিষদ না থাকা এবং জনবল সংকটের কারণে প্লান্টটির দায়িত্ব নিতে অনীহা প্রকাশ করে তারা। তবে পৌর কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রকল্পটি অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। তাই তারা দায়িত্ব নিচ্ছে না।

জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য মতে, তাপপ্রবাহের কারণে অস্বাভাবিকভাবে নিচে নেমে গেছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। জেলা শহরসহ সদর উপজেলার দুই ইউনিয়নের সিংহভাগ এলাকাতেই ক্রমে নামছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। ফলে গুরুতর পানি সংকটে পড়েছে অন্তত ৫ লক্ষাধিক বাসিন্দা। এই প্রেক্ষাপটে সংকট নিরসনে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) এবং বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে প্রায় দেড়শ’ কোটি টাকা ব্যয়ে পানি শোধানাগার প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। ২০২০ সালে ‘ভূউপরস্থ পানি শোধনাগার’ নির্মাণ প্রকল্পের কাজ শুরু করে সরকার। দুই দফা প্রকল্পের সময় বাড়িয়ে ২০২৪ সালে শোধনাগারের নির্মাণকাজ শেষ করার কথা থাকলেও হয়নি। এরপর এক দফায় সময় বাড়িয়ে গত বছরের জুন মাস পর্যন্ত করা হয়। এর মধ্যে প্লান্টটির নির্মাণ কাজ শেষ হয়। কিন্তু পানি সঞ্চালন লাইন করা যায়নি।

প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, শহরের গোলদীঘিপাড় এলাকায় পাহাড়ে একটি মাদার ট্যাঙ্কসহ বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন স্টেডিয়ামসংলগ্ন এলাকা, দক্ষিণ রুমালিয়ারছড়া, সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্ট এবং বাস টার্মিনাল এলাকাসহ পাঁচটি ওভার ট্যাঙ্ক বা উচ্চ জলাধার তৈরি করা হয়েছে। প্রতি ঘণ্টায় ১০ লাখ লিটার (এক হাজার মিটার কিউব) পানি পরিশোধন করা হবে শোধনাগারে। সেখান থেকে পৌরসভার ১ লাখ ২০ হাজার মানুষকে পানি সরবরাহ করা হবে।

জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী মঞ্জুর আলম বলেন, প্রকল্পের মূল কাঠামোতে পানি সরবরাহের হাউজ লাইন সংযুক্ত ছিল না। এই নিয়ে আপত্তি জানায় পৌরসভা। এরপর হাউজ লাইন স্থাপনে আরেকটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এই প্রকল্পের আওতায় পুরো পৌর এলাকার সকল বাড়িপ্রতিষ্ঠান এবং হোটেলমোটেল জোনে সঞ্চালন লাইন স্থাপনের কাজ শুরু হয়। এতেও নানা সমস্যায় ধীরগতি হয়। ফলে চূড়ান্ত সময়ের পুরো এক বছর পেরিয়ে গেছে। এখনো সঞ্চালন লাইন স্থাপনের কাজ শেষ হয়নি। তবে শিগগরিই শেষ হবে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন এলাকায় সঞ্চালন লাইন স্থাপনের খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। এতে পথচারী ও যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টিসহ নানা ভোগান্তি পোহাচ্ছে শহরবাসী।

প্লান্টটি চালুকরণ, পৌরসভার অনীহা এবং ঠিকাদার নিয়োগ প্রসঙ্গে প্রকল্প কর্মকর্তা (পিডি) গোলাম মুক্তাদির বলেন, ‘প্লান্টটির কাজ শেষ হয়েছে এক বছর আগে। সঞ্চালন কাজ শেষ করে আগামী তিন মাসের মধ্যে চালু করার লক্ষ্যমাত্রা নেয়া হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, পৌরসভা দায়িত্ব নিচ্ছে না। গণঅভ্যুত্থানের পর পৌর পরিষদ বিলুপ্ত, আর্থিক সংকট ও জনবল সংকটের কথা জানিয়ে দায়িত্ব নিতে অনীহা জানিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। সমস্যা এখনো বিরাজমান থাকায় সহসা সম্ভাবনার কথাও জানাতে পারেনি। তাই বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর জন্য এডিবি অর্থায়ন করবে। ঠিকাদার নিয়োগের টেন্ডার আহ্বানের প্রক্রিয়া চলছে। এরপর যখন পৌরসভার সক্ষমতা ফিরবে তখন হয়তো দায়িত্ব দেয়া হবে।’

তবে অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী রোমেল বড়ুয়া বলেন, ‘জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর কাজ শেষ না করে যেনতেনভাবে প্রকল্পটি পৌরসভাকে হস্তান্তর করতে চাচ্ছে। এভাবে তো নেয়া সম্ভব না।’

তিনি বলেন, ‘প্রকল্পটি পরিচালনার জনবল নিয়োগ ও তাদের প্রশিক্ষণ দরকার। তা না করে দায়িত্ব নেয়া সম্ভব না। কাজ পরিপূর্ণ করে জনবলসহ সার্বিক সহযোগিতা নিশ্চিত করলে পৌরসভা দায়িত্ব নেবে।’

প্রসঙ্গত, কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য অগভীর নলকূপ অকেজো হয়ে পড়েছে। কক্সবাজারে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতি বছর ১০ থেকে ১১ ফুট হারে নিচে নামছে। ১০ বছর আগেও শহরের প্রাণকেন্দ্র টেকপাড়ায় ১২০ থেকে ১৫০ ফুটের মধ্যে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পাওয়া যেত। অথচ এখন পানির জন্য যেতে হয় ৩০০ থেকে ৫০০ ফুটের বেশি গভীরে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচট্টগ্রাম কারাগারে ধারণক্ষমতার তিন গুণ বেশি বন্দি
পরবর্তী নিবন্ধমীরসরাইয়ে বাইকে ব্যাটারি রিকশার ধাক্কা, আনসার ভিডিপি কর্মকর্তার মৃত্যু