২০১০ সালের মাঝামাঝি সময়। তপ্ত রোদে ঘাম ঝরানো এক বুক প্রত্যাশা নিয়ে পুরো পৃথিবীর চোখ তখন আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্তে। কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গের দীর্ঘ বর্ণবাদের কালো মেঘ কাটিয়ে ওঠা এক নতুন দক্ষিণ আফ্রিকা নিজেদের সোনালী আত্মপরিচয় মেলে ধরতে চাইছে বিশ্বমঞ্চে। কারণ, ইতিহাসের পাতায় প্রথমবারের মতো ফুটবলের মহাযজ্ঞ বসেছে আফ্রিকান মহাদেশে। এই মহোৎসবকে বরণ করে নেওয়ার জন্য প্রয়োজন ছিল এমন এক সুরের, যা কেবল স্টেডিয়ামের গ্যালারিই কাঁপাবে না, বরং আফ্রিকার মাটি ও মানুষের প্রাচীন স্পন্দনকে এক সূতোয় বেঁধে দেবে বিশ্ববাসীর হৃদয়ের সাথে। ঠিক এই মাহেন্দ্রক্ষণেই জন্ম নিয়েছিল ইতিহাসের এক কিংবদন্তি সুরের “ওয়াকা ওয়াকা (দিস টাইম ফর আফ্রিকা)”। তবে এই গানটির সৃষ্টি কোনো সাধারণ রেকর্ডিং স্টুডিওর চার দেয়ালের গল্প নয়, এর পেছনে লুকিয়ে আছে রাজনৈতিক টানাপোড়েন, সাংস্কৃতিক অধিকারের লড়াই আর এক অদ্ভুত সুর চুরির রোমাঞ্চকর ইতিহাস।
গল্পের শুরুটা হয়েছিল ২০১০ সালের এপ্রিল মাসে। ফিফা এবং তাদের মিউজিক পার্টনার সনি মিউজিক যখন আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করল যে কলম্বিয়ান পপ কুইন শাকিরা এই বিশ্বকাপের মূল থিম সং পরিবেশন করবেন, তখন দক্ষিণ আফ্রিকার আকাশে আনন্দের বদলে জমল ক্ষোভের মেঘ। স্থানীয় মানুষের মনে তীব্র অভিমান জাগল–আফ্রিকার মাটিতে প্রথম বিশ্বকাপ, অথচ গান গাওয়ার জন্য বেছে নেওয়া হলো একজন লাতিন আমেরিকান তারকাকে! ঘরের উৎসবে ঘরের মানুষকে বাদ দিয়ে এই বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তকে অনেকেই দক্ষিণ আফ্রিকার সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার ওপর এক পরোক্ষ আঘাত হিসেবে দেখলেন। টক রেডিওর টক–শো থেকে শুরু করে চায়ের টেবিল–সর্বত্রই দাবি উঠল স্থানীয় আফ্রিকান শিল্পীদের সুযোগ দেওয়ার।
ফিফা বুঝতে পারল, এই ক্ষোভের আগুন নেভাতে না পারলে উৎসবের রঙ ফিকে হয়ে যাবে। তারা এক দারুণ কূটনৈতিক ও শৈল্পিক চাল চালল। শাকিরার সুরের সাথে যুক্ত করে দেওয়া হলো দক্ষিণ আফ্রিকার অত্যন্ত জনপ্রিয় অ্যাফ্রো–ফিউশন ব্যান্ড ‘ফ্রেশলিগ্রাউন্ড’–কে। ব্যান্ডের বেহালাবাদক কায়লা–রোজ স্মিথ পরবর্তীতে স্বীকার করেছিলেন যে, বিশ্বকাপের মতো বিশাল আসরগুলো আসলে কোটি ডলারের বাণিজ্যিক খেলা, যেখানে শাকিরার মতো একজন গ্লোবাল আইকনকে সামনে রাখা ব্যবসায়িক স্বার্থেই জরুরি ছিল। তবে ফ্রেশলিগ্রাউন্ড এই গানে যুক্ত হওয়ার পর গানের পুরো চেহারাটাই বদলে গেল। দক্ষিণ আফ্রিকান ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র এবং তাদের আদিম আফ্রিকান সুর ও চমৎকার কণ্ঠের জাদুতে গানটিতে প্রাণ ফিরে এলো, যার ফলে বিশ্বব্যাপী শ্রোতারাও এক খাঁটি আফ্রিকান মাটির গন্ধ পেল।
কিন্তু এই সুরের আসল ম্যাজিকটা লুকিয়ে ছিল ক্যামেরুনের এক গহিন অতীতে। শাকিরা এবং আমেরিকান রেকর্ড প্রযোজক জন হিল যখন উরুগুয়ে এবং বাহামার স্টুডিওতে গানটি রেকর্ড করছিলেন, তখন তারা কোরাসের সুর হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন ক্যামেরুনের এক জনপ্রিয় সামরিক গানকে। ১৯৮৬ সালের সেই গানটির নাম ছিল ‘জ্যাঙ্গালিওয়া’ (Zangalewa), যা গেয়েছিল সে দেশের গোল্ডেন সাউন্ডস নামের এক মিলিটারি ব্যান্ড। আফ্রিকার সেই পুরোনো কুচকাওয়াজের গানকে শাকিরা এক আধুনিক পপ বিটের সাথে মিলিয়ে দিলেন। গানের এই ‘ওয়াকা ওয়াকা’ শব্দের অর্থ আসলে এক ধরণের তাগিদ-“তোমাকে লড়ে যেতে হবে”। শাকিরা ইংরেজি ও স্প্যানিশ দুই ভাষার লিরিক্সে ফুটিয়ে তুললেন সেই চিরন্তন বাণী-“তুমি একজন ভালো সৈনিক, নিজের লড়াইটা নিজেই বেছে নাও। যদি পড়ে যাও, গায়ের ধুলো ঝেড়ে আবার উঠে দাঁড়াও।” এই বার্তাটি কেবল মাঠের এগারোজন খেলোয়াড়ের জন্যই নয়, জীবনের কঠিন ময়দানে লড়ে যাওয়া কোটি কোটি সাধারণ মানুষের লড়াইয়ের গান হয়ে উঠল।
অবশ্য এই সুরের নবজন্মের পেছনেও বিতর্ক কম হয়নি। গোল্ডেন সাউন্ডস ব্যান্ডের সদস্যরা দাবি করলেন, তাদের অনুমতি বা যথাযথ ক্রেডিট না দিয়েই এই সুরটি ব্যবহার করা হয়েছে। মেধাস্বত্ত্বের এই বড় জটিলতা আদালত পর্যন্ত গড়ানোর আগেই অবশ্য ফিফা ও শাকিরা অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে ব্যান্ডটিকে সম্মানজনক রয়্যালটি এবং অফিসিয়াল ক্রেডিট দিয়ে বিষয়টি মিটিয়ে নেন।
২০১০ সালের ৭ মে যখন গানটির অফিসিয়াল ভিডিও মুক্তি পেল, সারা বিশ্ব যেন এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে চলে গেল। শাকিরার অবিস্মরণীয় কোমর দোলানো নৃত্যশৈলী আর আফ্রিকান শিশুদের মুখে এক চিলতে হাসির সেই রঙিন ভিডিওটি রাতারাতি বিশ্বজুড়ে এক সুনামি সৃষ্টি করল। বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে যতগুলো বিশ্বকাপ থিম সং তৈরি হয়েছে, জনপ্রিয়তার পাল্লায় “ওয়াকা ওয়াকা” সবসময়ই নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ১৯৯৮ সালে রিকি মার্টিনের গাওয়া “দ্য কাপ অফ লাইফ” কিংবা ২০১০ সালেরই কেনানের সাড়া জাগানো “ওয়েভিং ফ্ল্যাগ”–এর পাশে দাঁড়িয়ে আজ বহু ফুটবল বোদ্ধা নির্দ্বিধায় স্বীকার করেন যে, সর্বকালের সেরা ফিফা সংগীতের তালিকায় এক নম্বরে যদি কোনো গানের নাম লিখতে হয়, তবে তা হলো “ওয়াকা ওয়াকা”।
আজও যখন পৃথিবীর কোনো প্রান্তে সবুজ গালিচায় ফুটবল গড়ায়, স্পিকারে ভেসে আসে সেই পরিচিত মাদলের শব্দ। গানটি কেবল চার মিনিটের এক পপ ট্র্যাক হয়ে থাকেনি; এটি হয়ে উঠেছে ফুটবলের অদম্য চেতনা, আফ্রিকান মহাদেশের বিজয়গাথা এবং সমস্ত ভেদাভেদ ভুলে মানবজাতির এক সুরে মিলিত হওয়ার এক জীবন্ত দলিল।











