চকরিয়ার ডুলাহাজারা সাফারি পার্ককে আরো বেশি বিদেশি বন্য প্রাণীসমৃদ্ধ করে তুলতে এবার নতুন অতিথি হিসেবে আনা হয়েছে আফ্রিকার মাদাগাস্কার দ্বীপের আদি আবাসস্থলের বিপন্ন প্রজাতির বন্য প্রাণী রিংটেইল লেমুর। পার্কের প্রাণী বৈচিত্র্যকে আরো বেশি সমৃদ্ধ, পর্যটক–দর্শনার্থী বৃদ্ধি ছাড়াও গবেষণার নিমিত্তে বিদেশি এই পাঁচটি বন্য প্রাণী আনা হয় চলতি বছরের গেল জুলাই মাসের শেষের দিকে। বর্তমানে এসব রিংটেইল লেমুর পার্কের নতুন বেস্টনীতে রাখা হয়েছে। সেইসাথে বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও চুরি ঠেকাতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পার্ক কর্তৃপক্ষ।
পার্ক সূত্র জানায়, নতুন অতিথি হিসেবে আফ্রিকার মাদাগাস্কার দ্বীপের এই পাঁচটি রিংটেইল লেমুরের একেকটির দাম পড়েছে ১৭ লক্ষ টাকা করে। সেই হিসেবে এসব বন্য প্রাণী আমদানিতে পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যয় হয়েছে ৮৯ লক্ষ টাকা। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ও সাফারি পার্ক সূত্রে জানা গেছে, রিংটেইল প্রজাতির এসব লেমুর আমদানি করা হয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার মিস্টিক মাংকিস অ্যান্ড ফেদার্স ওয়াইল্ডলাইফ পার্ক থেকে। গত ৩০ জুলাই এসব বন্য প্রাণী দেশে নিয়ে আসা হয়। এসব লেমুরের মধ্যে দুটি পুরুষ, তিনটি মাদী এবং বয়স দেড় থেকে দুই বছর পর্যন্ত।
বর্তমানে ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে বিভিন্ন প্রজাতির ২৯৮টি পাখি, ৬০টি সরীসৃপ ও ১৬৭টি স্তন্যপায়ী প্রাণী রয়েছে। এর মধ্যে বিদেশি প্রাণীও রয়েছে। চিত্রা হরিণ, মায়া হরিণ, বিভিন্ন প্রজাতির বানর, বনবিড়াল, মেছোবিড়াল, বন্য শূকর, সজারু, বনমোরগ, ফিঙ্গে, ঘুঘু, চিল, টিয়া, বক, ডাহুক, কালিমসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী উন্মুক্ত অবস্থায় রয়েছে। সর্বশেষ পাঁচটি রিংটেইল লেমুর যুক্ত হয়েছে।
লেমুর কনজারভেশন নেটওয়ার্কে তথ্য জানাচ্ছে, লেমুর বিশ্বের সবচেয়ে বিপন্ন স্তন্যপায়ী প্রাণী। আফ্রিকার মাদাগাস্কার দ্বীপে তাদের আদি আবাসস্থল। বিশ্বের ৯৮ শতাংশ লেমুর প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। তন্মধ্যে ৩১ শতাংশ লেমুর প্রজাতি চরমভাবে বিপন্ন।
আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘের (আইইউসিএন) লাল তালিকায় এটি ‘গুরুতরভাবে বিপন্ন’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া বিপন্ন বন্য প্রাণী ও উদ্ভিদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যবিষয়ক কনভেনশন সাইটসের অ্যাপেন্ডিক্স–১ তালিকাভুক্ত প্রাণী রিংটেইল লেমুর। তাই অত্যন্ত সীমিত ও বিশেষ শর্ত ছাড়া এই প্রজাতির আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনজুরুল আলম দৈনিক আজাদীকে জানান, পার্কে নতুন অতিথি হিসেবে আনা হয়েছে বিদেশি বন্য প্রাণী দক্ষিণ আফ্রিকার রিংটেইল লেমুর। আগে থেকেই এই পার্কে এই প্রজাতির বন্য প্রাণী না থাকলেও একসঙ্গে পাঁচটি লেমুর পার্কে আগত পর্যটক–দর্শনার্থীদের জন্য নতুন আকর্ষণ হিসেবে ঠাঁই পেয়েছে।
পার্ক কর্মকর্তা মনজুরুল আলম বলেন, বিদেশ থেকে আনা এসব বন্য প্রাণীর জন্য নির্দিষ্ট বেস্টনীতে আলাদা খাঁচার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এগুলোর খাদ্যাভ্যাস, আচরণ ও দেখাশোনার জন্য আলাদা জনবলও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া চুরি ঠেকাতে প্রাণীগুলোর ডিএনএ সংরক্ষণ ও সার্বক্ষণিক নজরদারি করতে নিরবচ্ছিন্ন প্রহরীর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
সাফারি পার্কের বন্য প্রাণী হাসপাতালের চিকিৎসক (ভেটেরিনারি সার্জন) মো. মোস্তাফিজুর রহমান দৈনিক আজাদীকে বলেন, পার্কে আনার পর নতুন অতিথি পাঁচটি রিংটেইল লেমুর নির্দিষ্ট বেস্টনীতে বেশ সুস্থ ও সবল রয়েছে। নিয়ম করে তাদেরকে খাবার দেওয়াসহ সার্বিক পরিচর্যা করা হচ্ছে।
সাফারি পার্কের প্রকল্প পরিচালক এবং চট্টগ্রাম বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) আবু নাছের মো. ইয়াছিন নেওয়াজ দৈনিক আজাদীকে বলেন, আমরা আশা করছি সাফারি পার্কের পরিবেশ ও প্রতিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে বিদেশি বন্য প্রাণী রিংটেইল লেমুর। দুর্লভ ও দামি এই প্রাণীর উপযুক্ত আবাসস্থল নিশ্চিত করে জেনেটিক বৈচিত্র্য বজায় রাখা হচ্ছে। যাতে যে কোন ধরনের সমস্যায় তাত্ক্ষণিকভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়।
এই বিষয়ে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগে কর্মরত বিশেষজ্ঞরা বলেন, কক্সবাজারের সাফারি পার্কের জীববৈচিত্র্যসহ সার্বিক পরিবেশ বিদেশি এসব বন্য প্রাণীর জন্য উপযুক্ত কী–না তা আগেভাবে যাচাই করতে হবে। শুধু নতুন নতুন বিদেশি বন্য প্রাণীর সমাহার ঘটালেই হবে না। তাদের উপযুক্ত আবাসস্থল, খাদ্য, সুচিকিৎসা ছাড়াও এখানে এসব বন্য প্রাণীর প্রজননে কতটুকু সফলতা আসবে তাও বিবেচনায় নিতে হবে। এছাড়াও প্রাণীগুলোর জেনেটিক বৈচিত্র্য কিভাবে সামঞ্জস্য রাখা হবে সব বিষয়েই প্রাধান্য দিতে হবে। এমনকি লেমুরের মতো দুর্লভ ও দামি প্রাণীর চুরি ঠেকাতে এবং চুরি পরবর্তী সময়ে নির্দিষ্ট প্রাণীটিকে শনাক্তসহ উদ্ধার করার জন্য ডিএনএ প্রোফাইলিং করে রাখতে হবে। এতেই সফলতা আসতে পারে।








