এআই যুগে স্ব-শিক্ষার জাগরণ: মুখস্থবিদ্যা থেকে বিশ্লেষণাত্মক মননের পথে

রাজীব কর্মকার | মঙ্গলবার , ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ১০:৫৬ পূর্বাহ্ণ

শিক্ষা নিয়ে আমাদের সমাজে যে একধরনের মোহ এবং একই সাথে চরম বিভ্রান্তি রয়েছে, তা একুশ শতকের এই পর্যায়ে এসে আমাদের প্রতিনিয়ত গভীরভাবে ভাবায়। একজন বিজ্ঞান ও গণিতের চর্চাকারী হিসেবে যখন আমি চারপাশের সমাজকাঠামোর দিকে তাকাই, তখন একটি মৌলিক প্রশ্ন বারবার মনে জাগে আমরা কি আসলেই শিক্ষিত হচ্ছি, নাকি কেবল ছাপানো কাগজের কিছু সনদ সংগ্রহ করে আত্মতুষ্টিতে ভুগছি? প্রকৃত জ্ঞান কখনো বাইরে থেকে জোর করে মস্তিষ্কে প্রবেশ করানো যায় না; এটি ভেতর থেকে জাগ্রত হওয়া এক অনন্ত তৃষ্ণা। শ্রেণিকক্ষের চার দেয়াল, নির্ধারিত সিলেবাস আর পরীক্ষার খাতাএগুলো বড়জোর আমাদের চিন্তার একটি প্রাথমিক রূপরেখা দিতে পারে। কিন্তু অসীমের যে জ্ঞান, তার খোঁজ মেলে কেবল স্বশিক্ষায় (Self-learning)। যখন আমরা শিক্ষার্থীদের জন্য পরিসংখ্যান বা গাণিতিক মডেলিংয়ের কোনো সমস্যা তৈরি করি, তখন আমাদের মূল লক্ষ্য কেবল তাদের স্মৃতিশক্তি যাচাই করা থাকে না; আমরা চাই তারা সমস্যার গভীরে গিয়ে যৌক্তিকভাবে বিশ্লেষণ করতে শিখুক।

ইতিহাসের পাতা থেকে স্বশিক্ষার জয়গান: ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, মানবসভ্যতার বড় বড় আবিষ্কার ও চিন্তাধারার পেছনে স্বশিক্ষিত মানুষদের অবদান সবচেয়ে বেশি। আমি প্রায়শই ভাবি শ্রীনিবাস রামানুজনের কথা। প্রথাগত কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর ডিগ্রি তাঁর ছিল না। অথচ কেবল নিজের ভেতরের তাড়নায়, সংখ্যার প্রতি তীব্র ভালোবাসায় তিনি গণিতের যে রহস্যময় জগত উন্মোচন করেছিলেন, তা আজও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অহংকারকে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়। আধুনিক বিদ্যুতায়নের জনক মাইকেল ফ্যারাডেও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পাননি বললেই চলে। বই বাঁধাইয়ের কাজ করার সময় বিজ্ঞানের বই পড়ে তিনি নিজে নিজে পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নের মৌলিক বিষয়গুলো আয়ত্ত করেছিলেন। মহান চিত্রশিল্পী ও বিজ্ঞানী লিওনার্দো দা ভিঞ্চি কোনো প্রথাগত স্কুলে পড়েননি, অথচ প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করে তিনি ইতিহাস রচনা করেছেন। মহাবিশ্বের অমীমাংসিত প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে কিংবা বিজ্ঞানের জটিল সমীকরণ মেলাতে যে কোনো নির্দিষ্ট ডিগ্রির প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন কেবল অদম্য কৌতূহল তাঁদের জীবনীই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা ও মনস্তাত্ত্বিক সংকট: আজ আমাদের জিপিএ৫ এর এক অন্তহীন এবং যান্ত্রিক প্রক্রিয়া একটি প্রজন্মকে অস্থির প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে স্কুলকলেজে পাঠদানের পদ্ধতিতে অন্তর্নিহিত বা বেসিক ডেভেলপমেন্টের বড্ড অভাব। বিজ্ঞানভিত্তিক লেখাপড়াকে কেবল তাত্ত্বিকভাবে শতভাগ ধরে না রেখে প্র্যাকটিক্যাল বা প্রয়োগভিত্তিক করতে হবে। হাতেকলমে প্রশিক্ষণের অভাবে শুধু তাত্ত্বিক বিষয়গুলো মুখস্থ করার কারণে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার প্রতি বিমুখ হয়ে যাচ্ছে, যার ফলে দেশ ধীরে ধীরে মেধাশূন্য হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও আমরা দেখতে পাই, ছাত্রছাত্রীরা এখন তাদের মূল বা কোর কোর্সগুলোরপড়াশোনার চেয়ে চাকরি বা বিদেশ যাওয়া কেন্দ্রিক পড়াশোনাকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। এতে তাদেরও পুরোপুরি দোষ দেওয়া যায় না, কারণ আমাদের দেশে চাকরি প্রাপ্তির পড়াশোনা এবং নিজ নিজ ডিপার্টমেন্টের পড়াশোনার মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারি চাকরি প্রাপ্তি অথবা বিদেশ যাওয়াকেই জীবনের একমাত্র ‘চমকপ্রদ সাফল্য’ হিসেবে তুলে ধরা হয়। এই প্রবণতা আমাদের তরুণ ছাত্রসমাজকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে। স্বশিক্ষার মাধ্যমে একজন ব্যাংকার, উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ীও যে জীবনের প্রকৃত তাৎপর্য তুলে ধরতে পারে, সেভাবে আমরা তাদের অনুপ্রাণিত করি না। একটি সমাজ বা রাষ্ট্র কেবল আবেগ আর মুখস্থবিদ্যা দিয়ে চলতে পারে না; আমাদের প্রয়োজন বিশ্লেষণাত্মক মনন। এজন্য শুধু শিক্ষাব্যবস্থার নয়, আমাদের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনও সমানভাবে প্রয়োজন।

এআই যুগের চ্যালেঞ্জ : মুখস্থবিদ্যার অবসান: শিক্ষাব্যবস্থার এই সংকটের মাঝেই আমাদের সামনে হাজির হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI)। বর্তমানে জেনারেটিভ এআই নিমিষেই যেকোনো প্রশ্নের উত্তর বা পরিমার্জিত ফলাফল তৈরি করে দিতে পারে বলে নিছক মুখস্থবিদ্যা বা গৎবাঁধা পড়াশোনা আজ সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে পড়েছে। এই প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের যুগে এআইএর ওপর অন্ধ নির্ভরশীলতা যেন শিক্ষার্থীদের বিশ্লেষণাত্মক সক্ষমতা ও নিজস্ব চিন্তাশক্তিকে পঙ্গু করে না দেয়, সেদিকে সতর্ক হওয়া জরুরি। বরং এই এআই যেন স্বশিক্ষার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে, শিক্ষার্থীদের সেভাবে প্রস্তুত করতে হবে।

স্বশিক্ষার নীরব বিপ্লব ও উচ্চশিক্ষায় পটপরিবর্তন: এতসব হতাশা ও চ্যালেঞ্জের মাঝেও আমাদের তরুণ প্রজন্মের একাংশের দিকে তাকালে আমি স্বশিক্ষার এক নীরব বিপ্লবের আঁচ পাই, যা আমাকে আশাবাদী করে। বাংলাদেশ ম্যাথমেটিক্যাল অলিম্পিয়াড (BDMO), ফিজিক্স অলিম্পিয়াড কিংবা বিভিন্ন STEM প্রতিযোগিতাগুলো আজ তরুণদের মধ্যে স্বশিক্ষার একটি বিশাল প্ল্যাটফর্ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। কম্পিউটার সায়েন্স বা প্রকৌশলের শিক্ষার্থীরা আজ কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসের ওপর নির্ভরশীল নয়; তারা নিজ উদ্যোগে বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে কোডিং, ডেটা অ্যানালাইসিস এবং অ্যালগরিদম শিখছে। ইন্টারনেট ও এডটেক প্ল্যাটফর্মগুলোর বদৌলতে প্রান্তিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরাও আজ বিশ্বমানের দক্ষতা অর্জন করছে। এই বাস্তবতার সাথে তাল মেলাতে সমপ্রতি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় একটি অত্যন্ত ইতিবাচক পরিবর্তন আমাদের নজর কেড়েছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এখন আউটকামবেসড এডুকেশনবা ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা (OBE) চালু করা হয়েছে। এর মূল দর্শনই হচ্ছে শিক্ষার্থীদের পাঠ্যক্রমকে তাদের বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ এবং কর্মক্ষেত্রের চাহিদার সাথে সরাসরি যুক্ত করা। একজন শিক্ষক হিসেবে আমি জানি, কেবল সূত্র মুখস্থ করে কোনো কাঠামোগত মেকানিক্স বা জটিল সমীকরণ মেলানো যায় না, এর প্রায়োগিক দিকটি বোঝা জরুরি। আমরা কতটুকু এতে মানিয়ে নিয়ে অগ্রসর হতে পারছি, সেটি চ্যালেঞ্জিং হলেও বেশ কিছু গঠনমূলক উদ্যোগ আশার সঞ্চার করেছে:

প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখা: বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (UGC) দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে OBE সিলেবাস প্রণয়নের জন্য সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা প্রদান করেছে এবং শিক্ষকদের নিয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার আয়োজন করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: প্রকৌশল ও প্রযুক্তি শিক্ষার মানোন্নয়নে দ্য ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (IEB)-এর অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ড (BAETE) অসাধারণ কাজ করছে। এই মানসম্মত কাঠামোগত পরিবর্তনের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ ২০২৪ সালে ‘ওয়াশিংটন অ্যাকর্ড’এর পূর্ণ সদস্যপদ লাভ করেছে।

বাস্তবমুখী উদ্যোগ: বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এখন হ্যাকাথন, রোবোটিক্স প্রতিযোগিতা এবং প্রজেক্ট ফেয়ারের আয়োজন করছে, যেখানে বিভিন্ন দেশীয় ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান সরাসরি যুক্ত থাকছে।

আগামীর রূপরেখা ও আমাদের করণীয়: একটি প্রগতিশীল, সহনশীল ও যুক্তিনির্ভর সমাজ গড়তে এবং তরুণদের মেধার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন: . বাস্তবভিত্তিক মূল্যায়ন: কেবল তাত্ত্বিক পড়ার বদলে জলবায়ু পরিবর্তন, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বা ডেটা বিশ্লেষণের মতো বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানের ওপর ভিত্তি করে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করতে হবে। ২. মাতৃভাষায় জ্ঞানের প্রসার: বিজ্ঞান, গণিত এবং প্রযুক্তির জটিল বিষয়গুলো সহজ বাংলায় অনুবাদ করে উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে দেওয়া আমাদের মতো নাগরিকদের অন্যতম দায়িত্ব। ৩. কমিউনিটি লার্নিং হাব: ইন্টারনেট যেন কেবল বিনোদনের মাধ্যম না হয়ে জ্ঞান অর্জনের উন্মুক্ত পাঠাগারে পরিণত হয়, সেজন্য সর্বজনীন কমিউনিটি লার্নিং হাব গড়ে তোলা প্রয়োজন। ৪. মেন্টরশিপ: যাঁরা নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত, তাঁদের উচিত তরুণদের জন্য সঠিক গাইডলাইনের ব্যবস্থা করা এবং ‘কীভাবে শিখতে হয়’ তা আয়ত্ত করতে সাহায্য করা। শিক্ষক হিসেবে আমি প্রায়শই শিক্ষার্থীদের বলি, ‘তুমি কোনো একটি বিষয় জানো না, এটি তোমার কোনো ব্যর্থতা বা ঘাটতি নয়। কিন্তু যখন তোমার ভেতরে নতুন কিছু জানার বা শেখার কোনো আগ্রহ থাকবে না, ঠিক তখনই তুমি জীবনের দৌড়ে সবচেয়ে বড় ক্ষতির সম্মুখীন হবে।’

স্বশিক্ষা এবং বাস্তবমুখী শিক্ষা কোনো আলাদা বিষয় নয়; এরা একে অপরের পরিপূরক। অন্যের দেওয়া তথ্যের ওপর অন্ধ বিশ্বাস আমাদের নিজস্ব বিচারবোধকে পঙ্গু করে দেয়। যেদিন এ দেশের সাধারণ মানুষ কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজস্ব বিচারবিশ্লেষণ প্রয়োগ করতে শিখবে, যেদিন তরুণেরা কেবল ডিগ্রির জন্য নয়, বরং জানার অদম্য কৌতূহলে এআইএর মতো প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে মহাবিশ্বের অজানা রহস্য বা জটিল প্রযুক্তির উত্তর খুঁজবে সেদিনই আমরা প্রকৃত অর্থে একটি স্বাধীন ও সুশীল সমাজের দেখা পাব। স্বশিক্ষার এই মশালটি অন্য কেউ এসে জ্বালিয়ে দিয়ে যাবে না; এটি আমাদের নিজেদেরই জ্বালাতে হবে, সম্পূর্ণ নিজের ভেতর থেকে।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, গণিত বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবাকস্বাধীনতা ও পরমতসহিষ্ণুতা
পরবর্তী নিবন্ধআধুনিকতার আড়ালে নানা বীভৎসতা ও সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ