বাকস্বাধীনতা ও পরমতসহিষ্ণুতা

সঙ্গীতা ইয়াসমিন | মঙ্গলবার , ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ১০:৫৩ পূর্বাহ্ণ

ধর্ম একটি বিশ্বাস, আধ্যাত্মিক শক্তি এবং ব্যক্তির একান্তভাবে মনোজাগতিক সমর্পণের বিষয়। এক অলৌকিক শক্তির কাছে, সকল প্রকার নিবেদনের একমাত্র আশ্রয়স্থল এবং আস্থার জায়গা ধর্ম। আস্তিক ব্যক্তি নিজের জীবন পর্যন্ত বিসর্জন দিতে দ্বিধাহীন থাকেন স্বস্ব ধর্মের ক্ষেত্রে। নিজের বিশ্বাসের পরিপন্থী অন্যের কোনো আচরণে তারা বিরোধিতাকারীর জীবন সংহারেও পিছ পা হন না। রাজনীতিও অনেকটা ধর্ম বিশ্বাসের মতোই। আমরা যে যে দলকে সমর্থন করি সেই দলের নেতানেত্রীদেরকে আমরা পূজা করি। কখনো সখনো তাঁরা পূজনীয় বটে! কিন্তু তাঁরাও রক্ত মাংসে গড়া ভুলে, লোভে, মোহে ভরা মানুষ। তাঁদের কোনো ত্রুটিবিচ্যুতির সমালোচনা শুনলেও আমরা সমালোকের ওপর অকাতরে ঝাঁপিয়ে পড়ি। এটা আমাদের শিক্ষা, রুচি এবং সাংস্কৃতিক চর্চা। ধর্ম সম্পর্কিত আমাদের জ্ঞান, প্রচারণা ও সংস্কৃতির প্রভাবে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস এমনই যে, আমরাই সর্বশ্রেষ্ঠ! এ বিষয়ে কেউ প্রশ্ন তুললে আমরা তার টুটি টিপে ধরি। একইভাবে কেউ আমার সমর্থিত দলের বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করলে তাকে টেনে হিচড়ে নেংটা করে ছেড়ে দেব।

এমনটা কেন হয়? আদতে আমরা মুখে যতই প্রগতিশীলতার কথা, উদারতার কথা, শান্তি ও স্বান্তনার কথা বলি ভেতরে ভেতরে আমরা ভয়াবহ রকমের রক্ষণশীল, প্রতিক্রিয়াশীল, অযৌক্তিক, মূর্খ, অন্ধ এবং প্রতিহিংসাপরায়ণ। আমরা যতই ধর্মের লেফাফায় নিজেদেরকে মুড়ি না কেন, আমরা অন্যের মতামতকে শ্রদ্ধা জানাতে অক্ষম। কেননা, ধর্মের নামে অধর্মই আমাদের শিক্ষা।

পরমত সহিষ্ণুতা এক উচ্চমার্গীয় মানবীয় গুণ। এটি বই পড়ে কিংবা উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে লাভ করা যায় না। জীবন যাপনের প্রতিটি দিন সকল আচরণে এর চর্চা করতে হয়। আমরা কতটাই নাবালক যে, নিজে অন্যের ভিন্নমত গ্রহণে নারাজ, অথচ প্রত্যাশা করি অন্যে আমার মতে বলবে, চলবে, খাবে, ঘুমাবে। কেননা, আমি মনে করি আমিই শ্রেষ্ঠ! আমিই মহৎ। তাই সকলেই আমার অনুসারী হতে বাধ্য

এই ভাবনার মূলে রয়েছে আত্ম অহম ও অজ্ঞানতা। আমরা ফেসবুক আদালতে প্রায়শই অন্যকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাই। বলে থাকি, ‘তুমি পাবলিক পোস্ট দিয়েছ, সুতরাং আমিও কমেন্ট করব। পোস্ট দেবার যেমন অধিকার রয়েছে তোমার তেমনি তোমার পোস্টের সমালোচনা করার অধিকারও রয়েছে আমার।’ এই নির্বোধেরা কেবল কথা বলার অধিকার, কিংবা বাক স্বাধীনতা শব্দটিই জানে। এর মর্মার্থ জানে না। এখানে জেনে রাখা দরকার, আমাদের বাক স্বাধীনতা ততক্ষণই স্বাধীনতার দাবী রাখে, যতক্ষণ আমাদের জিহ্বায় উচ্চারিত শব্দসমূহ অন্যের জন্য আক্রমণাত্মক না হয়। আমদের লক্ষ্য রাখা উচিত, মত প্রকাশের স্বাধীনতা পেয়ে আমরাই যেনো অন্যের টুটি টিপে না ধরি। অন্যের যেমন আমাদের সকল মতামত পছন্দ না করার অধিকার রয়েছে তেমনি আমাদেরও ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার রয়েছে। সেক্ষেত্রে পারস্পারিক আলোচনা, সমালোচনা, যুক্তিতর্ক হতেই পারে। কেন না প্রশ্ন করা, তর্ক করা এ সবই তো জ্ঞান আহরণের পথ।

আমাদের তর্কযুক্তি যদি বিষয়কে ছাড়িয়ে ব্যক্তিকে আক্রমণ করে সেক্ষেত্রে সেই আলোচনা থেকে আর যাই হোক মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাসম্মানের পরিবেশ কিংবা আধুনিক বিশ্ব মানব হবার মতো কোনো ফল লাভ হবে না। সুতরাং আমি যদি নিজেকে শিক্ষিত দাবি করি এই কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখা উচিত। যদিও এই চর্চার নানামুখী সংস্করণ আমরা জাতীয়, রাজনৈতিক, ব্যক্তিগত সকল পর্যায়ে দেখতে পাই। জাকারবার্গের কল্যাণে সেই সুযোগ আরও বেশি বিস্তৃত হয়েছে। ফেসবুক এখন আমাদের জাতীয় আয়না। এক ঝলকেই একটা জাতির সংস্কৃতি এবং জাতীয় চরিত্র বুঝে নেওয়া যায়। জয় হোক সত্যের, মঙ্গল হোক সকলের।

লেখক : কবি

পূর্ববর্তী নিবন্ধবাস্তবতা ও প্রশ্ন
পরবর্তী নিবন্ধএআই যুগে স্ব-শিক্ষার জাগরণ: মুখস্থবিদ্যা থেকে বিশ্লেষণাত্মক মননের পথে