আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি, আগামীর পথ কোন্‌দিকে

মুহাম্মদ এনামুল হক মিঠু | রবিবার , ১১ অক্টোবর, ২০২৬ at ১০:৪৪ পূর্বাহ্ণ

মাসের শুরুতে বেতন হাতে আসে, কিন্তু মাস শেষ হওয়ার আগেই হিসাবের খাতা বলে দেয়, আয় শেষ, ব্যয় বাকি। বাড়িভাড়া, বাজার, শিক্ষা, চিকিৎসা, যাতায়াত, বিদ্যুৎ–গ্যাসসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে গিয়ে অনেক পরিবার আজ সঞ্চয় তো দূরের কথা, ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। প্রশ্ন হলো, এই বাস্তবতায় আগামীর পথ কোন দিকে?

একজন মধ্যবিত্ত চাকরিজীবীর কথাই ধরা যাক। মাসে ৪০ হাজার টাকা বেতন। এর মধ্যে ১২ হাজার টাকা বাড়িভাড়া, ১০–১২ হাজার টাকা বাজার খরচ, সন্তানের স্কুল ও পড়াশোনায় ৫–৬ হাজার, যাতায়াত ও মোবাইল–ইন্টারনেটে ৪–৫ হাজার, বিদ্যুৎ–গ্যাস–পানিতে আরও কয়েক হাজার টাকা চলে যায়। হঠাৎ পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে কিংবা কোনো জরুরি খরচ এলে পুরো হিসাবটাই এলোমেলো হয়ে যায়। মাস শেষে সঞ্চয় তো হয়ই না, বরং অনেক সময় ধার করতে হয়। এই পরিবারটি বিলাসিতা করছে না, শুধু স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে। অথচ আয় ও ব্যয়ের এই ব্যবধানই তাদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলছে।

সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে মধ্যবিত্ত। কারণ তারা না দরিদ্রের মতো সহায়তা চায়, না উচ্চবিত্তের মতো বাড়তি ব্যয় বহন করার সক্ষমতা রাখে। সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা ও ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করতে গিয়ে মাসের প্রয়োজনীয় ব্যয়ই যখন আয়ের সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন পরিবারগুলো প্রথমে সঞ্চয় ভাঙে, পরে ঋণ নেয়। এভাবে বর্তমানের ব্যয় মেটাতে গিয়ে ভবিষ্যৎ আয়ও আগাম খরচ হয়ে যায়। এই সংকটের স্থায়ী সমাধান শুধু বেতন বাড়ানোর মধ্যে নেই। উৎপাদন বাড়াতে হবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে, বাজার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে হবে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। একই সঙ্গে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষা, চিকিৎসা ও সামাজিক নিরাপত্তার ব্যয় কমানোর কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। আমাদের মনে রাখতে হবে, অর্থনীতির সাফল্য শুধু জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে নয়, একজন মানুষ মাস শেষে পরিবারের প্রয়োজন মিটিয়ে কিছু টাকা সঞ্চয় করতে পারছেন কি না, সেটিও অর্থনৈতিক সুস্থতার গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। আয় যদি বাড়ে, কিন্তু ব্যয় তার চেয়েও দ্রুত বাড়ে, তাহলে সেই প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায় না। শুধু আয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি নয়, আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য, বাজারে শৃঙ্খলা, কর্মসংস্থান, সাশ্রয়ী শিক্ষা ও চিকিৎসা এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ফিরিয়ে আনার বাস্তব পদক্ষেপ প্রয়োজন। কারণ মানুষের পকেট যখন প্রতিদিন খালি হয়, তখন অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির গল্পও তার কাছে অর্থহীন হয়ে পড়ে। আমরা এমন একটি অর্থনীতি চাই না, যেখানে মানুষ শুধু বেঁচে থাকার জন্য আয় করবে, আমরা এমন অর্থনীতি চাই, যেখানে আয় মানুষকে বাঁচার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ দেবে। আজকের মধ্যবিত্ত যদি সঞ্চয় হারায়, আগামী দিনের বাংলাদেশ হারাবে বিনিয়োগের শক্তি। তাই শুধু আয় বাড়ানোর কথা বলার নয়, মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ও জীবনযাত্রার স্বস্তি বাড়ানোর নীতি গ্রহণের পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধনজরুল জন্মবর্ষের জেলা পর্যায়ের প্রতিযোগিতার ফল নিয়ে অসন্তোষ প্রসঙ্গে
পরবর্তী নিবন্ধসাধারণ মানুষের কষ্ট লাঘবে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে হবে