নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে খুব গর্ব করে বলতেন, “আমার পরিবার চাষা। আমার পক্ষে এটা ওভারলুক করা কষ্টকর। রঙ ছড়িয়ে কিছু বলতে চাই না। আমার পূর্বপুরুষরা সরাসরি কৃষি উৎপাদনের সাথে যুক্ত ছিল। এই পরিচয় আমার অহংকার। আমি জাত চাষা অনেকে চাষার ছেলে আসল পরিচয় দেয় না। তাদেরকে মনে করে জঞ্জাল । আমি মনে করিনা। আমি দরিদ্রকে আমার অহংকার মনে করি”।
আহমদ ছফা শুধু একজন শক্তিশালী কথাসাহিত্যিক বা চিন্তক হিসেবে সীমাবদ্ধ না; কৃষি, গাছপালা ও প্রকৃতির প্রতি ছিল তাঁর গভীর অনুরাগ। তাঁর বিশ্বাস ছিল প্রকৃতির সাথে মানুষের বিচ্িছন্নতা শুধু পরিবেশের নয়, সংস্কৃতি ও মননেরও ক্ষতি ডেকে আনে।
ষাটের দশকে লেখক আহমদ ছফা ইশকুলের পরীক্ষা শেষ করার পর পুলিশের নজরে পড়েছিলেন। পুলিশের হাত থেকে বাঁচার জন্য চট্টগ্রামের পাহাড়ে পালিয়ে গেলেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে তিনি এক বছর তিন মাস কাটিয়েছিলেন। প্রকৃতি ও কৃষকপ্রেমী লেখক আহমদ পায়ে হেঁটে ঘুরে ঘুরে উপভোগ করেছেন পাহাড়ি অঞ্চল। বিলাইছড়ি বাজার থেকে প্রায় একদিন আধারাত দুর্গম পাহাড়ি পথ পায়ে হেঁটে ফারুয়া পর্যন্ত গিয়েছেন। কর্ণফুলি নদীকে আঁকাবাঁকা চিকন একটি রূপালি রেখার মতো উপভোগ করেছেন।
কৃষক পরিবারে জন্ম হলেও নিজের জমিতে কখনো চাষাবাদ করেনি। পৈতিৃক সূত্রে যে জমিগুলো আহমদ ছফা পেয়েছিলেন তা তিনি চিনে নিতে না পারলেও জমি চাষাবাদের কামলা শ্রমিকদের খরচ–পাতি দিতেন। আহমদ ছফা বুড়িঘাট বাজারের মইশছড়ি পাহাড়ায় নতুনচন্দ্র কারবারি জমিতে প্রথম মোষের হাল বাইতে শিখেন। পূর্বে কখনো লাঙলের মুঠি ধরেনি। সেসময় জলাশয়ে জোঁকের বিচরণ ছিল। পার্বত্য এলাকায় মইশা জোঁক দেখেছিলেন। রক্তখেকো মইশা জোঁক পায়ের সাথে কামড়ে ধরলে ছাড়তে চাইতো না মনে হতো কেউ যেন সুপার গ্লু দিয়ে রাবার লাগিয়ে দিয়েছে। মোষের হাল বাইতে গিয়ে তাঁর আঙুলে কড়া পড়েছিল। নিতান্ত ঠেলায় পড়ে নতুন চন্দ্র কারবারির বাড়িতে অন্য দিনমজুরের সাথে দিনমজুরের কাজ করেছেন। অথচ লেখক ছফার বাড়িতে আরাম আয়েশ খাওয়া পরা, আদর যত্নের অভাব ছিল না। কিন্তু সাধ করে নিজে কষ্টটা মাথায় তুলে নিয়েছিলেন। পার্বত্য এলাকায় আহমদ ছফা অনেক কষ্টের জীবন যাপন করেছেন যা তিনি চল্লিশ বছর পরেও স্মরণ করেন। তিনি বলেন, কষ্টের কথাগুলো আমার মোটেও মনে পড়ে না। অতীতের সুখ–স্মৃতিগুলো মনের আনাচ–কানাচ থেকে উঁকি দিতে থাকে। পার্বত্য এলাকায় নতুনচন্দ্র একটি প্রাইমারি ইশকুল প্রতিষ্ঠা করেন। ইশকুলে উর্দু পড়ারবার জন্য হুজুর পাওয়া যাচ্ছিল না। মাসিক বেতন ২৬ টাকা। লেখক ছফা উর্দু জানতেন। মোষের হাল ছেড়ে লেখক উর্দুর হুজুর হিসেবে ইশকুলে ছাত্র–ছাত্রীদের কিছুদিন শিক্ষকতা করলেন। পার্বত্য এলাকায় মহাভারত পাঠ করে শুনিয়েছিলেন নতুনচন্দ্র কারবারিকে। খবরটি পাহাড়ি এলাকায় বাতাসের মতো ছড়িয়ে পড়ে। লেখক আহমদ ছফাকে পাহাড়ি লোকজন সম্মান ও ভক্তি করা শুরু করলেন। তিনি বলেছেন, “আমার স্মৃতিতে ভাসে অনেক অনেক জোৎস্না জ্বলা রাত। থোকা থোকা পরিপক্ক সিঁদুরে লিপুর মত আকাশের তারাগুলো উপত্যকার নির্জন ভূমির প্রতি তাকিয়ে আছে। কেরোসিনের আলোকে মাচানে ঘরের সামনের আঙিনায় আমি সুর করে মহাভারত পাঠ করছি, অর্থ বুঝিয়ে দিচ্ছি, নর–নারী যুবা–বৃদ্ধ অবাক হয়ে যুধিষ্ঠির অর্জুন দ্রোপদী দুর্যোধনের কাহিনী শুনে যাচ্ছে।”
ছফা পাইন্য ফুল পছন্দ করতেন। পাইন্য ফুলের পালং সাজাইয়া রাখি/রসিক বন্ধুয়া পাইলে করব পিরিতি। তিনি নিজ হাতে মরিচ, কলা গাছের চারা রোপণ করেছেন এগুলোর প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল। শ্রীলংকার একটা কলা ছিল গরুর শিংয়ের মতো বাঁকা। এক হিন্দু বাড়িতে কলার চারা দেখেছিলেন। কলার চারা কেউ দিত না। এক রাতে সেই বাড়ি থেকে কলা গাছের চারা চুরি করে বাগানে লাগালেন। কলা গাছ বড় হয়ে ফলও দিয়েছিল।
প্রকৃতির প্রতি বিশেষ করে পুষ্প বৃক্ষ বিহঙ্গ–র প্রতি তাঁর যে ভালোবাসা সত্যি হৃদয় স্পর্শ করে। “সবুজ উদ্ভিদের যে একটা আত্মা রয়েছে তার স্পর্শ আমার নিজের আত্মায় এসে লাগে। মুখে কোনো বাক্য আসতে চায় না। এইখানে ঈশ্বরের এই প্রাচুর্যের পাশে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকতে ইচ্ছে করে”। আহা বৃক্ষ নিয়ে কী সুন্দর অনুধাবন। তিনিই বলেছেন-“ফুল ফোটানো সহজ কথা নয় শূন্য থেকে মূর্ত করা সৃষ্টির বিস্ময়। পারে সে জন ভেতর থেকে ফোটার স্বভাব যার, ফালতু লোকের ভাগ্যে থাকে বন্ধ্যা অহংকার।” ছফার বৃক্ষের প্রতি যে মায়া ভালোবাসা সত্যি অকল্পনীয়। বৃক্ষের মাঝে তিনি মানুষের জীবন ও আত্মার সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন। তিনি আপেল চারাকে আপেল শিশু এবং বৃক্ষচারাকে তরুশিশু বলে চমৎকার এক উপমা উপস্থাপন করেছেন।
২০০১ সালে ২৮ জুলাই কথাসাহিত্যিক আহমদ ছফা সবাইকে কাঁদিয়ে চিরতরে প্রস্থান নেন। তাঁকে সেময় মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করতে দেয়া হয়নি। পরবর্তীতে লেখকের শেষ ঠিকানা হলো মিরপুর সাধারণ কবরস্থানে। তাঁর কবরের নকশা করেছিলেন শিল্পী রশীদ তালুকদার এবং সমাধির ইট ক্রয়ের টাকা দিয়েছিলেন সিলেটের ওবেইদ জায়গীরদার। লেখকের কবরটি ৯৯ বছর পর ভেঙ্গে ফেলা হবে। লেখকের আহমদ ছফার ভাতিজা লেখক নুরুল আনোয়ার সম্প্রতি সিটি করপোরেশনে আবেদন করলে গত ১৩ এপ্রিল ডিএনসিসির ১৪তম সভায় আহমদ ছফার কবর মিরপুর কবরস্থান থেকে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত হয়। আহমদ ছফার কবরটি বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে স্থানান্তর করার জন্য সিটি কর্পোরেশন রাজি হলেও জেলা প্রশাসন নীরব। আহমদ ছফার ভাবশিষ্য প্রফেসর ডক্টর সলিমুল্লাহ খান বলেন, আমলাদের অদক্ষতার কারণে কবর স্থানান্তরের বিলম্ব হচ্ছে। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রীও কবরটি হস্তান্তরের বিষয়ে সিটি করপোরেশনে কল করেছিলেন। তবুও বিলম্ব হচ্ছে। আমরা এখন উদ্বেগের সঙ্গে অপেক্ষা করছি। তিনি ৩০ জুন জন্মবার্ষিকী ও ২৮ জুলাই তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী । এই সময়ের মধ্যে তাঁর কবর স্থানান্তরের জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহবান জানান।
আহমদ ছফার জন্মস্থান চন্দনাইশের গাছবাড়িয়া গ্রামে স্মৃতিবিজড়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠাগার স্থাপন, সড়কের নামকরণ ও চট্টগ্রামে আহমদ ছফা একাডেমি স্থাপনের জন্য চট্টগ্রামের সম্মানিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে সবিনয় নিবেদন রইল।









