আসকার দিঘিসহ নগরীর হারিয়ে যেতে বসা পুকুর ও দিঘিগুলো উদ্ধার করা জরুরি

আলমগীর মোহাম্মদ | সোমবার , ২৯ জুন, ২০২৬ at ৫:১৬ পূর্বাহ্ণ

একটি শহরের প্রকৃত পরিচয় কেবল বহুতল ভবনের জৌলুস, চকচকে বিপণিবিতান কিংবা ফ্লাইওভারের কংক্রিটকাঠামোতে থাকে না। শহরের আসল প্রাণস্পন্দন লুকিয়ে থাকে নদী, পাহাড় আর উন্মুক্ত জলাশয়ের বুকজুড়ে। প্রকৃতির এই আশীর্বাদগুলোই একটি শহরকে বাসযোগ্য রাখে। নগরবাসীকে দেয় স্বস্তির নিঃশ্বাস। কিন্তু বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বর্তমান অবস্থার দিকে তাকালে কেবলই দীর্ঘশ্বাস জাগে। গত কয়েক দশকে তথাকথিত উন্নয়নের নামে আর আধুনিকতার দোহাই দিয়ে যেভাবে এই রূপসী শহরের ফুসফুসকে ক্ষতবিক্ষত করা হয়েছে, তা এককথায় আত্মঘাতী। সবচেয়ে বড় বিপর্যয় নেমে এসেছে নগরের ভারসাম্য রক্ষাকারী ঐতিহ্যবাহী পুকুর আর দিঘিগুলোর ওপর। যার নির্মম ও জীবন্ত স্মারক হয়ে আজ মরণাপন্ন অবস্থায় ধুঁকছে জামালখানের ঐতিহাসিক আসকার দিঘি।

সাড়ে তিন শ বছরেরও বেশি পুরোনো এই দিঘির ইতিহাস চট্টগ্রামের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মোগল আমলে তৎকালীন শাসনকর্তা নবাব আসকার খাঁ যখন এটি খনন করেছিলেন, উদ্দেশ্য ছিল নগরের বাসিন্দাদের ও সৈন্যদের সুপেয় পানির অভাব দূর করা। সাড়ে ৮ একরের সেই সুবিশাল দিঘিটি আজ কেবলই অতীত। দখলদারদের আগ্রাসী ক্ষুধা আর নাগরিক অবহেলার শিকল চেপে বর্তমানে এটি সংকুচিত হতে হতে ৫ একরের নিচে নেমে এসেছে। এই দিঘির দিকে তাকালে চেনার উপায় নেই যে এটি কোনো ঐতিহাসিক জলাশয়। পুরো দিঘির উপরিভাগ ঘন কচুরিপানায় ঢেকে যেন এক সবুজ মাঠে পরিণত হয়েছে। তার নিচে লুকিয়ে আছে প্লাস্টিক, পলিথিন, গৃহস্থালি বর্জ্য আর সুয়ারেজ লাইনের মিশেলে তৈরি এক ঘন কালো বিষাক্ত তরল। যে দিঘির পানি একসময় মানুষের তৃষ্ণা মেটাত, আজ তা জলজ প্রাণীদের জন্যও এক জীবন্ত কবরস্থান।

আসকার দিঘির এই মরণদশা চট্টগ্রামের মধ্যে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি আসলে পুরো নগরীর জলাশয়গুলোর সামগ্রিক সংকটের প্রতিচ্ছবি।একসময় চট্টগ্রামকে বলা হতো পুকুরের শহর। পাড়ায় পাড়ায় সুবিশাল দিঘি আর পুকুরগুলো ছিল শহরের প্রাকৃতিক এয়ারকন্ডিশনার। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, গত তিনচার দশকে এই শহরের হাজার হাজার পুকুর ভরাট করে ফেলা হয়েছে। বলুয়ার দিঘি কিংবা লাড্ডুমণি দিঘির মতো ঐতিহাসিক জলাশয়গুলো আজ অস্তিত্বের সংকটে ধুঁকছে। অথচ এই জলাশয়গুলো কেবল সৌন্দর্যের অনুষঙ্গ ছিল না, ছিল নগরের পরিবেশগত সুরক্ষাকবচ।

নগরে পুকুর ও দিঘি কমে যাওয়ার প্রথম খেসারত আমাদের দিতে হচ্ছে প্রতি বর্ষায়। সামান্য বৃষ্টিতেই চট্টগ্রাম শহর এখন অথই জলে তলিয়ে যায়। আগে যেখানে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি এই পুকুর ও দিঘিগুলো প্রাকৃতিকভাবে শুষে নিত, এখন সেই জায়গাগুলো কংক্রিটের নিচে চাপা পড়ায় পানি নামার পথ অবরুদ্ধ। দ্বিতীয়ত, এই জলাশয়গুলো ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ঠিক রাখতে বা রিচার্জ করতে স্পঞ্জের মতো কাজ করে। এগুলো বিলীন হওয়ার কারণে চট্টগ্রাম জুড়ে সুপেয় পানির জন্য হাহাকার দিন দিন তীব্র হচ্ছে। নলকূপ বসিয়েও শত শত ফুট নিচে পানির সন্ধান মিলছে না। সবচেয়ে বড় বিপদের কথাটি আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। ঘনবসতিপূর্ণ এই মরণফাঁদ শহরে যখন কোনো অগ্নিকাণ্ড ঘটে, তখন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের পানির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরতে হয়। পুকুরহীন এক চট্টগ্রাম দিন দিন এক চরম ঝুঁকিপূর্ণ অগ্নিপিণ্ডে পরিণত হচ্ছে, যেকোনো বড় দুর্ঘটনায় যা ডেকে আনতে পারে অপূরণীয় বিপর্যয়।

পুকুর ও দিঘি সংরক্ষণে আইন যে দেশে নেই, তা কিন্তু নয়। ২০০০ সালের খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান এবং প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী যেকোনো পুকুর বা জলাশয় ভরাট করা সম্পূর্ণ দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু এই আইনের প্রয়োগ খাতাকলমেই সীমাবদ্ধ। ভূমিদস্যু আর স্বার্থান্বেষী মহলের এক চমৎকার কৌশল রয়েছে। তারা প্রথমে পুকুরে রাতের আঁধারে ময়লাআবর্জনা ফেলে পানিকে ব্যবহারের অযোগ্য করে তোলে। এরপর চারপাশ থেকে লোকচক্ষুর অন্তরালে কচুরিপানা আর মাটি দিয়ে ভরাট করা হয়। একপর্যায়ে যখন সেটি ডোবায় পরিণত হয়, তখন মালিকানা বা উন্নয়নের নামে সেখানে রাতারাতি বহুতল ভবন মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। আসকার দিঘির পাড়ে গড়ে ওঠা অবৈধ বসতঘর কিংবা চারপাশের সীমানা দখলের হিড়িক এই নগ্ন সত্যকেই বারবার মনে করিয়ে দেয়।

প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর ভূমিকা এখানে চরম হতাশাজনক। পরিবেশ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, সিডিএ এবং জেলা প্রশাসন কেউই এই দায় এড়াতে পারে না। যখনই কোনো জলাশয় ভরাটের কথা ওঠে, তখনই এক সংস্থা অন্য সংস্থার ওপর দোষ চাপিয়ে নিজের হাত ধুয়ে ফেলার চেষ্টা করে। জনবল সংকট কিংবা আইনি জটিলতার অজুহাত দেখিয়ে বছরের পর বছর পার করে দেওয়া হয়, অথচ চোখের সামনে একটি ঐতিহাসিক দিঘি বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হতে থাকে। পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে বলা হয় জনসচেতনতার কথা, সিটি কর্পোরেশন বলে উচ্ছেদের জন্য ম্যাজিস্ট্রেটের অভাবের কথা। এই ঠেলাঠেলির সংস্কৃতিতে লাভবান হচ্ছে কেবল দখলদাররা, আর নিঃস্ব হচ্ছে শহরবাসী।

এখনই যদি এই আত্মঘাতী ধ্বংসযজ্ঞ থামানো না যায়, তবে আর এক দশক পর চট্টগ্রাম একটি মৃত শহরে পরিণত হবে। প্রকৃতিকে হত্যা করে কোনো টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। আসকার দিঘিসহ হারিয়ে যেতে বসা চট্টগ্রামের সমস্ত পুকুর ও দিঘি উদ্ধার করতে হলে অবিলম্বে একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা বা ক্র্যাশ প্রোগ্রাম হাতে নিতে হবে। কেবল লোকদেখানো জরিমানা বা নোটিশ জারি নয়, প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।

চট্টগ্রামের সচেতন নাগরিক সমাজ ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছে এই ঐতিহ্যবাহী জলাশয়গুলোকে সরকারের পক্ষ থেকে ‘প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা’ বা ইসিএ ঘোষণা করার জন্য। এই দাবি অত্যন্ত যৌক্তিক এবং সময়োপযোগী। আসকার দিঘির মতো গুরুত্বপূর্ণ জলাশয়গুলোকে বিশেষ রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার আওতায় এনে সেগুলোর সীমানা পুনঃনির্ধারণ করা জরুরি।

আমরা উন্নয়ন চাই, কিন্তু সেই উন্নয়ন যদি আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের পরিবেশ আর আমাদের জীবনকে বিপন্ন করে তোলে, তবে সেই উন্নয়ন কার জন্য? আমাদের অসচেতনতা আর প্রশাসনের অবহেলায় যদি আসকার দিঘির মতো ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্মারকগুলো বিলীন হয়ে যায়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমরা অপরাধী হয়ে থাকব। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, সবুজ ও বাসযোগ্য শহর রেখে যেতে চট্টগ্রামের অবশিষ্ট সব জলাশয় উদ্ধার ও সংরক্ষণ করা এখন আর কেবল পরিবেশবাদী স্লোগান নয়, এটি আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঘুম ভেঙে জেগে উঠবে এবং চট্টগ্রামের এই কান্নার আওয়াজ শুনতে পাবে এটুকুই প্রত্যাশা।

লেখক: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও অনুবাদক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধনাট্যষষ্ঠী : স্বপন বড়ুয়ার অনন্য সৃজনশিল্প
পরবর্তী নিবন্ধরাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিপক্বতা আনতে হবে