চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলা এখন দেশের অন্যতম শীর্ষ মৎস্য উৎপাদন অঞ্চল। বিশেষ করে ফেনী ও মুহুরী নদীর তীরবর্তী এলাকা এবং উপকূলীয় অঞ্চলে গত কয়েক দশকে গড়ে উঠেছে হাজার হাজার মাছের প্রকল্প। অথচ বিপুল চাহিদার পরও উপজেলার একমাত্র মৎস্য প্রজনন কেন্দ্রটি চলছে সীমিত সক্ষমতায়। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মীরসরাই উপজেলায় বছরে প্রায় ৫০ হাজার মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হয়। মুহুরী প্রজেক্ট ও উপকূলীয় এলাকায় দেশের অন্যতম বৃহৎ মৎস্য জোন গড়ে উঠেছে। এটি পুরো চট্টগ্রাম জেলার মাছের চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ পূরণ করে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
জানা গেছে, স্থানীয় মৎস্যচাষিদের রাজশাহী, বগুড়াসহ বিভিন্ন দূরবর্তী জেলা থেকে পোনা সংগ্রহ করতে হয়। অথচ মীরসরাই উপজেলাতেই একটি সরকারি মৎস্য বীজ প্রজনন কেন্দ্র রয়েছে, সেটি অধিকাংশ মৎস্যচাষিরই অজানা। মুহুরী প্রজেক্টসহ অন্যান্য জলাশয়ে রুই, কাতলা, মৃগেল ও সিলভার কার্পের পোনার চাহিদা সবচেয়ে বেশি। বছরে এসব মাছের প্রায় ৬০ লাখ পিস পোনার চাহিদা রয়েছে। চিংড়ির পোনা পৃথকভাবে চাষ না হলেও সাদা মাছের সঙ্গে মিশ্র পদ্ধতিতে গলদা বা বাগদা চিংড়ি চাষের জন্য প্রায় ৩০ লাখ পিস পোনার বাজার রয়েছে। উপজেলায় মৎস্য খাতের সঙ্গে সরাসরি প্রায় ৮ হাজার খামারি যুক্ত আছেন। অথচ মীরসরাইয়ের এই মৎস্য বীজ প্রজনন কেন্দ্রে বছরে মাত্র ৩ লাখ পোনা উৎপাদিত হচ্ছে। এটি মোট চাহিদার প্রায় ৫ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কেন্দ্রটির সক্ষমতা বাড়ানো এবং বিভিন্ন উপকেন্দ্র গড়ে তোলা হলে এ অঞ্চলের পোনার চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।
উপজেলার ৮ নম্বর দুর্গাপুর ইউনিয়নের মৎস্যচাষি শাহাবউদ্দিন চৌধুরী বলেন, আমি আমার কয়েকটি মৎস্য প্রকল্পের জন্য বছরে প্রায় লাখ টাকার পোনা বগুড়া থেকে সংগ্রহ করি। আমার এলাকার মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র থেকে তা সংগ্রহ করতে পারলে সরকার রাজস্ব পেত। আমরাও যাতায়াতসহ বিভিন্ন ভোগান্তি থেকে রেহাই পেতাম। প্রজনন কেন্দ্রটির পাশের বারৈয়াঢালা গ্রামের মৎস্যচাষি নাছির উদ্দিন ভূঞা বলেন, দায়িত্বরত মৎস্য কর্মকর্তার সঙ্গে আমার অনেক সখ্যতা থাকা সত্ত্বেও কয়েকবার মাছের পোনা চেয়েও পাইনি। তবে জানতে পেরেছি, তাদের সক্ষমতাসহ বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ১৯৭৭ সালে ৭ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত সরকারি এই খামারটি বিভিন্ন জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। দীর্ঘ ১৪ বছর বন্ধ থাকার পর ২০২২ সালের মে মাস থেকে খামারটি পুনরায় পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন কার্যক্রম চালু করে। পুনরায় চালুর পর সেখানে আধুনিক ল্যাব ও হ্যাচারি স্থাপন করা হয়েছে। ভারপ্রাপ্ত প্রজনন কর্মকর্তা, টেকনিশিয়ান ও সহকারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে কেন্দ্রটির পরিসর এখনো অত্যন্ত সীমিত। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন সক্ষমতাও অপ্রতুল। প্রজনন কেন্দ্রটির ১৩টি পুকুরের মধ্যে প্রবেশপথের প্রথম পুকুরটি কিছুটা পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন। বাকি পুকুরগুলো জঙ্গলে ভরা। ফলে সেগুলো অনেকটা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।
এ বিষয়ে প্রজনন কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহতাসিম বিল্লাহ বলেন, এই মৎস্য বীজ কেন্দ্রটি পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। গত কয়েক বছরে এখানকার পরিবেশ, অবকাঠামো ও সক্ষমতা বৃদ্ধির নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ গত বছর আমরা এই মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র থেকে ৩ লাখ উন্নত জাতের পোনা বিক্রি ও বিতরণ করেছি। তিনি বলেন, বিশেষ করে উন্নত জাতের রুই, কাতলা, মৃগেলসহ বিভিন্ন দেশি–বিদেশি কার্পজাতীয় মাছের গুণগত মানসম্পন্ন রেণু ও পোনা বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করা হচ্ছে। সরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন স্থানে অবমুক্তকরণ, মৎস্যচাষিদের মধ্যে বিতরণ এবং বিক্রি করা হচ্ছে।
মোহতাসিম বিল্লাহ বলেন, আগে মীরসরাই ও মুহুরী প্রজেক্ট এলাকার প্রায় ৮ হাজার মৎস্যচাষিকে ময়মনসিংহ, বগুড়া, কুমিল্লা বা নোয়াখালী থেকে বেশি দামে পোনা কিনে আনতে হতো। বর্তমানে দূর থেকে আনার সময় পরিবহনে যে বিপুল পরিমাণ পোনা মারা যেত, তা কমে এসেছে। চাষিরা এখন সতেজ ও সুস্থ পোনা পাচ্ছেন।
চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম বলেন, আমি দায় স্বীকার করে বলছি, মীরসরাইয়ে যে পরিমাণ পোনার চাহিদা রয়েছে, তার সিকিভাগও আমরা দিতে পারছি না। তবে সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য আমরা পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছি। তিনি বলেন, এত দিন এই প্রজনন কেন্দ্রটি ছিল অরক্ষিত ও উন্মুক্ত স্থান। বর্তমানে পুরো এলাকা সংরক্ষিত করার জন্য সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের কাজ চলছে। প্রজনন কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় জনবল দেওয়া এবং সফলভাবে প্রজনন কেন্দ্রটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর জন্য আরও ব্যাপক পরিকল্পনা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সালমা বেগম আশা প্রকাশ করে বলেন, আর বেশি দূরে নয়, এই অঞ্চলের পূর্ণাঙ্গ চাহিদা পূরণে আমরা সক্ষম হব।












