চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে কূপ খননের উদ্যোগ

কিছু অনুসন্ধানমূলক, কিছু উন্নয়নমূলক নতুন গ্যাসক্ষেত্র বা গ্যাসসমৃদ্ধ স্তরের সন্ধানে নজর দেওয়া হচ্ছে রিগ কেনা ও আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে খননের চিন্তা

হাসান আকবর | মঙ্গলবার , ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৫:১৭ পূর্বাহ্ণ

গ্যাসের সংকট। গ্যাসের জন্য চট্টগ্রাম আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরশীল। এ রকম পরিস্থিতিতে মাটির নিচে দেশীয় গ্যাসের নতুন উৎস খুঁজতে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে বেশ কিছু কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাপেক্সের বৃহত্তর অনুসন্ধান কর্মসূচিতে পটিয়া, জলদী, সীতাপাহাড়, কাসালং ও সন্দ্বীপের সম্ভাবনাময় কাঠামোর পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামের সেমুতাংয়ে নতুন কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে সেমুতাং–৬ কূপের ওয়ার্কওভার ও উন্নয়নকাজ শেষ হয়ে ইতোমধ্যে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। ফলে দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকটে থাকা চট্টগ্রাম অঞ্চলের জন্য নিজস্ব ভূখণ্ডের গ্যাসের সম্ভাবনা নতুন করে সামনে আসছে।

সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের সম্ভাবনাময় কাঠামোগুলোতে পটিয়া–২, সীতাপাহাড়–৩, জলদী–৪, কাসালং–১, সন্দ্বীপ সাউথ–১, সন্দ্বীপ নর্থ–১, সেমুতাং–৭ ও সেমুতাং–৮ সহ একাধিক কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে কিছু কূপ অনুসন্ধানমূলক, কিছু উন্নয়নমূলক। শুধু পুরনো কূপের উৎপাদন বাড়ানো নয়, নতুন গ্যাসক্ষেত্র বা গ্যাসসমৃদ্ধ স্তরের সন্ধানেও নজর দেওয়া হচ্ছে।

চট্টগ্রামের সবচেয়ে কাছের সম্ভাবনাময় গ্যাসক্ষেত্রের একটি পটিয়া। পটিয়া–২ কূপকে ঘিরে নতুন করে অনুসন্ধানের পরিকল্পনা রয়েছে। একইভাবে জলদী ও সীতাপাহাড়েও দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস অনুসন্ধানের আলোচনা চলছে। ২০১৫ সালে বাপেক্স চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পটিয়া, জলদী, কাসালং ও সীতাপাহাড়ে যৌথ উদ্যোগে অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছিল। ওই সময় বাপেক্স এসব কাঠামোকে সম্ভাবনাময় হিসেবে চিহ্নিত করে আন্তর্জাতিক তেল–গ্যাস কোম্পানিকে গ্যাস অনুসন্ধানের আহ্বান জানিয়েছিল। চট্টগ্রামের শিল্প ও বন্দরনির্ভর অর্থনীতির জন্য এলাকাগুলোর অবস্থানগত সুবিধার কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল। অন্যদিকে সন্দ্বীপেও অনুসন্ধানের পরিকল্পনা রয়েছে। সন্দ্বীপ সাউথ–১ ও সন্দ্বীপ নর্থ–১ কূপসহ ওই এলাকার আরও কিছু কাঠামো ভবিষ্যৎ অনুসন্ধান কর্মসূচিতে রাখা হয়েছে। চট্টগ্রামের মূল ভূখণ্ডের পাশাপাশি দ্বীপাঞ্চল এবং উপকূলীয় ভূতাত্ত্বিক কাঠামোকে অনুসন্ধানের আওতায় আনার ফলে এ অঞ্চলে দেশীয় গ্যাসের সম্ভাবনা যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে পেট্রোবাংলার দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বড় গুরুত্ব পাচ্ছে খাগড়াছড়ির সেমুতাং। এখানকার সেমুতাং–৬ কূপ থেকে সম্প্রতি গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়েছে। বাপেঙের মালিকানাধীন সেমুতাং গ্যাসক্ষেত্রের এই কূপ থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। কূপটি খনন করেছে রাশিয়ার গ্যাজপ্রম। এর আগে সেমুতাংয়ের ৫ নম্বর কূপ থেকেও গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। সেমুতাং–৬ থেকে উৎপাদন শুরু হওয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে জাতীয় গ্রিডে দেশীয় গ্যাসের সরবরাহ কিছুটা বাড়ল।

সেমুতাংয়ে নতুন অনুসন্ধান ও উন্নয়ন কার্যক্রমও গ্রহণ করা হয়েছে বলে উল্লেখ করে সূত্র জানিয়েছে, সেমুতাং–৭ ও সেমুতাং–৮ কূপকে পরবর্তী কর্মসূচির আওতায় রাখা হয়েছে। এর মধ্যে সেমুতাং–৭–এর নাম বাপেঙের চলমান গ্যাস অনুসন্ধান পরিকল্পনায় রয়েছে। একটি কূপ থেকে উৎপাদন শুরু হওয়ার পর একই ভূতাত্ত্বিক কাঠামোর আশপাশে আরো কূপ খননের মাধ্যমে মজুতের পরিমাণ ও উৎপাদন সম্ভাবনা যাচাই করতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সূত্র জানায়।

দেশের অন্যতম প্রধান শিল্পাঞ্চল, সমুদ্রবন্দর, ইপিজেড, সার কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বড় বড় উৎপাদনশীল শিল্পের জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ চট্টগ্রাম অঞ্চলে। ফলে এই অঞ্চলের কাছাকাছি নতুন গ্যাসের উৎস পাওয়া গেলে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের পাশাপাশি স্থানীয় শিল্পাঞ্চলেও গ্যাস সরবরাহের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে উল্লেখ করে সূত্র বলেছে, বর্তমানে চট্টগ্রামের গ্যাস সেক্টর পুরোটাই আমদানিকৃত এলএনজি নির্ভর। আশুগঞ্জ–বাখরাবাদ পাইপলাইনকে একমুখী করে ফেলায় সিলেট, কুমিল্লা বা ফেনী অঞ্চলের কোনো গ্যাস চট্টগ্রামে আনা যায় না। এতে করে এলএনজি আমদানি বা টার্মিনালে কোনো সংকট হলে চট্টগ্রামে গ্যাসের হাহাকার শুরু হয়। চট্টগ্রাম অঞ্চলে নতুন কূপ খনন বা কোনো গ্যাসক্ষেত্র পাওয়া গেলে তা আমদানিকৃত এলএনজি নির্ভরতা কমাবে বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

অনুসন্ধান কূপ খননের পর ভূতাত্ত্বিক স্তর, চাপ, গ্যাসের উপস্থিতি, মজুত এবং বাণিজ্যিক উৎপাদনের উপযোগিতা যাচাই করা হবে। এ কারণে পটিয়া, জলদী, সীতাপাহাড়, কাসালং ও সন্দ্বীপের কূপগুলোকে সম্ভাব্য উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হলেও এগুলো থেকে কত গ্যাস পাওয়া যাবে, তা কূপ খনন ও মূল্যায়নের আগে নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

তারা বলেন, দেশে গ্যাস অনুসন্ধানের গতি বাড়াতে বর্তমানে বড় পরিসরে ২ডি ও ৩ডি সিসমিক সার্ভে পরিচালনা করা হচ্ছে। এসব জরিপের মাধ্যমে ভূগর্ভের সম্ভাব্য গ্যাসসমৃদ্ধ কাঠামো চিহ্নিত করে পরবর্তী সময়ে অনুসন্ধান কূপের অবস্থান নির্ধারণ করা হয়। ফলে চট্টগ্রাম অঞ্চলের নতুন কূপ খননের কর্মসূচিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

পেট্রোবাংলার বৃহত্তর কর্মসূচিতে ২০৩০ সালের মধ্যে স্থলভাগে ১৫০টি কূপ খননের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক পরিকল্পনার বিভিন্ন তালিকায় চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের কূপগুলোও স্থান পেয়েছে। বাপেঙের অধীনে পটিয়া–২, সীতাপাহাড়–৩, জলদি–৪, কাসালং–১ এবং সন্দ্বীপের বিভিন্ন কাঠামোর কূপের নাম রয়েছে। একই কর্মসূচিতে সেমুতাং–৭ ও ৮–এর মতো কূপও রাখা হয়েছে।

এদিকে গ্যাস সংকট মোকাবিলায় দ্রুত কূপ খননের পাশাপাশি পর্যাপ্ত ড্রিলিং রিগের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। পেট্রোবাংলা ২০২৬–২৭ থেকে ২০২৯–৩০ অর্থবছরের মধ্যে ১১৮টি কূপ খননের কর্মসূচি নিয়েছে। কিন্তু বাপেঙের পাঁচটি রিগের মধ্যে তিনটি বর্তমানে ওয়ার্কওভার কাজে ব্যবহৃত হওয়ায় অনুসন্ধান ও উন্নয়নমূলক কূপ খননে মাত্র দুটি রিগ ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। এ কারণে নতুন রিগ কেনা এবং আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও সূত্র জানিয়েছে।

চট্টগ্রাম অঞ্চলে গ্যাসের ব্যবহারক্ষেত্র এবং নতুন গ্যাসের সম্ভাব্য উৎসের মধ্যে ভৌগোলিক দূরত্ব তুলনামূলক কম। পটিয়া, জলদী ও সীতাপাহাড়ের মতো জায়গাগুলো চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলের কাছাকাছি হওয়ায় অনুসন্ধান সফল হলে নতুন গ্যাস কম খরচ এবং স্বল্পতম সময়ে ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি হবে। অতীতেও বাপেঙ চট্টগ্রামের কাছাকাছি এসব স্থানকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।

জাতীয় পর্যায়ে ১৫০ কূপ খননের যে মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম। সেমুতাং–৬ ইতোমধ্যে উৎপাদনে এসে দেখিয়েছে, দীর্ঘদিনের অনুসন্ধান ও উন্নয়ন কার্যক্রম থেকে নতুন করে গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব। এখন উল্লেখিত সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রগুলোতে পরিকল্পিত অনুসন্ধান দ্রুত বাস্তবায়ন এবং সেখান থেকে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উত্তোলনের সুযোগ এলে কেবল চট্টগ্রামের গ্যাস সেক্টরের সংকট কমবে বলে সংশ্লিষ্টরা মন্তব্য করেছেন।

বাপেঙের একজন প্রকৌশলী জানান, ২০৩০ সালের মধ্যে স্থলভাগে ১৫০টি গ্যাস কূপ খননের লক্ষ্যমাত্রা সামনে রেখে এরই মধ্যে ৩২টি কূপের ড্রিলিং ও ওয়ার্কওভার শেষ হয়েছে। এসব কূপ থেকে গ্যাস উৎপাদনের পথ এখন উন্মুক্ত। একই সঙ্গে আরও ছয়টি কূপে খননকাজ চলছে। ডিপিপি অনুমোদন পেয়েছে ১৭টি কূপের এবং আরও ১৭টি রয়েছে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। ফলে আগামী বছর কয়েকের মধ্যে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক কূপ খননের যে কর্মযজ্ঞ শুরু হচ্ছে তা জ্বালানি নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখবে। ১৫০টি কূপ খনন সম্পন্ন হলে দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৭৬২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

উল্লেখ্য, গতকালের হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় চার হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে গতকাল সরবরাহ দেওয়া হয়েছে ২৬১৯ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া গেছে ১৬০৩ মিলিয়ন ঘনফুট, আমদানিকৃত এলএনজি পাওয়া গেছে ১০১৬ মিলিয়ন ঘনফুট। বর্তমান সরবরাহে দৈনিক প্রায় ১৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। চট্টগ্রামে ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে গড়ে ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ দেয়া হয়, যার পুরোটাই আমদানিকৃত এলএনজি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপরীক্ষামূলক চালু হলো কক্সবাজার বিমানবন্দরের নতুন টার্মিনাল
পরবর্তী নিবন্ধবান্দরবানে ৪ বছরের ভাতিজিকে গলা টিপে মারল ফুফু